Recents in Beach

একটি ব্যার্থ সফলতার গল্প!

পুরো আকাশটাকে মনে হচ্ছিল যম,যেন হঠাৎ করে আমার মাথার উপরে চেপে পড়তে পারে!আর আমি মরে যাবো তা নয়,আমার শরীরের অনেক বেশি ক্ষতি হবে যার জন্য আমি কষ্টে ছটফট করছি। এরকমই মনে হচ্ছিলো আমার তখন,কারণ সেই মূহুর্তের কথা আজও রয়েছে শুধু আজ বললে হবে না সারা জীবনই থাকবে। আমি যে ভুলটি করেছি সারা জীবন দিয়েই দিতে হবে সে ভুলের মাসূল! আমি আইমান আলম।আমি যখন অনেক ছোট তখনই আমার মনে স্বপ্ন জাগে ডাক্তার হবার,মনে মনে প্রতিজ্ঞাও করে নেই বড় হয়ে অনেক ভালো একজন ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবো।এরকমই স্বপ্ন দেখতে দেখতে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়া হয়।ফাইভের ফাইনাল পরিক্ষা সামনের মাসে,হঠাৎ একদিন বাবা বললেন আমাকে স্কুল পরিবর্তন করতে হবে।আমি মানা করি কিন্তু বাবা ত আর আমার মানা শুনার পাত্র নয়।তিনি বললেন ব্যবসার স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে তাই তার সাথে আমাকেও স্থান পরিবর্তন করতে হবে। অনেক জোর করার পরও কাজ হলো না,কি আর করবো তাই বাবার সাথে বাসস্থান পরিবর্তন করলাম। নতুন একটি শহরে বাবার সাথে পাড়ি জমালাম।এসেই বাবা আমার জন্য একটি স্কুল থেকে ফরম আনলেন এডমিশনের জন্য। আমাকে ভর্তি করা হয় নতুন একটি স্কুলে তবে হ্যাঁ ক্লাস ফাইভে নয়, এক ক্লাস পেছনে কেননা স্কুল কতৃপক্ষ ক্লাস ফাইভে আমাকে ভর্তি করেনি আর করবেই বা কেন? আর মাত্র ২৪-২৫ দিন বাকি আছে পরিক্ষার।আমার পুরো মনটাই উলোটপালোট হয়ে গেল।নতুন শহর, নতুন জায়গা, তার মধ্যে সারাদিন একা একা থাকতে হয়।যেমন স্কুলে তেমন বাসায়,বাবা পুরো দিনই তার অফিসে কাটিয়ে দেন আর আমি কিছুটা স্কুলে কিছুটা বাসায় টিভির সাথে।এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর আমার ভিতরে আবারও ডাক্তার হওয়ার প্রবঞ্চনা দেখা দেয়,তাই আমি আবার নিজের মত করে পড়াশোনা করতে শুরু করি।সব পরিক্ষায় ফলাফল খুব ভালো ছিল।কিছুটা দুষ্টুপ্রকৃতির ছিলাম, এর জন্য স্কুল থেকে মাঝে মাঝে গার্জেন্ট ডাকলে নিজাম চাচাকে বাবা পাঠাতেন।লাগাতার লেখা পড়া করে ক্লাস নাইনে উঠি।যেহেতু আমার সারা জীবনের স্বপ্ন ডাক্তার হওয়ার তাই আমি বাবাকে না বলেই সাইন্স নিয়ে নিলাম।ভর্তি হবার ৩-৫ দিন পর, বাবা জিজ্ঞেস করলেন আমি কি নিয়ে লেখা পড়া করতে চাই,আমি আমার স্বপ্নের কথা বলি;কিন্তু জবাবে বাবা বলেন ডাক্তার হওয়া অনেক কঠিন,সুতরাং আমি ডাক্তার হতে পারবো না।(সাইন্সে বা ডাক্তারি পড়লে অনেক টাকা ব্যয় হবে,এটিই ছিল মূল কথা)।আমি অনেক কান্নাকাটি করেও বাবার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারিনি।স্কুলের স্যারের সাথে কথা বলে বাবা আমার স্বপ্ন পরিবর্তন করে দিলেন। আমার সেই ছোট বেলা থেকে দেখা স্বপ্নটি বাস্তব হলো না।অনেক কান্নাকাটি করেছিলাম সেদিন কিন্তু কোনো লাভ হয় নি।বাবার প্রতি এক ধরনের ঘৃণার জন্ম হয় আমার মনে, তাই সিদ্ধান্ত নেই বাবার সাথে আর থাকবো না। দিনটি ছিল রবিবার,আমি সুযোগ বুঝে আমার দরকারি সমস্ত কিছু নিয়ে বাসা ত্যাগ করি।আব্বুর থেকে অনেক দূরে একটি শহরে পাড়ি জমাই।যেখানে না আছে কোনো রকম পরাধীনতা আর না আছে শাসন-বারণ। একটি বাসায় উঠি;আমার ফুপির বাসা।সেখানে দুই-তিন মাসা ভবঘুরে থাকার পর ফুপি আমাকে একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়।যদিও প্রথম প্রথম একটু উল্টো পাল্টা করেছিলাম কিন্তু কিছুদিন পর সব ঠিক হয়ে যায়।কেননা,ফুপির একটি মেয়েও আমার সাথে নাইনে পড়ে,তাই তার সাথে অনেকটা গভীর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। যতদিন যায় বন্ধুত্ব ততই গভীর হতে থাকে। এভাবে এস এস সি পরিক্ষা দেই। অনেক ভালো ফলাফল আসে আমার।আমার আর মহিমার সিদ্ধান্ত ছিল একসাথে দুজনেই একটি কলেজে ভর্তি হবো।প্রায় সব কাজই শেষ, শুধু ভর্তি হওয়ার বাকি।কিন্তু একদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে শুনি মহিমাদের পরিবারের সকলের বিদেশ যাওয়ার তারিখ হয়ে গেছে,কিছুদিনের মধ্যেই চলে যাবে(অবশ্য আগের আ্যপ্লাই করা ছিল)। মহিমা চলে গেল,সে আমেরিকা গিয়ে একটি কলেজে ভর্তি হলেও আমি ভর্তি হতে চাই নি।আবারও একা হয়ে গেলাম। একদিন সকালে ভাইয়া ফোন দিয়ে বললেন বিদেশ যাওয়ার জন্য আমাকে ন্যূনতম ইন্টারমিডিয়েট পাস করতে হবে।তাই আমাকে আবার কলেজ যেতে হবে। রীতিমতো কলেজে যাওয়া শুরু করি।কলেজে কারও সাথে বেশি কথা বলি না,কারও সাথে আবার বেশি মিশিও না।আমি নিজের মতো করে চলতে থাকি।মনের মধ্যে একটি ভয় কারো সাথে কথা বলতে বলতে মিশে যাবো আর কার সাথে যদি ঝগড়াঝাটি হয়ে যায় তাহলে কলেজ থেকে টিসি ধরিয়ে দিবে। প্রায় এক বছর এভাবে চলতে লাগলো এবং ১ম বর্ষ শেষ হয়ে গেল প্রায়। ইয়ার চেইঞ্জ পরিক্ষা কিছু দিন পর।১৫-২০ দিন বাকি আছে, হঠাৎ একদিন ঢাকা থেকে নিজাম চাচা ফোন করলেন;বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। বিকেল ৫ টার গাড়ি ধরে আমি ঢাকায় চলে গেলাম। ঢাকায় যাওয়ার পর দেখলাম বাবার অবস্থা বেশি ভালো নয়,স্কয়ার হসপিটালের সি সি উ তে ভর্তি। ডাক্তার বলেছেন হার্টে রিং বসাতে হবে, যেকোনো ভাবে ৪-৫ দিন থাকতে হবে। যাক,ডাক্তারের নিয়ম মতো হসপিটালে থাকা হয় ৪ দিন। এদিকে আমার পরিক্ষার দিন ঘনিয়ে আসছে, তিন মাসের বেতন বকেয়া ও পরিক্ষার ফি ও দেওয়া হয়নি। বাবাকে এই অবস্থায় রেখে কেমন করে আসি,আবার না এসেও কি করবো! হঠাৎ মনে হলো দূর সম্পর্কের একজন মামার কথা। তাঁকে ফোন দিলাম এবং বললাম সবকিছু,বিকাশে নিজাম চাচাকে দিয়ে টাকা পাঠাই মামার কাছে। বেতন বুক আমার রুমে টেবিলের ড্রয়ারে রাখা ছিল,পাশের বাসার আন্টির কাছে আমার বাসার চাবি ছিল। মামাকে বললাম বেতন বুক নিয়ে বেতনগুলো দিয়ে কলেজ থেকে আমার এডমিট কার্ড এনে রুমের ড্রয়ারে রাখার জন্য। একদিন পরে মামাকে ফোন দেই,ফোন রিসিভ হয়নি। আমি বাবাকে নিয়ে অনেক টেনশনে ছিলাম তাই পরে আর ফোনও দেইনি। পরিক্ষার দুইদিন আগে ঢাকা থেকে আসি,দিন ছিল বৃহস্পতিবার। বাসায় এসেই ড্রয়ার চেক করে দেখি বেতন বুক আছে কিন্তু এডমিট কার্ড নেই।যা বুঝার বুঝে নিলাম, সাথে সাথে মামাকে ফোন দেই রিসিভ হয়নি ফোন।একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধার পরে তার বাসায় যাই,সেখানে যাওয়ার পর যা শুনলাম তা বলা বাহুল্য!পরের দিন শুক্রবার, শুক্রবার ও শনিবার ব্যাংক বন্ধ থাকে, তাই আমার আর বেতন দেওয়া হলো না। কলেজে যোগাযোগ করলেও কোন লাভ হয়নি। আমি যেহেতু প্রাইভেট কলেজে পড়তাম তাই সেখানকার নিয়ম একটু কড়া।একটি বন্ধুর সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিলাম প্রাইভেট কলেজ থেকে টিসি নিয়ে পাশের একটি সরকারি কলেজ ভর্তি হবো। আমি আমার একজন স্যারের সাথে যোগাযোগ করি টিসির জন্য।তিনি আমাকে বললেন দুই বছরের বেতন দিয়ে টিসি নিতে হবে।যেহেতু আমার চোখে এতদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অথবা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন বাসা বেধে নিয়েছে তাই স্যারের চুক্তিতে রাজি হয়ে গেলাম।আমার বন্ধু সরকারি কলেজ থেকে কাগজ পত্র এনে ভর্তির কাজ প্রায় সম্পন্ন,এখন শুধু টিসি পেপার জমা দেব আর ইয়ার চেইঞ্জ পরিক্ষা দেব। কিন্তু এরই মধ্যে আবার…! একদিন দুপুরে মেসেঞ্জারে স্যারের একটি মেসেজ আসে,বলেন তাঁর সাথে ফোন করে কথা বলার জন্য। যথারীতি মতো আমি সন্ধার পরে ফোন দেই। স্যার আমাকে বারন করেন আমি যেন আর টিসির বিষয়ে ভিপি স্যারের সাথে কথা না বলি।আমাকে এই সেই বলে ভয় দেখান।আমি স্যারের ভালোর জন্য টিসির খোঁজে আর কলেজে গেলাম না।মনে করলাম আমার ত আর কোন স্বপ্নই পূরণ হবে না তাহলে অন্যের জীবন যাত্রায় কেন বোঝা হব। আমি নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে ব্যর্থ মানুষ মনে করি কিন্তু একবারও মনে হয় নি স্যার আমার সাথে মিথ্যা কথা বলছেন। স্যারের মিথ্যার প্রমাণিত হয় কয়েকদিন পর ভিপি স্যারের সাথে একটি কফি হাউজে দেখা হয়।সেদিন আলোচনা সাপেক্ষে আমি বুঝতে পারলাম আমি যদি টিসির জন্য কলেজ যেতাম তাহলে ক্লাস টিচারের চাকরিও যেতে পারতো (আমাকে পরিক্ষার হলে ঢুকতে না দেওয়ার অপরাধ) আমি ভিপি স্যারকে ক্লাসটিচার এর বিষয়ে কোন কথা বলিনি শুধু নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করছিলাম। আমার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিল আব্বুর কারণে আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং শাবিতে পড়া হয়নি স্যারের দূর্নীতির কারণে! ভবঘুরে হয়ে জীবন-যাপন করতে লাগলাম। একদিন একটি স্টেটাস চোখে পড়লো আমার অনেক প্রিয় একজন স্যারের। তাতে লিখা রয়েছে ‘ আমার ছোট থেকে স্বপ্ন ছিল দুইটি,শিক্ষক অথবা সেনাবাহিনী হওয়া।সেনাবাহিনী হতে পারবো না কোনদিনও এটি মনে হয় মহান আল্লাহ আমার কপালে লিখে দিয়েছেন। কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি, আমি আমার মতো করে চলেছি।ফলস্বরূপ পেয়েছি একটি চাকরি, আল্লাহর অশেষ রহমতে সেনাবাহিনী ও শিক্ষকতা দুইটির মোহনায় ❤’ স্যারের উচ্চতা কম তাই সেনাবাহিনী হতে পারেননি কিন্তু এমন একটি চাকরি হয়েছে যেখানে সেনাবাহিনী তৈরি করা হয়। একসাথে স্যারের দুইটি স্বপ্ন পূরণ হয়, ক্যাডেট কলেজে স্যারের একটি মহা মূল্যবান চাকরি হয়। সেদিন স্যারের জীবনী থেকে শিক্ষা নিয়ে আমি মনে মনে কথায় আবদ্ধ হই কোনদিন কোন কাজে আশা ছাড়তে নেই। সফলতার পিছনে না দৌড়ে নিজেকে সঠিক ভাবে প্রস্তুত করতে পারলে সফলতা আপনার কাছে আসবে।…

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ