মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

|| এক সফলতার গল্প ||

|| এক সফলতার গল্প || || মোঃ আসাদ রহমান || ||কোটচাঁদপুর || ঝিনাইদহ || আমি যখন বাড়ি ছেড়ে ছিলাম তখন আমার কাছে মাত্র ৫০ টা টাকা ছিল, ফোনের ব্যাক কভারে😘 ।তাও এগুলি ছিল আমার পরের দিন কলেজে যাওয়া আসার ভাড়ার টাকা।বাবার মুখের উপর এক প্রকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েই সেদিন বাড়ি ছেড়েছিলাম।আমি যখন বেরিয়ে আসছিলাম তখন আমার পরিবারের প্রতিটা মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিল।কিন্তু কেউ আমাকে বাধা দেয়নি।এর পিছনে হয়তো ২টি কারন ছিল ১/আমি নির্বোধ মেয়ে মানুষ সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরবো আর ২/আমাকে তাদের আর কোন প্রয়োজন ই নেই। পরিবারের ছোট মেয়ে আমি,।আমার বড় একটা বোন রয়েছে।আমার বড় এক ভাই আছে সে পাড়ায় ই একটা মদি দোকান দিয়েছিল।আমাদের সংসারে তেমন কোন অভাব নেই।মা -বাবা,,ভাই আর আমি।আপু তো শশুর বাড়িতে।গুছানো সংসার।তবে অভাব ছিল বিশ্বাস,ভরশা, আর ভালোবাসার।যেটা না আমার বাবার আমার মায়ের প্রতি ছিল, না আমার ভাইয়ের আমাদের প্রতি ছিল। ছোট থেকেই নারী আর পুরুষের তফাত টা দেখে আসছিলাম। কোন প্রশ্ন করলে মা বলতো ওরা পুরুষ মানুষ। ওদের অধিকার বেশি।তখন মাকে বলতাম দেখো এই পুরুষ মানুষ ই না একদিন জাত ডুবায়।চড় মেরে মা আমায় থামিয়ে দিত। একটু একটু করে বড় হতে লাগলাম।প্রাইমারি স্কুল ছেড়ে হাই স্কুল ধরেছিলাম। প্রায় আমার বান্ধবীদের অভিযোগ ছিল আমার ভাই নাকি তাদের মাঝপথে বিরক্ত করতো।অন্য ছেলেদের নিয়ে রাস্তায় মেয়েদের টিজ করে হাসি তামাসা করতো।আমি এক ঘন্টা আগেই যেতাম প্রাইবেট পড়ার জন্য। ব্যাপার টা নিশ্চিত হতে আমি সেদিন প্রাইবেট না পড়ে ওদের সাথে গিয়েছিলাম।স্কার্ফ দিয়ে মুখ টা বাধা ছিল আমার। ঘটনা সত্যি,, মুখ টা খোলার পর ভাই কোন রকমে পালিয়ে বেচেঁছিল।তখন আমি ক্লাস ৭এ ছিলাম। বিকেলে বাসায় ফিরে মাকে জানিয়েছিলাম।কিন্তু বিধি বাম।আমি নাকি ভাইয়ের নামে বদনাম করছি।আবারো খেলাম মার। আমার ক্লাস সেভেনের শেষের দিকে তখন আমার আপুর বয়স ছিল ১৬। আপুর বিয়ে ঠিক করা হল এক ৪৭ বছর বয়সী বিলেত ফেরত বুইড়া খাটাসের সাথে।আপু সবার অগোচরে অনেক কেদেঁছিল।প্রতিবাদ করতে পারেনি।জোর করে ইয়া মোটা বুইড়ার সাথে আপুকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিয়েত রাতেই আপুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।সেদিন কারন টা না বুঝতে পারলেও এখন আমি বুঝি কারন টা কি ছিল।ধুকে ধুকে আমার বোন টা শেষ হয়ে যাচ্ছিলো।শুকিয়েকাঠ হয়ে গেছিলো,,চোখের নিচে গাঢ় কালো দাগ।আমার এখনো মনে আছে,একবার আমি আপুর শশুর বাড়িতে গিয়েছিলাম।ওর জামাই আমার সামনেই আমার বোনকে ৩-৪টা চড় মেরেছিল।কারন ছিল তরকারীতে লবন কম ছিল। আমি সেদিন না খেয়েই চলে এসেছিলাম।বাড়ীতে এসে মাকে বলেছিলাম মা উত্তর দিয়েছিল মেয়েদের মানিয়ে নিতে হয়। হ্যা আমার বোন ও মানিয়ে নিয়েছিল।আজ উব্দি সে সন্তানের মুখ দেখেনি।তার জরায়ু তে ইনফেকশন হয়েছিল।চিকিৎসারঅভাবে একসময় জরায়ূ বাদ দিতে হল ডাক্তারদের।সারাজীবনের জন্য মা ডাক শোনা বন্ধ হয়ে গেলো আমার বোনের।আমি তখন এস এস সি এক্সাম দিয়েছিলাম।তখনো রেসাল্ট ও বের হয়নি। তখনি প্রেসার দিতে লাগলো বিয়ের জন্য আমাকেও।কিন্তু নাহ,আমি সহজে হার মানবোনা।কলেজের প্রথম বছর এই সেই করে কাটিয়ে দিলেও ২য় বর্ষে আমার বিয়েও এক বিলেত ফেরত এর সাথে ঠিক করে।আমি বার বার না করার পর ও তারা বিয়ের ডেট ফেলে দেয়।পরে শুনতে পারি এই লোকের বয়স আমার আপু জামাইয়ের কাছাকাছি মানে ৪০+। সেদিন আমি প্রতিবাদ করেছিলাম আর বাবা সেদিন আমায় তার বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেছিল।জেদের বশে আমিও বেরি এসেছিলাম।অভিজ্ঞতা ছিলনা কখনো না খেয়ে থাকার।সন্ধ্যা হয়ে গেছিলো,,ভাবছিলাম হাতে আছে এই ৫০টাকা।কোথায় যাবো, কি করবো মাথায় আসছিলোনা।আত্নীয়স্বজনদের কাছে গেলেও তারা সেই বাড়ীতে ফোন করে বলে দেবে।ক্ষুদায় অস্থির হয়ে সেই ৫০টাকা ভেঙে ২০টাকা দিয়ে ২টি ডাল পুরি হাতে নিলাম।তখনি ফোন টা বেজে উঠলো। আপু ফোন দিয়েছে,, ------হ্যালো আপু,  ----হ্যা তুই কোথায় বোন। ----আছি একটা খাবার হোটেলের সামনে। ----আচ্ছা শুন আমি তোকে লুকিয়ে ফোন করেছি।এরা বাড়ি ফিরলেই তোকে বিয়ে দিয়ে দিবে।আমি তোকে আমার এক বান্ধবীর নাম্বার দিচ্ছি।তুই এখন ওর কাছে চলে যা।বাকিটা পরে দেখা যাবে। ----আচ্ছা ঠিক আছে আপু। ----হ্যা খেয়েছিস কিছু। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি।কান্নায় ভেঙে পড়লাম। ওপাশ থেকে আপুর কান্নার শব্দ পাচ্ছিলাম। ----আচ্ছা রাখিরে। আবার ফোন দিবো।বলেই আপু ফোন টা কেটে দিল। মেসেজে ওর বান্ধবীর নাম্বার দিলো। যোগাযোগ করে রাত হওয়ার আগেই সেই আপুর বাড়িতে গেলাম।বাড়িতে উনি,উনার মা আর একটা ৩বছরের মেয়ে থাকে।কথা বলে জানলাম উনার স্বামী বিদেশ থাকে।৪দিন ওই বাড়িতে থাকার পর জামসেদ ভাই আমার খালাতো ভাই আসে দেখা করতে। তারপর আমাকে একটা বৃদ্ধাশ্রম এ সেবিকার একটা চাকরী দেন।জীবন টা মোটামুটি গুছিয়ে উঠলো।১১হাজার টাকা স্যালারী আর থাকা খাওয়া তাদের।এটা মহিলাদের বৃদ্ধাশ্রম আর সকল কর্মী ও মহিলা।সব রকম সুযোগ সুবিধা ছিল।মনে মনে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম।আপুর সাথে মাঝে মাঝেই দেখা করতাম।নিজের খরচের জন্য ১হাজার টাকা রেখে বাকি ১০হাজার টাকা ব্যাংকে ডিপোজিট সিস্টেমে রেখে দিলাম ৫বছর মেয়াদে। আমি এখানে আসার ৬মাসের মাথায় এক মহিলাকে আনা হয় যিনি প্রচন্ড অসুস্থ।উনার ছেলে দেশের বাইরে একটা বড় কোম্পানিতে চাকরী করে।উনার ছেলেই উনাকে এখানে রেখে যায়।কারন ১দিন পরেই উনার ছেলে দেশের বাইরে চলে যাবে আর ভদ্র মহিলাকে দেখার কেউ নেই।তিনি আমাকে মোটা অংকের কমিশন দেওয়ার প্রত্যয় করেন শুধু মাত্র তার মায়ের এক্সট্রা সেবা করার জন্য।সেদিন তার কমিশন ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলাম সেবা করা আমার দায়ীত্বের মধ্যে পড়ে আর টাকা টা বেয়াইনি। আমার জন্য সবাই সমান আর আমি সব টুকু দিয়ে চেষ্টা করবো। আমরা মোট ৪জন সেবিকা ছিলাম।আমাদের কাজ ছিল পুরো বৃদ্ধাশ্রম বাসীর খেয়াল রাখা,রান্না,বান্না,পরিষ্কার ইনটোটালি সব। ওই লোক থেকে টাকা না নিলেও আমি তার মায়ের ব্যাপারে প্রচন্ড যত্ন নিতাম।এমনকি তার কাপড় ছোপড় ধোয়া থেকে শুরু করে,মাথা আচড়িয়ে দেওয়া,চুলে তেল দেওয়া আর সবাই মিলে গল্প করা।সব মিলিয়ে আমার জীবনে যোগ হয়েছিল এক অন্যন্য মাত্রা।জামসেদ ভাইয়ের প্রতি ও কৃতজ্ঞ থাকবো সারাজীবন। আপু মাঝে মাঝে আসে দেখা করে যায়। দেখতে দেখতে দেড় বছর সময় কেটে যায়।সে ভদ্রমহিলার ছেলে বিদেশ থেকে ফিরে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসে।কেমন জানি বুকের ভেতর টা খা খা করে উঠলো।হয়তো মায়ায় পড়ে গেছিলাম।উনি ও কাদঁছিলেন যাওয়ার দিন আর আমিও।আজ মাকে খুব মিস করছিলাম। আমার বোনের রিন শোধ করার মত নয়।আমি চাই ও না শোধ করতে।পরিবারকে ছাড়া থাকাটা অনেক কষ্টের।😂 মহিলা চলে যাওয়ার ৭দিন পরে ছেলে সহ আবার আসলেন।কোন অযূহাত না দেখিয়েই সরাসরি তার ছেলের বউ হওয়ার প্রস্তাব দিলেন।আমি সরাসরি না করে দিয়েছিলাম।কিন্তু তারা ২,জনেই নাছোড়বান্দা। একটা সময় পরে তারা কমিটি,মালিক আর আমার পরিবারের কাছে সিদ্ধান্ত জানানোর পরে সবাই আমাকে সুপারিশ করে বিয়ে টা করে নেওয়ার জন্য।যদিও আমার পরিবার কোন উত্তর জানায় নি।তবে আমার আপু ওই ভদ্রলোক কে চয়েজ করে রাজী হতে বলে। 😍 বিয়েটা হয়ে যায়।একসাথে থাকি আমরা সবাই।বিয়ের ৬মাস পরেই আমার স্বামীর কাজের জন্য আমি আমার শাশুড়ী সহ দেশের বাইরে চলে যাই।১ কন্যা সন্তানের জননী হয়ে ৫বছর পরে দেশে ফিরে আসি।এসেই ডিপোজিট এ এত দিনের রাখা সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৬লক্ষ টাকা তারা আমাদের দেয়। দেশে ফিরেই আগে আপুর সাথে দেখা করি।তারপর আমার স্বামীসহ সেই বৃদ্রাশম এ যাই।তারপাশেই আমরা আরেকটা বড় বৃদ্রাশ্রম আর পাশেই একটা ফ্যাশনিং ডিজাইন হাউজ বানানোর জন্য কথা বলতে যাই। আজ খুব মনে পড়ছে পরিবারের কথা ৫০টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলাম।আল্লাহ চাইলে কি না করতে পারে।জেদ করে সবাই সব সময় হেরে যায়না কেউ কেউ জিতেও যায়।বাসায় যাওয়ার আগে বৃদ্ধাশ্রমের সকলের সাথে দেখা করতে গিয়ে চক্ষু আকাশে উঠে যায় আমার। মাকে দেখে সেখানে।জীর্ন সীর্ন অবস্থায় এক বিছানায় শুয়ে আছে।আমি গিয়েই জড়িয়ে ধরলাম।মা ও আমাকে চিনতে পেরে কাদঁতে শুরু করে। আমার স্বামী কিছুটা অবাক হয়ে যায়।পরে অবশ্য বুঝতে পারে।কারন আমি তাকে সব বলেছিলাম বিয়ের আগেই। আমার মেয়েকে মায়ের কোলে দিলাম। তারপর বাবার কথা জিজ্ঞেস করলাম। মা জানালো বাবাও পাশের আরেকটা বৃদ্ধাশ্রম এ রয়েছে।মা আর বাবাকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসলাম।তাদের কাজের জন্য তারাই আজ ভোগান্তিতে আছে।তায় পুরানো ঘা খুচিঁয়ে তুলিনি। আপুকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম বাবা-মায়ের সাথে এত কিছু হয়ে গেলো আমাকে জানায়নি কেনো।আপু সাফ উত্তর দিলো এটা তাদের কর্মফল।আরে আমি তো তাও বৃদ্ধাশ্রম এ রেখে এসেছি রাসেল(ভাই) তো রাস্তায় ফেলে গেছিলো।আমার আর কিছু বুঝতে বাকি রইলোনা।আপুকেও দাওয়াত দিয়ে রাতে আমরা সবাই একসাথে ডিনার করলাম। আমার বোন পাশে না থাকলে হয়তো এতদুর আসা হতোনা।সত্যিই বড় বোন মানে বট বৃক্ষ,বড় বোন মানেই দ্বিতীয় মা,বড় বোন মানেই আবদারের ভান্ডার,বড় বোন মানেই ভালোবাসা। 🤔 ভুল ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন🤔

কোন মন্তব্য নেই: