Sponsor

banner image

recent posts

নিয়তী


ফারজানা বেগমের কথার প্রতিত্ত্যুরে দীর্ঘশ্বাস ফেললো রূপা। দুনিয়াটা সত্যিই অদ্ভুত! আর তার থেকে বেশি অদ্ভুত হলো পৃথিবীর মানুষগুলো। মা যদি জানতেন তার সুপুত্রই ওর হাতের এমন নাজেহাল অবস্থা করেছে! তাহলে কখনোই এই কথাটি তিনি বলতেন না। এখনও তার কানে ফারজানার বেগমের কথাগুলো বাজছে, 'ধ্রুব থাকলে হয়তো এমনটা হতেই দিত না।' অবশ্য মা জানেন না যে ধ্রুব তার সাথে কতটা ভয়ানক ভয়ানক অত্যাচার করে? কারণ ধ্রুব তার মায়ের সামনে রূপার সাথে ভালোভাবে কথা বলে। আবার কখনো গালে তুলে ভাত খাইয়ে দেয়। রূপা বুঝতে পারে না ধ্রুব তার মায়ের সামনে এমন নাটক কেন করে? মা জানলে হয়তো রূপার প্রতি এমন অত্যাচার হতে দিতেন না। কিন্তু.... আর ভাবতে পারছে না রূপা। এসব নিয়ে ঘেটে তার লাভ কী? তার যে মুক্তি চাই! মুক্তি!
- 'বউমা! বাইরে না দাঁড়িয়ে থেকে ঘরে যা। আমি ধ্রুবকে বলে দিচ্ছি হাতে মলম লাগিয়ে দিতে!'
- 'না না মা। তার কোনো দরকার নেই। মলম দিয়েছি। আর উনি নিজের হাতেই মলম লাগিয়ে দিয়েছেন।'
- 'ওহ, ভালো করেছে। আর শুন, কাল তোকে রান্না করতে হবে না। আর সকালে তাড়াহুড়ো করে উঠারও কোনো দরকার নেই। একটু রেস্ট নে। শরীর ভালো হয়ে যাবে।'
- 'জি।'
- 'হুম। এবার শুতে যা। রাত তো কম হয়নি।'
- 'হু......'
- 'কি হু? না যেয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?'
- 'জি যাচ্ছি।'
- 'এখনও দাঁড়িয়ে আছিস? শুতে যা বলছি।'
বলেই ফারজানা বেগম রূপাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা আটকে দিলেন। ঘরে ঢুকেই রূপা ভয়ে ভয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ তুলে উপরের দিকে তাকানোরও কোনো সাহস পাচ্ছে না সে। নিশ্চয় আবারও ধ্রুব তাকে কোনো একটা কারণে শাস্তি দিবে। কিন্তু রূপার গায়ে যে আজ কোনো শক্তি নেই। খুব ক্লান্ত লাগছে ওর। দাঁড়াতেও খুব কষ্ট হচ্ছে। আচ্ছা! উনি কি ঘুমিয়ে পড়েছেন? হয়তো! ধ্রুবের কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে বিছানার দিকে চোখ নিক্ষেপ করলো রূপা। হুম, ধ্রুব ঘুমিয়ে পড়েছে। ভাবতেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল রূপা। এবার একটু ঘুম দিতে হবে। শরীরটা খুব দূর্বল লাগছে।
রূপা যখন শোবার জন্য বিছানা থেকে বালিশ আর কাঁথা নিচ্ছিলো, তখন তার চোখ আটকে গেল ধ্রুবের নিষ্পাপ চেহারাটিতে। এটা কি কখনো সম্ভব? একটা ভয়নক মানুষের চেহারাতে নিষ্পাপ প্রবণতা থাকতে পারে! ধ্রুবকে দেখে মনে হচ্ছে যে সে কারো সাথে খারাপ আচরণ করতেই পারে না। ধ্রুব কি আদৌ খারাপ? নাকি এখানে কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে? হুহ! কিসব ভাবছে সে? রূপা একবার ফেসবুকে পড়েছিল, 'লবণ আর চিনির রং যেমন একই রকম হয়, ঠিক তেমনি অমানুষ গুলোও হুবাহু মানুষের মতো দেখতে হয়।' আর সে লবণকে চিনি, আর চিনিকে লবণ ভেবে ভুল করতে যাচ্ছিলো। তবে আর যাইহোক, রূপার বিশ্বাস দ্বীপ তাকে এই নরগ থেকে একদিন বের করে নিয়ে যাবে।
দ্বীপ তুমি কোথায়? আমার কথা কি তোমার একটুও মনে পরে না? এত সহজে আমাকে কিভাবে ভুলে গেলে? তুমি না বলতে আমাকে ছাড়া তুমি বাঁচবে না? দেখো, আমাকে ছাড়া আজ তুমি ঠিকই বেঁচে আছো। শুধু বেঁচে নেই আমি। এক জান্ত লাশ হয়ে পড়ে আছি পৃথিবীতে! এই কষ্টের কি কখনো অবসান ঘটবে না?
সকালেবেলা হঠাৎ মুখে পানি পড়াতে হুড়মুড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো রূপা।
- 'কে কে?'
বলেই প্রলাপ করতে লাগলো সে। চোখমুখ কুঁচলাতে কুঁচলাতে যখন ধ্রুবকে সামনে দেখতে পেল তখন ভয়ে তার বুক থরথর করে কাঁপতে লাগলো। এই রে! আজ যে উঠতে দেরী হয়ে গেছে। এখন নির্ঘাত মাইর খেতে হবে তার। ভাবতেই ভয়ে কুকড়ে যেতে লাগল রূপা। ধ্রুব ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
- 'বাব্বাহ! মেহেন সাহেবের আজ এত তাড়াতাড়ি ঘুম ভাংলো?'
- '...........'
- 'বুঝতে পারছি রাতে ঠিকভাবে ঘুম হয় নি না? আহারে! কি কষ্ট।'
বলেই রূপার মুখ টিপে ধরলো ধ্রুব। বললো,
- 'নিজে তো বেশ করে আরামে ঘুমাচ্ছিস, আর ওইদিকে যে আমার মা রান্না করতে করতে মরে যাচ্ছে সেসব কি তোর চোখে বাঁধছে না? বাঁধবেও বা কেন? কাল রাতে তো মাকে মিথ্যা কথা বলে রাঁধতে বলেছিলি। যাতে আরামে ঘুমাতে পারিস। কী ভেবেছিস আমি জানতে পারবো না? তোকে কি আমি আরাম করে ঘুমানোর জন্য বিয়ে করেছি? নেক্সট টাইম যদি মাকে কোনো কাজ করতে দেখি তাহলে তোকে আমি একদম খুন করে ফেলবো!'
কথাগুলো বলেই রূপার মুখ ছেড়ে দিলো ধ্রুব। বললো,
- 'আর হ্যা মাকে রান্না করতে নিষেধ করে দিয়েছি। আজ বাড়িতে মেহমান আসবে। কমপক্ষে ২০ জন মতো আসবেই। এটা কনফ্রম। আর তুই এই ২০ জনের জন্য একাই রান্না করবি। কেউ তোর সাহায্য করবে না। অনেক ঘুমিয়েছিস, অনেক আরাম করেছিস। কিন্তু আর নাহ! আজ এক দুই রকমে আইটেম হলে হবে না। কমপক্ষে ১০-১২ টা আইটেম তো করতেই হবে। এখন আর বসে না থেকে রান্না বসিয়ে দে। ওরা এল বলে। আর তোর হাতে কিন্তু বেশি সময় নেই।'
কথাগুলো বলেই হনহন পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল ধ্রুব। এতশত আইটেমের কথা শুনে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে রূপা। তার মাথায় কোনো কাজ করছে না। এতকিছু সে একা কিভাবে করবে? আল্লাহ আমাকে বাঁচাও। যেখানে এক ভাগের তরকারি রাঁধতে ১ ঘন্টারও বেশি লাগে সেখানে এত আইটেম রাধবে কিভাবে? আজ যে কাজ করতে করতে মরেই যাবে সে। নাহ! আর ভেবে কোনো লাভ নেই। তাকে এমনিতও করতে হবে। আর ওমতিতেও করতে হবে। তাহলে এতশত ভেবে সময় নষ্ট করার কী দরকার?
রূপা ভেজা কাপড় চেঞ্জ করে চুল খোপা করতে করতে রান্নাঘরের উদ্দেশ্য বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। এখন কি রান্না করবে সে? ধ্রুব তো একটু বলে দিতে পারতো! না থাক। তার কোনো দরকার নেই। এটা ওর কাছে নতুন কিছুই না। এমন প্রতিনিয়ত তার সৎ মা ওকে দিয়ে রান্না করাতো। সামান্য তরকারি লবণ কম হলেই এলপেথারি মারধর শুরু করে দিতো। পরে আস্তে আস্তে গিয়ে ঠিকঠাক ভাবে রাধতে শুরু করলো ও। রূপা আর সময় নষ্ট না করে ভাত বসিয়ে দিলো। আর অন্য চুলোয় মাংস। বেশকিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পর ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিলো সে।
হঠাৎ কারো উপস্থিতি বুঝতে পেরে পিছন ঘুরে তাকালো রূপা। নিলু এসেছে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো সে। রূপা বললো,
- 'তুমি! এখানে! কিছু লাগবে?'
- 'উঁহু.... তোমাকে রান্নায় একটু হেল্প করতে আসলাম। আমি কি করবো ভাবি? যেকোনো একটা কাজের কথা বলো তো।'
- 'আরে না না তোমাকে কিছুই করতে হবে না ননদিনী। তুমি গিয়ে বসো তো। আর এইতো আমার রান্না প্রায় শেষের দিকে।'
- 'কচু... এখনো তো কিছুই হয়নি। প্লিজ ভাবি আমাকে যেকোনো একটা কিছু করতে দাও।
প্লিজ প্লিজ প্লিজ......'
- 'আচ্ছা বাবা।'
- 'থ্যাংকইউ ভাবি। এবার বলো আমি কি কাজ করবো?'
- 'তোমার বেশি কিছু করতে হবে না। তুমি একটু মাংসটা দেখো। হয়ে গেলে আমাকে ডাক দিও।'
- 'ওকে ভাবি।'
- 'তাহলে আমি এই ফাকে মাছটা কুটে ফেলি। ঠিকাছে?'
- 'অবশ্যই অবশ্যই।'
রূপা নিচে বসে বসে মাছ কুটছে। আর নিলু মাংস নড়াচড়া করছে। এমন সময় ধ্রুব রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। রূপার জায়গায় নিলুকে রান্না করতে দেখে রাগ উঠে গেল তার সপ্তম আসমানে। এই মেয়েটা বার বার তার কথার খেলাপ করছে! বার বার তাকে রাগিয়ে তুলছে। আজ তার সহ্যের সীমার বাধ ভেঙে গেছে।
রূপা নিজেও জানে না যে আজ তার কপালে কি লেখা আছে?
চলবে🙂🙂
নিয়তী নিয়তী Reviewed by MD ASAD RAHMAN on জুলাই ২৮, ২০১৯ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.