পরিবর্তন

গল্পঃ "পরিবর্তন" 😍^^^_____^^^^😍😍😍^^^^_____^^^^😍 "আজ ফাগুনি পূর্ণিমা রাতে চল পলায়ে যাই..... এই ফাগুনি পূর্ণিমা রাতে চল পলায়ে যাই'------- বিয়ের পর থেকে এই গানগুলো উপভোগ করতে দারুণ লাগে। যদিও বিয়ের আগে কোনো প্রেম হয়ে ওঠেনি। তারপরও বিয়ের আগের জীবনটা বিন্দাস কেটেছে। এই বিয়ের পর বউয়ের নানা নিয়ম-কানুনে অতিষ্ঠ্য আমি। এই পছন্দের রোমান্টিক গান শোনা যাবেনা, রাত ৯ টার পূর্বে বাড়ি ফিরতে হবে, সিগারেটে সুখটান দেওয়া যাবেনা। যে ছেলেটার জীবনটা কেটেছে ঐ রাত-বিরাতের আড্ডাবাজী,সিগারেটের ধোঁয়ায়,আর বন্ধুদের সাথে হিন্দি গানে আসর মাতিয়ে তাঁর কি আর শিকল পরানো বন্দী জীবন ভাল লাগে! তারপরও এই অতিষ্ঠ্য জীবনটাতেও স্বাদ আছে। মজ-মাস্তী জীবনের থেকেও বিকল্প এক প্রেম আছে। যে প্রেম ক্ষণিকের নিকোটিনের নেশার থেকেও তীব্র। আর আবেশ সাগরের এপাড় থেকে ঐ পাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম,এস,সি, শেষ করে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ নিয়েছিলাম। বেতন ভাল। দিনে অফিস শেষ করে সন্ধ্যায় মদ,বিয়ারের গন্ধেই সুখ ছিল। মাঝে মাঝে অস্থির লাগতো, তবে বন্ধু-বান্ধুবীদের মজার আড্ডায় বিষন্নতা হারিয়ে যেতো। বিয়ে করার প্রয়োজনবোধ কখনো মনে হতো না। সবই ছিল জীবনে। বাড়ি থেকে মা কতোবার যে ফোন দিতো বিয়ের জন্য মেয়ে দেখেছে বলে। আমার কোনো পছন্দ আছে কি না? আরও নানা প্রশ্ন! আমি মা কে একটা কথায় বলতাম এখন আমি বিয়ে করবোনা। মা এ কথা শুনে কষ্ট পেতো কি না জানিনা!আমার কষ্ট হতোনা একদম। , তারপর একটা সময় বন্ধু-বান্ধুবীদের বিয়ে হতে শুরু হলো। আড্ডা দেওয়ার জন্য ফোন দিলে নানা অজুহাত দেখিয়ে আসতো না। নিজের জীবনের প্রতি নিজেরই একটা বিরক্তবোধ কাজ করতে শুরু করলো। একাকীত্ব বাড়তে থাকলো। অফিসে মন বসেনা। কাজ ঠিক মত হয়না। কোম্পানির এমডি অফিস কক্ষে ডেকে কথা শুনাতে শুরু করলো। সবকিছুই কেমন যেনো এলোমেলো হয়ে যেতে লাগলো। হুট করে একদিন মা ফোন করে নিজের অসুস্থতার কথা বলে বাড়িতে ডাকে। মায়ের প্রতি প্রতিটা সন্তানের যেমন টান থাকে,আমারও সেটা ছিল। তড়িঘড়ি করে বাড়িতে আসি। এসে দেখি মা পুরা সুস্থ। মা সন্ধ্যায় আমাকে নিয়ে অনেক গল্প করলো। অতি আবেগঘন হয়ে নিজের ছেলের বউ ঘরে আনার আবদার করলো। মমতাময়ী মায়ের চাওয়া অবিবাহিত সন্তানেরা ফেলতে পারেনা। অগত্য কথা না বাড়িয়ে রাজি হতে হলো। পরের দিনই মা নিজের বান্ধুবীর মেয়েকে দেখতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে ঠিক করে ফেললো। , বিয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম মেয়ে আমার টাইপের না, মানে হচ্ছে মনের সাথে মিল নেই। কেমন গেঁয়ো গেঁয়ো ভাব! কোথাও ঘুরতে গেলে পরতে বলি শাড়ী, ও উল্টো নিকাবসহ বোরকা পরে বসে থাকে। মায়ের সামনে রাগের মাথায় বকুনিও দিতে পারিনা! এইতো সেদিন বন্ধুর বিয়েতে গেছি। ও বোরকা পরে গেছে। পুরোনো দিনের বন্ধু-বান্ধুবীরা সবাই এসেছে বাহারী ড্রেসআপে। আর বউ আমার নিকাবে বন্দী। বন্ধু-বান্ধুবীরা কতো জোরাজুরি করলো ভাবির মুখ দেখবে,সাথে আমিও অনেক রিকুয়েস্ট করলাম। কিন্তু না বউ আমার হিজাব খুলবে না, আমাকে অপমান করেই ছাড়লো সবার সামনে। রাগে ক্ষোভে আমার শ্যামলা বরণ মুখ কয়লা বর্ণ হয়ে গেলো। বাড়ি ফিরে রুমে নিয়ে দুই গালে দুইটা কষে চড় বসিয়ে দিলাম। সাথে সাথেই ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করে দিলো। মাথায় রাগ নিয়েই বেরিয়ে এলাম বাড়ি থেকে। , বাজারে গিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে বাজারের পশ্চিমে স্কুল মাঠে গিয়ে বসলাম। একটার পর একটা সিগারেট টেনে সব শেষ করি। অন্য মনস্ক হতে নিরালায় সিগারেটের ধোঁয়া বেশ কার্যকর। বিতর্কিত মনে কেউ সঙ্গ না দিক ও কখনো দূরে ছাড়বেনা। অনেক রাত করে বাড়ি ফিরলাম। বউ খাবার নিয়ে টেবিলে বসে আছে। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সময়টা দেখে নিলাম। রাত ১২:৩১ মিনিট। মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগলো। এতো রাত তারপরও বউ খাবারের টেবিলে বসে অপেক্ষা করছে আমার জন্য। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হতেই গামছাটা এগিয়ে দিলো। পানি মুছে খাওয়ার টেবিলে বসলাম। বউ একটা চেয়ার টেনে একদম আমার গাঁ ঘেঁষে বসে প্লেটে খাবার তুলে দিলো। আমার প্রিয় টেংরা মাছের ঝল আর পেঁয়াজ তেলে ভাঁজে আলুর ভর্তা করেছে। খাবার মুখে দিবো এমন সময় মনে পড়লো 'যার প্রতি এতো রূঢ় আচরণ করেও এতো সুন্দর করে আমার প্রিয় খাবার রান্না করেছে সে কি খেয়েছে?' বউয়ের মুখের দিকে তাকালাম। মুখ শুকনো কিন্তু চোখে জল টলমল করছে। কি মনে করে বললাম "হা করো।" কিছুক্ষণ বউ ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলো। আবার বললাম "প্রিয়া হা করো।" ও হ্যাঁ আমার বউয়ের নাম প্রিয়া। বিয়ের এক বছর পার হওয়ার পর প্রথম বউকে খাইয়ে দিলাম। প্রিয়ার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো আমার হাতে। ওর মুখের দিকে তাকালাম। খুব মায়া হলো। এই নিষ্পাপ মেয়েটার গায়ে হাত তুলেছি আমি! নিজেকে মনে মনে ধিক্কার দিলাম কাপুরুষ বলে। মানুষ জন্মগত ভাবেই সৎ এবং অন্যের দুখে মমতাময়ী। মমত্ববোধ তখন প্রকাশ পায়,যখন কাছের সে অসোহায় হয়। প্রিয় মানুষগুলোর অসোহায় মুখ দেখে অসম্ভব রকম মায়া হয়। আর কারও প্রতি দূর্বলতা উপলব্ধির অনুভূতিই হল মায়া। আর এই মায়া থেকেই জন্ম নেয় ভালোবাসা। প্রিয়ার চোখের পানি মুছে দিলাম। জীবনে প্রথম কোনো মেয়ের প্রতি দূর্বলতা অনুভব করছি। কবি সাহিত্যিকের মতে এ দূর্বলতার নাম যদি প্রেমের প্রথম ভাগ হয়,তবে আমি সত্যি সত্যি প্রেমে পড়তে চলেছি। আনমনে মন গেয়ে ওঠে- "মাঝি উঠিয়ে নাও তোমার নোঙরখানা হারিয়ে যেতে আজ নেই মানা, ভাবনার জগতে গভীরতা বেড়েছে যা ভাবি রঙিন লাগে ভাবনার পুরো আকাশ জুড়ে কেবলি সে--" "পানি খাবে?" বউয়ের ডাকে বাস্তবে ফিরলাম। ও পানি খাইয়ে দিলো। খাওয়া শেষ করে আমি বিছানায় গেলাম। , বিছানায় আধোসোয়া হয়ে বালিসে হেলান দিয়ে ভাবছি। এমন সময় বউ ঘরে প্রবেশ করলো। বিছানে ঝেড়ে সুয়ে পড়লো পাশেই। সুয়ে থেকেই আমার দিকে পাশ ফিরে বলল "তুমি কি কোনো বিষয়ে চিন্তিত?" আমার না সূচক উত্তরে প্রিয়া চুপ হয়ে গেলো। আজ বউয়ের মাথায় হাত বুলাতে ইচ্ছে করছে অনেক। কিন্তু কোনো ভাবেই পারছিনা। লজ্জা আর ইতস্ততবোধ কাজ করছে। "প্রিয়া আমি দুঃখিত তোমার গায়ে হাত তুলার জন্য।" আমার কথা শুনে প্রিয়া বালিসে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করলো। অজান্তে প্রিয়ার মাথায় হাত বুলাতে থাকলাম। বালিসটা নিচে রেখে সুয়ে পড়লাম পাশে। টেনে আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। তখনো চোখের পাতা ভেজা। আবারও Sorry বলে ক্ষমা চাইলাম। ও হালকা হেসে বললো ঠিক আছে। কিন্তু "তুমি কি চাও তোমার বউকে সবাই দেখুক?" আমি বলি "না,কখনোই না। কিন্তু ওরা তো আমার বন্ধু ছিল।" আমার বউ মুচকি হেসে বললো "ওরা তোমার বন্ধু ছিল ঠিক আছে। কিন্তু পরে যখন তোমার বউকে দেখার পর তাদের আর অন্য বন্ধুদের সামনে আমার শারিরীক বর্ণনা দিতো সেটা ঠিক? কিংবা আমাকে দেখে মনের মাঝে বিকৃত কোনো ধারণা করতো এসব ঠিক?" আমি প্রতি উত্তরে বললাম "না এটাতো ঠিক না।" বিষয়টা নিয়ে আমি বেশ কিছুক্ষণ ভাবলাম। তারপর আমার মনে হলো আসলে তো আমার বন্ধুদের অনেকের বউ কালো/দেখতে ভাল না,তা নিয়ে বন্ধুরা অনেকে হাসাহাসি করি। প্রথম ধাপের প্রেমে পড়া থেকে আমি কারও প্রতি প্রথম আকৃষ্ট হলাম। আকৃষ্টতার গাঢ়ত্ব আমাকে দিনকে দিন পাগল করে চলল। প্রেমের কথা বলতে পারিনা,তবে আকার ইঙ্গিতে প্রকাশ করতে থাকলাম একটু করি। এই ধরুণ বাজার থেকে ফেরার সময় প্রিয়ার পছন্দের ঝালমুড়ি, কপ্তা নিয়ে আসি। কোনোদিন টেবিলে ছোট চিরকুট লিখে রাখি "মাশাআল্লাহ্ তোমাকে আজ অনেক সুন্দর লাগতেছে।" কাছে আসার গভীরতার গল্পগুলো সাঁজানোর থেকেও বাস্তব মনে হতে লাগলো। এতোকিছুর পরও দুজনের পারস্পারিক লজ্জা কমেনি। একদিন দুপুরে রুমে ঢুকে দেখি টেবিলে একটা চিরকুট। গভীর আকর্ষণবোধ থেকে চিরকুটটা হাতে নিয়ে খুললাম। তাতে বড় বড় হরফে লিখা অনেকগুলো লাইন। লাইনগুলো হচ্ছে এমন- "আমি তোমার সাথে প্রেম করতে চাই। স্কুল,কলেজ জীবনে পরিবারের আনুগত্যে প্রেম করা হয়ে ওঠেনি। ইচ্ছে ছিল বিয়ের পর জামাইয়ের সাথে প্রেম করবো। এটা আমার সব থেকে বড় স্বপ্নও বলতে পারও। তোমার সাথে খোলা মাঠে বসে মন খুলে কথা বলতে অনেক ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হয় তোমার মাঝে হারিয়ে যেতে। অনেক ভালোবাসি তোমাকে।এটাও বলা হয়নি। একটা কথা বলি প্লিজ রাগ করোনা প্লিজ। আমি জানি তুমিও আমাকে ভালোবাসো। আর তোমার বউ হিসেবে অনুরোধ করে বলছি গো কলিজা দয়া করে সিগারেটটা ছাড়ও প্লিজ। মুখের গন্ধটা আমার অসহ্য। ভালোবাসি বলে সহ্য করি। তবে এটা ছাড়তে পারলে তোমাকে স্পেশাল সারপ্রাইজ দিবো সত্যি বলছি।" চিরকুটটা পড়া শেষ করে কি করবো ভাবছি। মেয়েটা মানে আমার বউয়ের প্রতি আরও দূর্বল হয়ে পড়েছি। একদিকে অজানা সারপ্রাইজ এর আগ্রহ আর নতুন প্রেমের আকর্ষণ,অন্যদিকে দীর্ঘ দিনের নেশা সিগারেট! কোনোটা থেকেই নিজেকে আলাদা করা ভাবতেই পারিনা! ......চলবে----------------

কোন মন্তব্য নেই

diane555 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.