Recents in Beach

চিঠির বাক্স

চিঠির বাক্স ____________ বিলু আজ ভীষন রেগে আছে। রাগে বারবার তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরছে। রাগের কারণ আকাশ নামের একটা ছেলে তাকে চিঠি লিখেছে। চিঠির শুরুতেই ভয়ংকর কিছু কথা লেখা। “প্রিয়তমা বিলু তুমি কেমন আছো গো? ওমন সুন্দর করে হাসতে আছে বুঝি? তুমি কি জানো তোমার এই হাসি একটা ছেলের হৃদয় হরণ করার জন্যই যথেষ্ট। আমি ভীষণ ভাবে তোমার প্রেমে পরেছি।” বিলুর মা জাহানারা বেগম মেয়ের এহেন কান্ড দেখে বেশ কয়েকবার কাছে এসে জিজ্ঞেস করেছেন। — কি হয়েছে আমাকে বল, রাস্তায় কলেজের কোন ছেলে কিছু বলছে? বিলু জাহানারা বেগমের কথা শুধু মাথা নেড়ে বলছে কিছুই হয়নি তার। জাহানারা বেগম মেয়ের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন, কিছুদিন আগেও বিলু ফ্রক পরে সারা বাড়িতে হইচই করে বেড়াত। চোখের সামনে কতো বড় হয়ে গেছে। ফ্রক ছেড়ে এখন কলেজে পা রেখেছে। খুব সুন্দর করে শাড়ি পরে কলেজে যায়। দেখতে ভালো লাগে। কলেজের ছেলে মেয়েরা বিলুর নাম দিয়েছে লজ্জাবতী। কারণে অকারণে ভীষণ লজ্জা পায়। এই তো কিছুদিন আগে পাশের বাড়ির আন্টি এসেছে খোঁজখবর নিতে। বিলুকে দেখে বলল। — বিলু মা তুমি তো অনেক সুন্দরী হয়ে গেছো। বিলু লজ্জা পেয়ে সামনে থেকে উঠে বারবার আয়নাতে নিজেকে দেখেছে সেদিন। . বিলু তিনদিন পর কলেজে গেল, প্রথম ক্লাসে আনিসুল স্যারের কথায় বিলুর ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেলো। কেন তিনদিন কলেজে আসিনি সে নিয়ে জবাবদিহি করতে করতে একপর্যায়ে বিলুর চোখে পানি এসে গেলো। প্রথম ক্লাস শেষ হতেই বাকি ক্লাস গুলো না করে ভীষণ মন খারাপ নিয়ে কলেজ থেকে বেড়িয়ে পড়ল বিলু। বাসায় ফিরলো সন্ধ্যায়। জাহানারা বেগম মেয়েকে দেখা মাত্রই হন্তদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। — তোকে এরকম দেখাচ্ছে কেন? কোথায় ছিলি এতক্ষণ? বিলু ছোট করে জবাব দিলো। — কিছু হয়নি মা। — তোর বান্ধুবী রিনিকে ফোন করেছিলাম বলেছে তুই সেই কখন কলেজ থেকে বেরিয়ে গেছিস। বিলু রাগি গলায় বলল। — ছোট ছোট ব্যপার নিয়ে কেন তুমি আমার বান্ধুবীদের ফোন করো মা? ওরা বিরক্ত হয়। জাহানারা বেগম কপালের ঘাম মুছে, মেয়ের হাত ধরে কাছে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। — কি হয়েছে তোর? বিলু মায়ের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল। — আমার মনে হয় জ্বর আসবে, বাসায় প্যারাসিটামল থাকলে দাও আমি গোসল করতে গেলাম। না হলে রহিম চাচাকে দিয়ে নিয়ে আসো। জাহানারা বেগম মেয়ের এহেন কথায় ঘাবড়ে গেলেন। বিলু প্রেমে পড়েছে কিনা খোঁজ নিতে হবে। মেয়ে মানুষ এই বয়সটায় অন্যের দেখা দেখিতে হুটহাট প্রেমে পরে। নিজেও এই বয়সটা পার করেছেন। জাহানারা বেগমের প্রেসার বেড়ে গেছে বোধহয়, তিনি ঘনঘন নিশ্বাস নিচ্ছেন। . বিলু লম্বা সময় নিয়ে গোসল করে বের হয়ে, একসাথে দুটো প্যারাসিটামল ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পরলো। ঘুম ভাঙলো সকালে জাহানারা বেগমের ডাকে। — তোর নামে আজকাল চিঠি আসে কখনো বলিসনি তো? বিলু চোখ না খুলেই মাকে জিজ্ঞেস করে। — কে চিঠি লিখেছে? — সেটা আমি কিভাবে বলবো, চিঠি এসেছে তোর নামে। জাহানারা বেগম মেয়ের বিছানায় চিঠি রেখে চলে যায়। বিলুর হঠাৎ প্রথম চিঠির কথা মনে পরতেই ধরমর করে উঠে চিঠি হাতে নিয়ে চমকে গেলো। আকাশ নামে ছেলেটি তাকে আবার চিঠি লিখেছে। আজকের চিঠির শুরুটা খুব সহজ স্বাবলম্ব, কিছুটা শাসন মিশে আছে। শুরুতেই লেখা। “কি ব্যাপার তুমি কয়েকদিন ধরে কলেজে যাচ্ছ না কেন? তোমাকে দেখতে পাওয়ার যে এটাই একমাত্র উপায় আমার। দুদিন তোমার বাসার সামনে দিয়ে হাঁটাহাঁটি করেছি। তুমি একবারের জন্য বারান্দায় আসোনি। তোমার জন্য আমার যে কি চিন্তা হচ্ছিল। কাল ওভাবে মন খারাপ করে রাস্তায় একা-একা বাস্তহারার মতো হাঁটছিলে কেন? আনিসুল স্যার বকেছিল বুঝি? আচ্ছা জগতের কেউ কি জানে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের এই মেয়েটি মন খারাপ করলে জগতের সব সৌন্দর্য তার মধ্যে ফুটে উঠে? ভালো থেকো ভালোবাসা নিও প্রিয়তমা।” বিলুর আবার রাগ হতে শুরু করলো, কেউ একজন তাকে এভাবে ফলো করে সেটা তার মোটেও ভালো লাগছে না। আনিসুল স্যার ক্লাসে বকেছে সেটাও এই ছেলে জানে। বিলু আজকেও কলেজে গেলো না। বাসায় ঝিম মেরে বসে রইলো। বিকালে রিনি ফোন করলো। বিলু এপাশ থেকে হ্যালো বলতেই রিনি খই ফোঁটার মতো করে বলতে শুরু করলো। — কি হয়েছে রে তোর বিলু? আন্টি ফোন করেছিল তুই নাকি কলেজে না গিয়ে সারাদিন বাসায় ঝিম মেরে বসে ছিলি? আমিও আজ কলেজে যাইনি মেয়েলি সমস্য, যেটা তোরও হয় হি হি! — তোর এই বিশ্রী কথা বন্ধ কর। — আচ্ছা এই যে আমি ভালো মেয়ে হি হি! এবার বল কি হয়েছে? বিলু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল। — আকাশ নামের একটা ছেলে আমাকে প্রেম নিবেদন করে চিঠি লেখে। রিনি আরও বেশি উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো। — কি বলেছে রে? কবে ডেটিং করতে যাচ্ছিস? — অদ্ভুত সব কথাবার্তা লিখেছে চিঠিতে। — এবার তুই সুন্দর করে চিঠির উত্তরদে। প্রিয় আকাশ তোমাকে ছাড়া আমার রাত্রে ঘুম হয় না বুকের ভেতর কেমন কেমন যেন করে। তুমি এই বুকে মাথা রাখবে? তাহলে আমার একটা ছেলে বাবু ফুটবে নাম রাখবো আকাশী, হি হি হি। রিনি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, বিলু ফোন কেটে দিয়ে চুপ করে বসে রইলো রিনির অর্থহীন কথা শুনতে ইচ্ছা করছে না। চিঠি জোড়া গোপন জায়গা থেকে বের করে আরও কয়েক বার পড়ে সাবধানে রেখে দিল। তার কিছুদিন পর আরেকখান চিঠি, তাতে আবেগপ্রবণ কিছু কথা। এভাবে প্রায় মাঝে মাঝে চিঠি আসে। আগে বিলুর খারাপ লাগলেও এখন মাঝে মাঝে কেন জানি ভীষণ ভালো লাগে। কেউ একজন এতো ভালোবাসা নিয়ে তাকে চাইছে স্বপ্ন দেখছে। মাঝে মাঝে মানুষটাকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছা হয়। সামনে থেকে কথা বলতে ইচ্ছা হয়। কপট রাগ দেখিয়ে বলতে ইচ্ছা হয়। — আমি তো কখনো আপনার চিঠির উত্তর দেই না। তবু কেন বেহায়ার মতো চিঠি লেখেন? প্রতিউত্তরে বলবে। — বারে, এতো সুন্দরী মানবীর একটি চিঠির উত্তরে আমি সারাজীবন চিঠি লিখতে পারি। বিলু ভীষণ লজ্জা পাবে তবু সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে ছেলেটির ভালবাসার কথা শুনবে। বিলু বুঝতে পারে সে আকাশ নামের ছেলেটিকে না দেখেই তার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে। বিলু একবার সাহস করে একটা চিঠি লেখলো। পুরো চিঠিতে একটি লাইন লেখা “আপনি কে? আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছা করে।” . বিলুর কাছে চিঠি এলো দুইদিন পর। তাতে মাত্র কয়েকটা লাইন লেখা। “প্রিয়তমা বিলু তুমি আমাকে চিঠি লিখেছ আমি যে কি খুশি হয়েছি। তোমার ওই এক লাইনের চিঠি আমি কতশত বার পড়েছি সেটা কি তুমি জানো? শুনো তোমার বাড়ির সামনের মঞ্জুকেশিনী গাছটিতে বর্ষার প্রথম মঞ্জুকেশিনী ফুল যেদিন ফুটবে সেদিন তোমার সামনে হাজির হবো। ভালোবাসা নিও।” নিচে ছোট করে লেখা আকাশ। বিলুর মন খারাপ হয়ে গেলো। বর্ষা আসতে তো এখনো অনেক দেরি। দিন গড়াতে থাকে সেই সাথে বাড়তে শুরু করে চিঠির বাক্স। বিলু রোজ সকালে অনেক মমতা নিয়ে মঞ্জুকেশিনী গাছটির দিকে তাকিয়ে থাকে। জাহানারা বেগম মেয়েকে ধমক দিয়ে বলেন। — গাছের কি রূপ বাড়ছে নাকি সকাল বিকাল হা করে তাকিয়ে থাকিস? বিলু মায়ের কথায় হেসে বলে। — ও তুমি বুঝবে না মা। আমি গাছটির প্রেমে পরেছি। মেয়ের কথা শুনে চমকে উঠেন জাহানারা বেগম। মেয়ে প্রেম করছে এটা তার কাছে স্পষ্ট ধরা দিচ্ছে। জাহানারা বেগম শীতল গলায় বললেন। — তোর কি কোন ছেলের সাথে ভাব হয়েছে? বিলু মায়ের কথায় জবাব না দিয়ে লজ্জা পেয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলো। মেয়ের কর্মকাণ্ডে জাহানারা বেগমের বুকের ভেতর ধক করে উঠে। বিলু সত্যি সত্যি প্রেম করতে পারে এই চিন্তা তার মাথায় আসেনি। চোখের সামনে দেখতে দেখতে চৈত্র, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠমাস শেষ হয়ে শুরু হয় আষাঢ় মাস। একদিন সকালে বিলু ঘুম থেকে উঠে মঞ্জুকেশিনী গাছটির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। গাছটিতে ফুলে ভরে গেছে। বিলু মায়ের আলমারি থেকে লাল শাড়ী বের করে খুব সুন্দর করে সেজেগুজে কলেজে গেলো। বিলু ভেবেছিল আজ যাওয়ার পথেই আকাশ নামের ছেলেটির সাথে দেখা হবে কিন্তু দেখা হলো না। মন খারাপ হয়ে গেলো বিলুর। মনযোগ দিয়ে ক্লাস করতে পারলো না৷ কলেজ থেকে যখন বের হলো তখন দুপুর দুইটা। বিলু রিকশা না নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলো। বিলু মনে মনে খুব করে চাইছিলো আকাশের সাথে যেন দেখা হয়। বিলু বাসায় এসে বালিশ চাপা দিয়ে অনেকক্ষণ কান্না করলো। আকাশ নামের ছেলেটি কথা দিয়ে কথা রাখেনি। সেদিনের পর থেকে চিঠি আসা বন্ধ। বিলু চাতক পাখির মতো একটা চিঠির জন্য ছটফট করতে থাকে। জাহানারা বেগম মেয়েকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পরলেন। কিছু জিজ্ঞেস করলে চুপ করে থাকে। মেয়ের জন্য পাত্র দেখা শুরু করলেন। ভাবলেন বিয়ে হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। শ্রাবণের এক ঝুম বৃষ্টিতে কলেজ থেকে বিলু হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। কোথায় থেকে একটা ছেলে এসে সামনে দাঁড়িয়ে বলল। — বিলু। বিলু ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলো অনেকদিন ঘুম না হওয়ার উষ্কখুষ্ক চুলের একটা ছেলে তার দিকে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। — বিলু। আমি আকাশ। বিলু চমকে উঠে, চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। সেই সাথে প্রচন্ড রাগ হতে শুরু করে। — আপনি কেন এসেছেন? আমি আপনাকে চিনি না। আর কখনো আমার সামনে আসবেন না। এই মাসের আঠারো তারিখে আমার বিয়ে। এক নিশ্বাসে বিলু কথা গুলো বলে তীক্ষ্ণ চোখে চোয়াল শক্ত করে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। সামনের দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির চোখে অপরাধবোধ। শুধু মাথা নেড়ে অস্পষ্ট স্বরে বলল। — ও আচ্ছা। বৃষ্টির জলের সাথে ছেলেটির চোখের জল মিশে একাকার হয়ে গেলো। কেউ জানতেও পারলো না আকাশ নামের ছেলেটি কতশত ভালোবাসা নিয়ে বিলু নামের মেয়েটির কাছে এসেছিল। . আঠারো তারিখে খুব হইচই করে বিলুর বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের সব খাবার এলো সোনারগাঁও হোটেল থেকে। তারপরেও বাড়িতে অতিথিদের জন্য রান্নার করতে নামকরা দুজন বাবুর্চি নিয়ে আসা হলো। বিলু ভেবেছিল বিয়ের পর ভীষণ কষ্ট পাবে এসব কিছুই তার হলো না। নতুন স্বামী নিয়ে তার আহ্লাদ করার শেষ রইলো না। স্বামী রফিকুল ইসলামের সাথে হানিমুন করতে গেলো কক্সবাজার। হানিমুন থেকে ফিরে সবাইকে একটা করে ঝিনুকের মালা উপহার দিলো। বিয়ের ঠিক একমাস পর বিলুর নামে একটা চিঠি এলো। “প্রিয়তমা বিলু তুমি কেমন আছো গো? তোমাকে আমার শেষ কথা গুলো না বলে থাকতে পারছিলাম না। বর্ষার প্রথম মঞ্জুকেশিনী ফুল ফোটার দিন কেন তোমার কাছে যেতে পারিনি জানো? মাঝরাতে খবর পেলাম বাবা মারা গেছেন। বাসায় যাবো সেই টাকাও আমার কাছে তখন ছিল না। মেসের এক ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে সাতশো টাকা ধার করে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। পরের দিন দুপুরে বাবার জানাজা হয়। যে মানুষটা আমাদের মাথার ছাদ হয়ে ছিল সেই মানুষটার হঠাৎ এভাবে চলে যাওয়াতে ভীষণ ভেঙে পরেছিলাম। আমি পরিবারের বড় ছেলে। বাবা চলে যাওয়াতে সবার দ্বায়িত্ব এসে পরে আমার কাঁধে। প্রথম প্রথম পাগল হয়ে গেছিলাম প্রায়। যে আমি কখনো দ্বায়িত্ব কি জানতাম না। সেই আমার কাঁধে এতো গুলো মানুষের দ্বায়িত্ব। মাঝে মাঝে তোমাকে ভীষণ মনে পরতো। প্রায় রাত গুলো ঘুম হতো না তোমার কথা ভেবে। অনেক কষ্টে সময় বের করে তোমার কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তোমায় সব খুলে বলবো কিন্তু সুযোগ হয়ে উঠেনি। আজ আর লিখতে ইচ্ছা করছে না। আঙুল গুলো ব্যথা করছে। তুমি ভালো থেকো প্রিয়তমা। ভালোবাসা নিও।” বিলু জাহানারা বেগমকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কাঁদতে থাকে। মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললেন। — সব ঠিক হয়ে যাবে। রাত বারার সাথে সাথে বিলুর কান্না যেন বাড়তে থাকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ