মঙ্গলবার, ৬ আগস্ট, ২০১৯

নীল ও রহস্যময় পরী

বিকেলে নিশির ফোনে ফের কল আসে ৷ অচেনা নাম্বার থেকে! জানতে পারে, নীল জেলখানায় বন্দি! কিসের কারণে তাকে জেলে আটকানো হলো এটা জানতে পারেনি! এমন খবর পেয়ে তার বুকটা কেঁপে ওঠে ৷ কষ্ট অনুভব হয় ৷ আবার মানুষটার প্রতি তার রাগও হচ্ছিল খুব! অবশ্যই সে অন্যায় করেছে যে কারণে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে ৷ অন্যায় না করলে তো ধরতো না! রাগে দূঃখে কাঁপতে কাঁপতে কান্না চলে আসলো তার এবং চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রুজল পড়তে থাকে ৷ সে ভাবছিল, “এমন দুঃসংবাদ কি নাবিলা ভাবিকে দিব? নাকি সেও জানে? ভাইয়াকে বলা দরকার!" সে তার ভাইকে ফোন দিয়ে কান্নামাখা স্বরে বলল, ____ভাইয়া, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে! ____সর্বনাশ হবার ছিল তাই হয়েছে ৷ মার্ডার করেছে সে! সাজা তাকে পেতেই হবে! . নিশি কান্নার মাত্রা আরো বাড়িয়ে থেমে থেমে বলল, ___কাকে? কেন মার্ডার করলো? ___নীলকে তার এক শত্রু মারতে আসছিল ৷ রাগ সহ্য না করতে পেরে উল্টা তাকেই ওর হাতে নিহত হতে হয়! মাথায় ইট দিয়ে বারি মেরে নিহত করে ফেলে ! . এটা শোনার পর নিশির হাত থেকে ফোন পড়ে যায় ৷ তার জ্ঞান হারানোর উপক্রম হয় ৷ সে এমন কথা শুনেছে যেটা তার বুকে তীরের মত বিঁধেছে ৷ মানুষটা তার থেকে অনেকদূর চলে যাচ্ছে এটা সে অনুমেয় করতে পারলো! নীল তো এমন রাগী ছিলনা! মানুষটা ছিল কাদা মাটির মত! সহজ-সরল সাদা সিদা মানুষ ছিল সে! তাকে প্রথমবার দেখেছিল তার ভাইয়ের বিয়ের জন্য নাবিলাকে পাত্রী হিসেবে দেখতে যাবার দিন ৷ পাত্রী হিসেবে নাবিলাকে তার দারুণ পছন্দ হয়েছিল ৷ তবে পাত্রীর ভাই নীলকে তার অসহ্য লাগছিল ৷ মানুষটা এত কালোর কালো যে তার দিকে নজর দেওয়া যাচ্ছিলনা ৷ কিন্তু যখন সে কথা বলা শুরু করলো তার কথায় মুগ্ধ হতেই হলো নিশি সহ সবাইকে ৷ নীল এত সাবলিল ভাবে কথা বলে যা শুনে যে কেউ মুগ্ধ হবে ৷ তার কিছু কথা যদিও বোকাবোকা লাগে! তবে কথাগুলো বাস্তবসম্মতই এবং সেসব কথা ভাবনার জগতে মিশে যেতে বাধ্য করে! নাবিলা ও আতিকের বিয়ের দিন নীল চমৎকার একটা সাদা পাঞ্জাবী পড়ে! যদিও ওটা ছিল তার বোনের পছন্দ করা, তার বোনের কথামত সেটা পড়ে! কালো মানুষকে সাদা রংয়ে ভালই লাগে! নিশি তাকে এমন রুপে দেখে খুশি হয় ৷ বাড়ি ভর্তি মেয়ে মানুষ অধিকাংশ নিশির বয়সী ৷ অথচ নীল তাদের কারো সাথে কথাবার্তা না বলে একাকী দাঁড়িয়ে বা বসে সময় কাটাতে থাকে ৷ কখনো বা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ৷ সময় পেয়ে কয়েকটা ছেলেপুলের হাতে কফি ক্যান্ডি ধরিয়ে দেয় ৷ নীলের অভ্যাস হচ্ছে যখন তার মন খুব ভাল থাকে তখন শিশুদের হাতে কফি ক্যান্ডি তুলে দেওয়া! . বিয়ের রাত্রে ঝামেলা বাঁধে কাজী সাহেবকে নিয়ে ৷ রাত ৯টার দিকে ওনার আসার কথা অথচ উনি আসছেন না ৷ শুরু হয়ে যায় বিয়ে বাড়িতে ঝামেলা ৷ নীল বাধ্য হয়ে তার পরিচিত কাজীকে ফোন দেয় কিন্তু ফোনটা বন্ধ পায় ৷ কোনো উপায় না পেয়ে চলে যায় সেই কাজীর বাসায় ৷ দেখে তিনি অসুস্থ্য অবস্থায় পড়ে আছে! ঐ কাজী আরেকজনের নাম বললে নীল তার ঠিকানায় চলে যায় এবং সেই কাজীকে সাথে নিয়ে বাসায় ফেরে ৷ রাত তখন ১০টা বেজে গেছে ৷ উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল ঝগড়া শুরু হয়ে গেছে ৷ পাত্রপক্ষ তো বলছে, “এই বিয়ে আমরা করতে দিবোনা"! শুধু পাত্র বলছে, “বিয়ে না করে কোথাও যাবনা!" যখন কাজীকে সাথে করে আনা হলো তখন সবাই চুপ হয়ে যায় ৷ বিয়ের কাজ শুরু হয়ে যায় ৷ নিশি ভাবে মানুষটা কালো হলেও সঠিক সময়ের কাজ সঠিক সময়ে সঠিক ভাবে করতে পারে! নিশি তার কার্যদক্ষতা দেখে তার প্রতি প্রথমবারের মত মুগ্ধ হয়! যখন বিয়ে সম্পন্ন হলো তার ঠিক ১০মিনিট পর নিশির বাবার বমির ভাব শুরু হয়ে যায় ৷ এরপর অনবরত বমি করতে থাকেন তিনি ৷ নিশি তার বাবার এমন অবস্থা দেখে ওনার মাথায় হাত দিয়ে দেখে জ্বরে একদম পুড়ে যাচ্ছেন ৷ জ্বরের সাথে মাথাব্যাথা, যে কারণে বমি শুরু হয়ে গেছে! আশেপাশে ফার্মেসি না থাকায় নীলকে আবারো ছুটতে হয় বাইরে ৷ ডাক্তারকে ফোন দিলে ফোন রিসিভ করেনা, তাই বাধ্য হয়ে ডাক্তারের বাসাতেই যেতে হয় ৷ ডাক্তারের বাড়ি পৌঁছে তাকে রোগী সম্পর্কে অনেক কিছু বলার পর অবশেষে রাজি হয় রোগী দেখার জন্য! প্রয়োজনীয় ঔষুধ সাথে নিয়ে চলে যায় নীলদের বাসায়! ডাক্তার নিশির বাবাকে দেখার পর ট্যাবলেট দিয়ে দেয় ৷ ট্যবলেট খাওয়ার ১৫ মিনিট পর উনি অনেকটা সুস্থ্য হউন! . রাত সাড়ে এগারোটার দিকে পাত্রপক্ষ কোনেকে নিয়ে রওনা দেয় বাসার উদ্দেশ্যে ৷ বড় বোনকে বিদায়ের বেলায় নীল আবেগকে সংবরণ করতে না পেরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ৷ কান্নায় জর্জরিত হয়ে বোনকে জড়িয়ে ধরে ৷ ভাই বোন মিলে শিশুদের মত কান্না করতে থাকে ৷ যখন নীলের বয়স ১১ তখন থেকে বোনটা তাকে মায়ের মত ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছিল ৷ তার জন্যই নাবিলা বিয়ে করতে এত দেরি করে ৷ তার ইচ্ছায় ছিলনা বিয়ের ৷ ছোট ভাইয়ের জোরাজুরিতে অবশেষে বিয়েতে রাজি হয় সে! এখনই সে চলে যাবে তার প্রাণপ্রিয় ভাইকে ছেঁড়ে অন্যের ঘরে! ভাই বোনের এমন ভালবাসা দেখে নিশিও আবেগাপ্লুত হয়ে দু-ফোটা চোখের জল ঝরায় ৷ নীলের প্রতি ভাললাগার শুরু এখান থেকেই ৷ সে তার হ্নদয়ে নীলের নামটি খোদায় করে নেয় ৷ কল্পনাজুড়ে তার নামটা জপা শুরু হয়ে যায়! . বিয়ের পর দ্বিতীয়বার যখন নীল নিশিদের বাসায় আসে সেইবার তার পড়নে ছিল লাল শার্ট,হলুদ প্যান্ট, চোখে কালো চশমা ও মাথায় লাল ক্যাপ! এমন রুপে দেখে নিশি প্রচন্ডভাবে রেগে যায় ৷ সে ভাবে, “মানুষটা পোশাক-আশাকে পুরোই ক্ষেত ৷ রুচিহীন মানুষ ৷ একে সোজা করার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে!" . সেদিন বিকেলে নিশি তার কাছে গিয়ে একটু তাচ্ছিল্যকর ভাব নিয়ে বলে, ___কি ব্যাপার আপনি তো পুরাই ক্ষেত! এমন ক্ষেত মানুষ এই যুগে দ্বিতীয় কেউ আছে? একটু মডার্ণ হতে পারেন না? আমার ভাইটার কপাল পোড়া ৷ শেষপর্যন্ত একটা টোকাইমার্কা শালা পেল! . নিশির অপমানজনক কথা শুনে নীলের চোখ মুখ লজ্জায় লাল টুকটুকে হয়ে যায় সেই সাথে ঘেমে একাকার! তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল কয়েকটা ক্ষ্যাপাটে মেয়ে তাকে ধরে নাস্তানাবুদ করেছে ৷ তাই অপমানে লজ্জায় এমন অবস্থা হয়েছে ৷ যদিও নিশি একা যেভাবে তাকে নাস্তানাবুদ করলো সেটাই তার জন্য অনেক বেশি অপমানের! নিশি তার এমন চেহারা দেখে মনে মনে খুশিই হয় ৷ এবং ভাবতে থাকে বোকাটাকে নিয়ে এভাবে মজা করা যাবে, মনের মানুষের সাথে মজা করার স্বাদই আলাদা! তারপর থেকে নিশি একাধারে নীলের সাথে মজা করা শুরু করে দেয়! নীল এতে অনেক বেশি রেগে গেলেও সে তাকে উল্টা জবাব দিতে পারেনা ৷ একসময় নিশি উপলদ্ধি করতে পারে তার সাথে এতটা মজা করা ঠিক হচ্ছেনা ৷ এভাবে চলতে থাকলে তার মনে বাজে ধারণা পোষণ হবে তাকে নিয়ে ৷ এজন্য নিজেকে নীলের নিকট ভিন্নভাবে প্রকাশ করা শুরু করে ৷ কিন্তু এতে তার কোনো লাভ হচ্ছে কিনা নিশি বুঝে উঠতে পারছেনা! . . নীল জেলখানায় ৷ এ খবর পাবার পর নিশি বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কান্না করেছে ৷ সন্ধ্যা পর যখন আতিক ও নাবিলা বাসায় এলো তখন তার কান্নার মাত্রা আরো বেড়ে গেল ৷ ভাইকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ___আমি ওকে জেলে দেখতে পারবোনা ৷ তুমি যেভাবে পারো জেল থেকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করো ৷ আমি কালই ওকে আমার পাশে দেখতে চাই! . আতিক তার বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, ___আরে বোকা, সকালেই ছাড়া পাবে ৷ আমি মিথ্যা বলছিলাম তোকে, ওকে সামান্য কারণে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে! অনেক কষ্টে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নাবিলার কান্না থামিয়েছি ৷ এখন যদি তুই না থামিস তবে আমি কিন্তু রাগ করে চলে যাব! . নিশি শাড়ির আচল দিয়ে চোখের পানি মুছে ফিক করে হাসি দিয়ে বলে, ___ঠিক আছে, আর কাঁদবোনা ৷ এই দেখো চোখে আর পানি নেই! . . নীল জেলখানায় ঢুকে বরুণ মিয়ার সাথে গল্পে মজে আছে ৷ বরুণ মিয়া দেখতে শ্যামবর্ণের, হালকা পাতলা গড়নের ৷ ১মাস ধরে গোসল না করলে যেমন দেখা যায় তেমন দেখতে সে ৷ নাকটা একদম বোচা ও দুপাশে মোটা, চোখটা তলানিতে চলে গেছে ৷ চুল বড়বড় খুশকি দিয়ে ভরা, এলোমেলো হয়ে আছে ৷ কন্ঠস্বর একদম কর্কশ ৷ সে মার্ডারের আসামী ৷ তার বউকে পিটিয়ে হত্যা করে এখন জেলে পঁচতেছে! বরুণ মিয়া নীলকে সেই কাহিনী শুনাচ্ছিল এতক্ষণ! সে বলছিল, ____ভাই আমারে দেইক্ষা কেউ কইতে পারবো আমি বউকে খুন কইরছি? আমার চেহারা সেইটা কয়? . নীল তার কথা শুনে হকচকিয়ে ওঠে এবং ভ্রু-কুঁচকে জবাব দেয়, ____না না, আপনারে একদম সিনেমার হিরোদের মত লাগে ৷ আপনারে দেখে মনে হয় সালমান খান! আপনার মত সুদর্শন লোক খুনের আসামী হতেই পারেনা ৷ আপনার মত স্মার্ট লোকের সাথে একই জেলে থাকতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি ৷ আপনাকে দেখে তো আমার মনে হয় কয়েকটা মেয়েকে পটিয়ে মাত্রই জেলে আসছেন! . নীলের মুখ থেকে একনাগারে প্রশংসা মূলক কথা শুনে বরুণ খুশিতে আটখানা হয়ে তার সাথে করমর্দন করে এবং বলে, ___একমাত্র আপনেই আমাকে চিনবার পাইরলেন ৷ আপনের চোখ আছে ভাই চোখ আছে! তয় একটা কথা বলি ভাই? ____কি কথা বলবেন? ____রাগ কইরবেন না তো? ____নাহ, বলো ৷ আমি সবার কথায় রাগিনা! রাগ আমার সাথে বন্ধুত্ব করে নিয়েছে ৷ যখন আমি বলবো রাগ করো তবেই রাগ করবে! যদি তোমার কথায় রাগ হতেও চায় তবুও রাগকে বলবো না রাগ করিস না ৷ এখন তোর রাগ করা নিষিদ্ধ! ____ঠিক আছে, কইয়া দিই তবে! এইযে আপনে যে মাপের কাইল্লার কাইল্লা, আপনের বউ আপনের দিকে পীড়িতের দৃষ্টি লইয়া তাকায়ছে কোনোদিন? আপনেরে দেইক্ষা কিন্তু পায়খানা ছাফ করা লোকদের মত লাগে! . এমন কথা শোনার মত নীলের মাথায় আগুন ধরে যায় ৷ মনে হচ্ছিল মাথায় কেউ পেট্রোল তেলের সাথে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে ৷ মাথা দিয়ে ধোঁয়া উড়ছিল মনে হচ্ছিল ৷ চোখ দুটো ভয়াবহ রকমের রক্তিম হয়েছিল ৷ তার এমন অগ্নিমূর্তি রুপ দেখে বরুণ আলী ভয়ে বিড়ালের মত হয়ে যায় ৷বারবার ঢোক গিলতে থাকে সে! নীল রাগ করবেনা বলে কথা দিয়েছিল তাই নিজের রাগকে সংবরণ করে বরুণের মাথার এলোমেলো চুলগুলো ধরে বলল, ___তুমি ঠিক বলছো ৷ আমার এই চেহারার জন্য আমার বউ তাকাতে চাইবেনা ৷ কিন্তু তুমি জানো আমার এমন চেহারার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে দুই দুটা সত্তা! একজন আমার বেয়াইন আরেকজন পরী! আমি পরীর ভালবাসায় সাড়া দিব ৷ কিন্তু দুদিন ধরে পরীর দেখা পাচ্ছিনা, হয়তো রাগ করেছে! জেল থেকে ছাড়া পেলেই পরীর সাথে দেখা করবো! . বরণ আলী নীলের কথাগুলো এতটাই মনোযোগ দিয়ে শুনছিল যে মনে হচ্ছিল তাকে সম্পত্তির উইল পড়ে শোনানো হচ্ছে তাই মনযোগ দিয়ে শুনছে, যদি এতে ঠিক মত মনযোগ দিতে না পারে তবে সমস্যা হয়ে যেতে পারে! বরুণ হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলো কৌতূহলের চোটে, ____পরীকে কোনহানে দেখা যায়? আমিও যাইতাম একদিন! আমি তো গ্যারান্টি দিয়া কইবার পারি ঐ পরী আমার হিরো মার্কা চেহারা দেইখা প্রেমে পইড়া যাইবো! . নীল বরুণের কথা শুনে থ মেরে গেল ৷ মনে মনে বলল, “কোথাকার পাগলের কাছে এসে পড়লাম, এ তো চাপা মেরে পাহাড় ভেঙ্গে ফেলবে, নিজের চেহারা যে গোবরের মত সেদিকে খবর নাই, আসছে আরেকজনকে নিন্দানো নিয়ে'! . তখনই আরেকজন আসামীকে এনে তাদের কক্ষে রাখা হয়! লোকটাকে দেখেই মনে হচ্ছিল মাতাল ৷ কক্ষে ঢুকেই বরুণকে বলে ওঠে, ___তুই আনারস দিয়া দুধ খায়তে পারবি? পারলে তোরে দুই কোটি নিরানব্বই লাখ নিরানব্বই হাজার নিরাব্বই টাকা কম ৩কোটি টাকা দিমু! . বরুণ মিয়া নতুন আসামীর কথা না বুঝেই বলল, ___অবশ্যই পারুম ৷ ওতো গুলা টাকা দিলে আরো পারুম ৷ একবার আমার বউ কইছিল দুধ খাওনের পর আমি আনারস খায়তে পারুম কিনা? কইছিলাম পারুম ৷ পরে বউ দুধ দিল তারপর আনারস খাইলাম ৷ কিচ্ছু হয়নাই তো! ___ঠিক আছে তাইলে কথা দিলি তো? ___হুম কথা দিলাম! ___তাইলে জেল থেইক্কা ছাড়া পাই লই, তারপর দেইখা লমু তোরে! . নীল বরুণ ও নতুন আসামীর মধ্যকার পাগলামী মার্কা কথা শুনছিল ৷ সে বুঝতে পারলো নতুন আসামী চালাক প্রকৃতির আর বরুণ পুরোটাই বোকা! তাদের দুজনের কথোপকথন চলছিল আর নীল জেলের এককোণে বসে মনে মনে গান গায়ছিল ৷ সে মনে মনে খুব ভাল গান গায়তে জানে! যদি সেই গানগুলো উচ্চস্বরে বলে তবে সবাই পাগলের মত হয়ে শুনতে থাকবে ৷ এই ভয়ে নীল কখনো শব্দ করে গান গায়নি ৷ সে চাইনা তার গানের জন্য কেউ পাগল হয়ে যাক! . ওদিকে বরুণ নতুন আসামীকে কিঞ্চিৎ রাগস্বরে হঠাৎ বলে ওঠে, ___ভাই দেখেন তো আমারে নাকি নায়কদের মত লাগে? . নতুন আসামী বিদ্রুপের হাসি হেসে বলে ওঠে ___কোনানহার বলদ কইছে এই কথা? ঐ বলদের চোখ নিশ্চিত ট্যারা! . বরুণ রাগের মাত্রা বাড়িয়ে বলে, ___এইযে এই বলদটা কইছে, বলদের কথা শুইনা তখন কিছু কইনাই ৷ আমি জানি আমার চেহারা ভিলেনগো মত হেই কয় নায়কদের মত ৷ কেমনড লাগে কন? . নীল হতভন্ব হয়ে গেল বরুণের কথা শুনে ৷ লোকটার এমন পল্টি মারার কারণ বুঝলোনা সে! সে ভাবলো এটা নিশ্চিত জেলখানা নয় ৷ পাগলা গারদ হতে পারে ৷ জেলখানায় এমন মানুষের স্থান হতে পারেনা! এসব ভাবতে ভাবতে নীল ঘুমিয়ে গেল! সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেলে তাকে একজন খবর দেয় তাকে দেখার জন্য তিনজন মানুষ অপেক্ষা করছে জেলের মূল গেটে! সেখানে গিয়ে দেখে তাকে দেখতে আসছে তার বোন, দুলাভাই ও নিশি! নিশির চোখে পানি ৷ বারবার চোখের পানি মুছেও চোখের জল শেষ করতে পারছেনা ৷ নাবিলা ভাইকে দেখে খুশিতে হাসছে! ১৫ মিনিট পর তাকে ছাড়া হয়! নীলকে জেলে আটকানোর কারণ হলো রাস্তায় একটা লোকের বাইক ধরে রেখে পুলিশ লাইসেন্স চাইছিল ৷ সেটা দেখানোর পরও ছেলেটাকে পুলিশ বাইক দিতে চাইছিলনা ৷ ঘুষ চেয়ে বসে ৷ কিন্তু ছেলেটা বারবার শুধু বলছে, “লাইসেন্স তো দেখালাম টাকা কিসের?" তবুও পুলিশ নাছোরবান্দা সে ঘুষ নিবেই! নীল এটা দেখে পুলিশকে বলে, ___স্যার, এমন করছেন কেন? তাকে ছেড়ে দিন! . এটা কেন বলল সে, ওমনি কয়েকটা পিঠে লাগিয়ে দিল ৷ তারপর আশেপাশে দাঁড়ানো দুটা পুলিশকে ডেকে এনে মানহানী মামলার কথা বলে নীলকে ধরে নিয়ে যায় ৷ ছেলেটাকে আগেই ছাড়া হয় ৷ সে কিছু না বলে বাইক নিয়ে চলে যায়! . নীলের এই ঘটনা শুনে নিশির মনে তার প্রতি ভালবাসা বেড়ে যায় ৷ মানুষটা যে সত্যিই ভাল মনের সেটা সে আরেকবার প্রমাণ পেয়ে যায়! . . বাসায় ফিরে নীল তার বোনকে বলে, ____আপু, এখানে থাকবোনা, তোদের বাসায় যাব! . নাবিলা খুশি হয়ে বলে, ____তাহলে চল! . বিকেলের দিকে নিশিদের বাসায় রওনা দেয় নীল ৷ নিশি এজন্য কষ্টই পায় ৷ কারণ সে চাই নীলের সাথে তার বাড়িতে থাকতে ৷ কিন্তু নীলের ভাবনা তো অন্যরকম ৷ তার কল্পনায় সেই পরীর ছবি ভাসছে! তার দেখা পাবার জন্য মনটা ছটফট করছে! সে ধরে নিয়েছে নিশিদের পুকুরে সেই পরীর বাস ৷ তাকে পুকুরটাতেই দেখতে পাওয়া যাবে! . . রাত ১২টার দিকে নীল পুকুরে গিয়ে সিড়িতে বসে পরাীর দর্শন পাবার জন্য অপেক্ষা করছিল ৷ কিন্তু তার দেখা নেই! আজ পুকুরের পরিবেশটা কেমন যেন খাপ ছাড়া লাগছে তার নিকট ৷ না ব্যাঙ ডাকছে, না ঝিঁঝিঁপোকার দল গান গায়ছে, না জোনাকির দল আলো দিচ্ছে; কিছুই নেই আজ পুকুরে বা পুকুরের আশেপাশে! তাই নীলের মনটা পুকুরে বসতে চাইছে না! . হঠাৎ নীল দেখতে পায় শাড়ি পড়া একটি মেয়ে মুখটা ঢেকে হাতে কলসি নিয়ে আসছে ৷ বুঝতে পারলোনা সে কে? নীল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ___তুমি কে? . মেয়েটা কোনো জবাব দেয়না ৷ চুপ করে মাথা নিচু করে কলসি কোমড়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! নীল জোর করেই মেয়েটার মুখ থেকে শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে নেয় এবং দেখে এ তো নীলিমা! সে লজ্জায় লজ্জাবতীর রুপ ধারণ করে আছে বলে মনে হলো ৷ অন্ধকারেও ফর্সা মেয়েটার মুখের ভাবসাব অস্পষ্ট হলেও বুঝা যাচ্ছিল অনেকটা! . নীল অস্ফুট স্বরে বলে, ___এত রাতে পুকুরের কেউ পানি নিতে আসে? . নীলিমা সহজ ভঙ্গিতে জবাব দেয়, ___আমার দরকার তাই! ___ঠিক আছে, পানি নিয়ে চলে যাও ৷ এখানে তুমি বেশিক্ষণ থাকলে আমার লস! ___কেন? ___তুমি এখানে থাকলে আমার সেই পরীটা লজ্জায় আসতে চাইবেনা! ___কিসের লজ্জা? পরীরা কেন মেয়েদের দেখে লজ্জা পাবে? . নীল বানোয়াট একটি কথা বলে দিল খুব সহজে ৷ বলল, ___তুমি হয়তো জানোনা, পরীরা পুরুষ মানুষের সামনে তখন আসে যখন আশেপাশে কোনো মেয়ে মানুষ থাকেনা ৷ আমার পরীটা মেয়েদের দেখে লজ্জা পায় খুব! এইযে দেখো তুমি আসছো বলে এখনও পরীটা আমার সাথে দেখা দিচ্ছেনা! ____ঠিক আছে, পানি নিয়েই চলে যাচ্ছি! ____ধন্যবাদ, তোমাকে! . নীলিমা কলসি পূর্ণ করে পানি নিয়ে চলে যায় ৷ কিন্তু সে যাবার একটু পরই নিশি চলে আসে! গায়ে সাদা টিশার্ট পড়া ৷ হয়তো ঘুম থেকে জেগে ওঠছে! তাকে বিদেশী রগরগে দেহের গরম আইটেম গার্লের মত লাগছিল! সরাসরি সে নীলের পাশে এসে বসে ৷ এবং আচমকা তাকে জড়িয়ে ধরে! আদুরে গলায় নীলকে বলে, ___ঘুম আসছেনা তোমার? . নীল উসখুস করতে করতে তার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ইষৎ রাগস্বরে বলল, ____ছাড়ো তো আমাকে! তুমি এভাবে জড়িয়ে ধরে আছো দেখলে আমার সেই পরীটা রাগ করবে ৷ সে আর আমার সাথে দেখা করতে চাইবেনা! . নীশি এটা শুনে তার গা থেকে টি-শার্ট এক টানে খুলে তার হাতে ধরিয়ে দেয়! তারপর জিন্স খুলে ফেলে পুকুরের নিচে চলে যায় এবং ঝাঁপ দিতে গিয়ে থেমে যায় ৷ নীলের দিকে নিজের দেহটা দৃশ্যমান করে দিয়ে মডেলদের মত করে দাঁড়িয়ে থাকে! . নিশির দেহের দিকে তাকিয়ে নীল কি যেন ভাবছিল? পরে তার দিক থেকে লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নেয় ৷ ভাবতে থাকে তার পরীর কথা ৷ নিশির প্রতি তার প্রচন্ড রাগ হয় ৷ তার জন্য হয়তো আর পরীটাকে দেখতে পারবেনা! নিশিকে এভাবে দেখে থাকলে হয়তো কখনো আর পরীটা আসবেইনা ৷ রাগে, অভিমানে তাকে ছেড়ে চলে যাবে! . নিশি হঠাৎ উচু গলায় বলে ওঠে, ___কি? অামি কি পরীটার মত নই? নাকি পরী আমার চেয়ে সুন্দরী? তার দেহের চেয়ে আমার দেহ বেশি আকর্ষণীয় নয়? . নীল তার এমন কথা শুনে নিশির টিশার্ট ও জিন্স ফেলে চলে যায় তার রুমে! নিশির পুকুর থেকে উঠে পোশাক পড়ে চলে যায় নীলের রুমে ৷ দরজাটা বন্ধ করে দেয় সে ৷ নীল ঘাবড়ে যায় তার এমন আচরণ দেখে! . নীলকে নিশি মিষ্টি হাসির সাথে হালকা আদুর গলায় আবদারের স্বরে বলে, ___আজ আমার দুটা আবদারের যেকোনো একটা পূরণ করতে হবে! হয় আমার সাথে পুকুরে সাঁতার কাটতে হবে ৷ নাহয় তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাব এটা মেনে নিতে হবে! . নীল আগে থেকেই রেগে ছিল ৷ তার এমন আবদারের কথা শুনে রাগে ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল! অগ্নিমূর্তিরুপ ধারণ করে নিশির হাত ধরে রুম থেকে বেড়িয়ে তার দুলাভাইয়ের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় কড়াঘাত করতে থাকে! নীলের বোন দরজা খুলে দুজনকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে ঘুম জরানো কন্ঠে কৌতূহলের স্বরে বলে, ____কি হয়েছে ভাই? . নীল রাগান্ন্যিত ভাব নিয়ে বলে, ____দুলাভাই কে ডাকো! . আতিক এসে নীল ও নিশিকে দেখে খুশি মনেই বলে, ___কিরে কি হয়েছে তোদের? নিশি, তুই কেন মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছিস? তোর চুল ভেজা কেন? ভিজে গেছিস মনে হচ্ছে? . নিশি কোনো জবাব দিলোনা ৷ নীল রাগের মাত্রা বাড়িয়ে উচ্চস্বরে বলতে লাগল, ____আপনার বোন দিনদিন বেহায়া হয়ে যাচ্ছে ৷ আমার সামনে একদম বস্ত্রহীন হয়ে পুকুরে গোসল করে ৷ আবার বলে রাত্রে আমার সাথে ঘুমাবে! সে আমাকে পাগল বলতো এতদিন উল্টা নিজেই পাগলী হয়ে গেছে! . নীলের মুখে বোন সম্পর্কে এমন কথা শুনে মুখের হাস্যজ্জ্বল ভাবটা কেটে গিয়ে ফ্যাকাশে রং ধারণ করে! . নিশি নিরবতা ভেঙ্গে নীলকে ঝাঁপটে ধরে চেঁচিয়ে কান্নামাখা স্বরে কাঁপতে কাঁপতে বলে, ___আমি আরো করবো এমন, পারলে তুমি ঠেকাও ৷ আমি তোমাকে ভালবাসি ৷ তাই যা খুশি করবো! . নীল তার থেকে নিশিকে সরিয়ে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে, ___তোমার নষ্টামী অনেক সহ্য করছি আর না! বেয়াইন ভেবে সব সহ্য করছি এতদিন ৷ এরপর যদি গায়ে একটু ছোঁয়া দাও তবে থাপড়িয়ে দাঁত ফেলে দিব! . নীলের কথা শুনে নাবিলা ও আতিক বাকরুদ্ধ হয়ে যায় ৷ নিশি কাঁপছিল আর নিঃশব্দে কান্না করছিল! নীলের চোখে মুখে আগুন লেগে গেছে বলে মনে হলো, সে নিশিকে তুই তুকারি করে ফের বলতে লাগল এবার, ___তোর মত মেয়ের সাথে প্রেম করবো আমি? বারবার তোকে বলেছি আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা ভুলে যা অন্যথায় কাঁদতে হবে! বেয়াইনকে বেয়াইনের দৃষ্টিতে দেখেছি ৷ ভার্সিটির অনুষ্ঠানের জন্য একটু দরকার ছিল তোকে ৷ অন্যথায় তোর মত দেমাগী মেয়ের নিকট আমি আসতাম রিকুয়েস্ট করতে? কখনো না! . নিশিকে কথাগুলো বলতে পেরে নীলের খুব ভাললাগছে ৷ নিশির মুখ থেকে দুটা বছর ধরে অসংখ্যবার তাচ্ছিল্যকর ও অপমানজনক কথা সহ্য করে গেছে মুখ বুজে ৷ সেসবের জবাব আজ দিতে পেরে ভাল্লাগছে খুব! তবে চিন্তা হচ্ছে পরীকে নিয়ে ৷ ভাবছে যে বেহায়াটার জন্য সে রাগ করে চিরতরে চলেই গেল কিনা? . নীল তার রুমে চলে যায়! পরীকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে নীল ঘুমের রাজ্যে ডুবে যায়! . ১ঘন্টা পর কে যেন তার দরজায় কড়া নাড়ে ৷ ঘুম ভেঙ্গে যায় তার ৷ দরজা খুলে দেখে কেউ নেই, চারপাশ অন্ধকার ৷ বারান্দায় বিদ্যুতের বাতি বন্ধ করা হয়েছে যে কারণে কিছু দেখা যাচ্ছিলনা! কাউক না দেখতে পেয়ে দরজাটা বন্ধ করে শুয়ে পড়ে বিছানায় ৷ মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে দেখে ধবধবে সাদা সেই পরী বা মানব নারী তার পাশে শুয়ে আছে ৷ তার চিনতে কষ্ট হয়না এটাই তার সেই পরী! কিন্তু সে রুমের ভেতর কেমনে এলো? হয়তো দরজা খোলার সাথে সাথে ঢুকে পড়ছে ৷ পরীকে কিছু বলতে গেলে নীলকে থামিয়ে দেয় এবং তার ঠোঁটে আঙ্গুল চাপিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করে কোনো কথা না! পরী তাকে শক্ত করে জড়িয়ে নেয় বুকে! নীলের শরীর এখন প্রচন্ড বেগে কাঁপছে! শিহরণে তার হ্নদয়টা সুখের সাগরে ভাসছে! সে হারিয়ে যাচ্ছে সুখের অতল গহবরে! . নীল কখন যে ঘুমিয়ে গেছে সে জানেই না ৷ ঘুম থেকে জেগে উঠে সে নিজেকে আবিষ্কার করে পুকুরের সিড়ির পাশে ৷ নিশিকে জড়িয়ে ধরে আছে! তখনও সূর্য ওঠেনি ৷ হালকা অন্ধকার রয়েই আছে! সে কেন নিশিকে জড়িয়ে ধরে আছে এর কোন উত্তর পেলোনা? . নাবিলা তার ননদকে ডেকে বলে, ___আমার ভাবিটা, অনেক হয়েছে এবার জাগো! . নিশি তার ভাবির ডাক শুনে জেগে উঠলো ৷ এবং ঘুম জরানো মুখে একটা হাই তুলে বলল, ____কিছু বলবা ভাবি? ____কি আর বলবো? বিয়ের আগেই এত প্রেম তোমাদের ৷ বিয়ের পর না জানি কি হবে! গোসল করে রান্নাঘরে আসো! আমার শ্বশুর শ্বাশুরি আসছে আজ ৷ ১৫দিন পর গ্রাম থেকে ফিরবে! তাই তাদের জন্য স্পেশাল রান্না করতে হবে! . নীল ভাবনায় ডুবে আছে ৷ সে তার রুমে ছিল পরীর সাথে, পুকুরে সিড়ির পাশে কিভাবে এলো?... . চলবে....

কোন মন্তব্য নেই: