Recents in Beach

আপনজন

আপনজন দরজা খুলে জান্নাত দেখলো একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে । জান্নাত বলল -কে আপনি ? কাকে চান ? মেয়েটি বলল -আমার নাম মেঘা ! মিনহাজকে চাই । আমি ওর স্ত্রী ! মেয়েটির কথা শুনে জান্নাতের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মত অবস্থা । কি শুনলো ও এটা ! জান্নাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল -মিনহাজের স্ত্রী মানে ? কি বলছেন এসব ! যদিও ব‍্যপারটা জান্নাত বুঝতে পেরেছে , এই হচ্ছে যেঘা । মেঘা হেসে দিয়ে জান্নাতকে বলল -এই বাড়ির নতুন কাজের মেয়ে নাকি ? -আমাকে দেখে কি আপনার কাজের মেয়ে মনে হয় ? জান্নাতের কথার উত্তর না দিয়ে , জান্নাতকে উপেক্ষা করে মেঘা বাড়ির ভেতরে ঢুকলো । ছোফায় বসে বলল -এক কাপ চা দেন তো ! মেঘাকে দেখার পর থেকেই জান্নাতের কেমন যেন অস্থির লাগছে । শরীর জ্বলে যাচ্ছে । অমিতা নতুন কণ্ঠের আওয়াজ শুনে বের হয়ে আসলো । এসে তো অবাক ! মেঘার সাথে আবার কখনও দেখা হবে এটা সে কখনও ভাবেনি । তিনবছর পর মেঘার সাথে দেখা । সবাই ধরে নিয়েছে মেঘা হয়তো লজ্জায় আর কখনও ওর অস্তিত্ব উপস্থাপন করবে না । কিন্তু নিষিদ্ধ পল্লীর মেয়েদের যে কোনো লজ্জা নাই এটা অমিতা ঠিক বুঝতে পারলো । যার সুশিক্ষা নাই , যে কখনও ভালো ব‍্যবহার পায়নি , ভদ্রতা কাকে বলে জানেনা তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা সত‍্যিই হাস‍্যকর ! অমিতা চেচিয়ে ওর মাকে ডাকলো । অমিতার মা ড্রয়িং রুমে এসে তো অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন । এটা তার দেখতে হবে তিনি কখনও ভাবেননি । তিনি কপট রাগ দেখিয়ে বললেন -তোমার যদি একটুও মানসম্মান বোধ থাকতো , তাহলে আর এই মুখ আমাদের দেখাতে না ! এত টাকা পয়সা নিয়েও তোমার মন ভরেনি । আবার কি চুরি করতে এসেছো ? -চুরি নয় , বরং আমার অধিকার নিতে এসেছি । -শোনো মেয়ে , তোমার মতো মেয়েদের পতিতা পল্লীতেই মানায় , ভালো পরিবেশ তোমার জন্য না । নষ্ট মেয়ে কোথাকার ! -এত কথা শুনতে ভালো লাগছে না । কাবিননামা অনুযায়ী আমি মিনহাজের প্রথম স্ত্রী । এখনও আমাদের ডিভোর্স হয়নি ‌ তাই আমার অধিকার এখনও আছে । জান্নাত প্রচণ্ড রেগে বলল -আম্মা , ওকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে বলেন , আমার কিন্তু প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে ! -মিনহাজের সাথে দেখা না করে এক পাও নড়ছি না । আর আমি যাব কেন ? এই বাড়িতে আমার সমস্পূর্ণ অধিকার আছে । আমি এখানেই থাকবো । জান্নাত রুমে যেয়ে মিনহাজকে ফোন দিল , -আপনি এখনই বাসায় আসেন। মিনহাজ অবাক হয়ে বলল -এখন ! কেন কি হয়েছে ? কোনো সমস্যা ? সব ঠিক তো ? -এত কিছু বলতে পারবো না , আসতে বলছি আসেন । বলেই জান্নাত লাইন কেটে দিল । মিনহাজ দ্রুত বাসায় আসার চেষ্টা করছে । কিন্তু ঢাকা শহরে সময় মেইনটেইন করে চলা খুব কষ্ট । এখনে জ‍্যাম লেগেই থাকে । মিনহাজ খূব ঘামছে । বাড়ির জন্য খুব টেনশন হচ্ছে । জান্নাত ফোনও রিসিভ করছে না । মিনহাজ বাসায় ঢুকেই মেঘাকে দেখে অবাক হলো । সামনে মা , অমিতা , জান্নাত দাঁড়িয়ে আছে । মিনহাজ অস্টমাচর্য হয়ে বলল -মেঘা তুমি ? -জানি আশা করোনি আমাকে ! তুমি আমাকে ছাড়া ভালো থাকলেও আমি তোমাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারি বল ? তাই তো চলে এলাম ! মিনহাজের মা বলল -দেখ , কি মেয়েকে বিয়ে করেছিলি ? তোকে আমি কতবার বলেছিলাম , নর্তকীরা কখনও সাধারণ মানুষের মতো জীবন যাপন করতে পারে না । তুই বলেছিলি , ও সম্পূর্ণ আলাদা , এই তার নমুনা ! বিড়ালকে যতই ভালো খাবার দাও , ও ইদুর দেখলে ধরবেই । আর নষ্ট মেয়েদের ভলো পরিবেশে রাখলেই তাদের আচরণ পরিবর্তন করা যায় না । তারা তাদের লেবেল কখনও ছাড়তে পারে না । অমিতা মুখ খুলল -ভাইয়া ,এই আপদটাকে বিদায় কর । ও যতক্ষণ বাড়িতে থাকবে , কেমন দুর্গন্ধ লাগছে পরিবেশটা । চারিদিকে পাপি পাপি গন্ধ ভেসে বেরিয়েছে । মেঘা সবার কথা উপেক্ষা করে মিনহাজের কাছে যেয়ে বলল -ইশ কত শুকিয়ে গেছো ! -একদম আমায় ধরবি না । তোর ওই হাত অপবিত্র , তোর সারা শরীরের পাপ ছড়িয়ে আছে । এখনই এখান থেকে চলে যা তোর মুখ দেখতে চাই না । -উঁহুঁ , আমার অধিকার থেকে আমি এক পাও অনঢ় হবো না । আমার অধিকার আমি হাসিল করেই ছাড়বো । -তুই তো অধিকার না ! টাকা নেওয়ার ধান্দায় এসেছিস । বল কত টাকা চায় তোর ? -আমার টাকা চাই না , আমার শুধু তোমাকে চাই ! -আর একটাও কথা বলবি না । এখনই বের হয়ে যা বাড়ি থেকে । নয়তো খুব খারাপ হবে । মেঘা হাসলো , -এমন করছো কেন ? তোমার শরীর ঠিক আছে তো । -বললাম না , শরীরে হাত দিবি না । তোর স্পর্শ আমার কাছে চরম ঘৃণা লাগে । যা বের হয়ে যা বলছি ! মেঘার মাঝে কোনো পরিবর্তন নেই । মিনহাজ মেঘার হাত ধরে টানতে টানতে বাড়ির বাইরে বের করে দরজা বন্ধ করে দিল । এতটা চাপ নেওয়া কষ্ট হয়ে যাচ্ছে । কেউ ঠিকমতো আচরণ করছে না । মিনহাজের বাবা রাতে বাসায় ফিরে এসব শুনে মিনহাজকে উত্তমমাধ্যম দিলেন । জান্নাত ঠিকমতো কথা বলছে না । মিনহাজ একা একা বেলকনির বেতের চেয়ারে বসে আছে । মনটা বেশ খারাপ । সকালে কলিংবেল বেজেই চলেছে । সবাই ব‍্যস্ত । তাই মিনহাজ দরজা খুলল । তারপর চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো ! দরজার ওপাশে পুলিশ দাঁড়িয়ে । এত সকালে পুলিশের দলবল হাজির হওয়ার কারণটা বুঝতে পারলো না । পুলিশের একটু পিছনে পরিচিত মেঘাকে দেখে মিনহাজ বুঝতে পারলো আসল কাহিনী । -আপনি মিনহাজ ? -জ্বী , ভেতরে আসুন প্লিজ ! সবাই ছোপায় বসা । ইন্সপেক্টর শফিকুল বললেন -মেঘা আপনার প্রথম স্ত্রী , রাইট ! -হ‍্যা । -তো এখন তাকে মেনে নিচ্ছেন না কেন ? -সে একটা প্রতারক । মানুষ হিসেবে তার কোনো পরিচয় আছে বলে আমি মনে করি না । -কিভাবে বুঝলেন ? -ওকে বিয়ে করার পর , ও আমাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে বাইরের লোকের সাথে হাত মিলিয়ে সব কিছু চুরি করে নিয়ে যায় । আমি ওকে অনেক বিশ্বাস করতাম । কিন্তু আমি ভুলে গেছিলাম যে ওকে তো ডাস্টবিন থেকে নিয়ে এসেছি । যা কখনও ভালো হওয়ার যোগ্য না । ইন্সপেক্টর শফিকুল বললেন -আপনার কাছে কোনো প্রমাণ আছে ? -না ! -তাহলে কিসের ভিত্তিতে আমরা আপনার কথা বিশ্বাস করবো ? আর আপনি তো এই সম্পর্কে কোনো জিডিও করেননি , যদি করতেন তো এখন আমরা আপনার পক্ষে কথা বলতে পারতাম । আর মেঘা তো বলছে , সে কিড‍ন‍্যাপ হয়েছিল । আপনার তো উচিত ছিল তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা । মিনহাজ তটস্থ হয়ে বলল -ইন্সপেক্টর , আপনি এখন কি বলতে চাচ্ছেন ? -আমি চাচ্ছি মেঘাকে তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে । এখন আপনি কি চাচ্ছেন সেটা বলেন ? মিনহাজ জান্নাতের দিকে তাকালো ! কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না । মিনহাজ বলল -দেখেন , আমার বাবা মা মিথ্যা বলেনি । আর ও যদি কিডন‍্যাপ হতো তাহলে নিশ্চিত যে বাবা আর মা আমাকে এই বিষয়ে জানাতো । কিন্তু এটাই সত্যি যে ওই , ডাকতের সাথে হাত মিলিয়েছে । আমি চাচ্ছি ওকে ডিভোর্স দিতে -শুনুন , মেঘা তো ডিভোর্স দিতে চাইছে না । তাই আমার মনে হয় আপনার আর একটু ভাবা উচিত । আমি আগামীকাল আসবো , ভেবে নিন । সময় আছে । রাতে কয়েকবার মিনহাজ জান্নাতের সাথে কথা বলতে চেষ্টা করলো , কিন্তু জান্নাত একবারও কথা বলল না । মিনহাজকে এড়িয়ে চলছে । শোনো জান্নাত , যা হচ্ছে এতে আমার একদম হাত নেই । একটা মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছি । তাই তার প্রতিদান আমাকে এখন দিতে হচ্ছে । তবে যাই হয়ে যাক না কেন ? আমি তোমার পাশে থাকবো । কথা গুলো বলতেই মিনহাজ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল । ঘটনা স্থলের জান্নাত অবাক । জান্নাত চেচিয়ে সবাইকে ডাকলো ! দ্রুত মিনহাজকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া হলো । রিপোর্ট নিয়ে মিনহাজের বাবা ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হলেন । জান্নাত উত্তেজিত হয়ে বললেন -কি হয়েছে বাবা , ডাক্তার কি বলল? তিনি পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন । জান্নাত আটকে ধরলো । -কি হলো বলেন ? -কিছু হয়নি ! -তাহলে বলছেন না কেন ? প্লিজ বলেন ! জান্নাত কেঁদে দিল । মিনহাজের বাবা ইতস্তত বোধ করে বললেন -মিনহাজের ক‍্যান্সার ! কথাটি শুনে জান্নাত একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল ! ও যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে । চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে । জান্নাত ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়লো । আশেপাশের শত শত চোখ জান্নাতের দিকে পলকহীন ভাবে তাকিয়ে আছে ! চলবে ...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ