Recents in Beach

তিতলী প্রেম বাই আসাদ

.....part-2.... রাত ৮টা। ফ্রিজ থেকে মাংস নিয়ে এক বালতি পানির মধ্যে মাংসগুলো ভিজিয়ে রাখছি৷ আপুর রুম থেকে রোমান ভাইয়া আমাকে ডাকছে। ভাইয়ার ডাক শুনে 'আসছি' বলে আমি আপুর রুমে যাই। রোমান ভাইয়া আমাকে বলেন আপু নাকি চা খাবে। আপুর চোখ খোলা। তাই আপুকে কিছু জিজ্ঞেস না করে চা করতে রান্না ঘরে গেলাম। রান্নাঘরে গিয়ে সবকিছু খুঁজে পেয়েছি কিন্তু চাপাতা পাচ্ছি না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন আর পাইনি তখন আবার আপুর রুমে যাই এবং রোমান ভাইয়াকে বলি, 'ভাইয়া, চাপাতা তো খুঁজে পাচ্ছি না।' আমার কথা শেষ হতে না হতে আপু বলে চাপাতা নাকি শেষ হয়েগেছে। তখন ভাইয়া আরিয়ানকে আমার কোলে দিয়ে চাপাতা আনতে বাহিরে যায়। আমি আরিয়ানকে কোলে নিয়ে আপুর পাশে বসে আছি। কিছুক্ষণ ধরে আপুর দিকে তাকিয়ে আছি। কয়েকবার ইচ্ছে হলো আপুর কাছে সব বলে দেই। কিন্তু কেন যেন আমি বলতে পারি না। আপুর বাচ্চা আর আপুর সাজানো-গোছানো সুখের সংসারটার দিকে তাকিয়ে একদম বলতে পারি না। মিনিট ১০ অতিক্রম হওয়ার পর রোমান ভাইয়া চাপাতা নিয়ে বাসায় ফিরলেন। আমি আরিয়ানাকে ভাইয়ার কোলে দিয়ে চাপাতা নিয়ে রান্নাঘরে চলে আসি। রোমান ভাইয়াকে দেখলে আমি যখন তখন ভয় অনুভব করি। এ এক ভীষণ ভয়ানক রকমের ভয়। মানুষ দেখলে মানুষের এতো ভয় হওয়ার কথা না। তাও আমি মানুষ দেখলে ভয় পাই। কি করবো না করবো ভেবেই পাই না। ভয়ে আমার হাত পা কাঁপে। চা তৈরি করে আপু ও ভাইয়ার জন্য দু'কাপ চা নিয়ে যাই। যখন রোমান ভাইয়ার হাতে আমি চায়ের কাপ তুলে দিতে যাই তখন আমার হাত অতিরিক্ত কাঁপতে থাকে। একসময় আমার হাত থেকে চায়ের কাপটা ফ্লোরে পরে যায়। আপু আমার দিকে তাকিয়ে বলে, 'কিরে তিতলী এত কাঁপছিস কেন?' 'কি জানি আপু হঠাৎ করে শরীরটা খুব কাঁপছে।' 'আর চা নেই?' 'আছে আপু। আমি আরেক কাপ নিয়ে আসছি।' তারপর কিচেনে গিয়ে আরেক কাপ চা এনে ভাইয়ার হাতে তুলে দেই। তখনও আমার হাত কেঁপেছিল। কিছুক্ষণ পূর্বে আমার হাত থেকে পরে যাওয়া ভাঙ্গা কাপের টুকরো এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। আমি সবগুলো টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে রান্না ঘরে যাই। রান্না ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। নিজেকে নিজের কাছে খুব অসহায় লাগে। মাথায় কিছুই আসে না। কাউকে কিছু বললে হয়তো পরামর্শ গ্রহণ করে কিছু একটা করা যেত। আমি কার কাছে বলবো তা ভেবেই অস্থির হয়ে যাই। রাতের রান্না করা শেষ। আপুকে ভাইয়া নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছে। আমি দেখছি আর ভাবছি আমার আপুটা কত সুখী। জাস্ট ভাইয়ার একটু পরিবর্তন হলে কতই না ভালো হতো। আপুর খাবার শেষে ভাইয়া আর আমি খেতে বসি। আপুর বিছানায় ভাইয়া বসে বসে খাচ্ছে আর আমি খাচ্ছি ফ্লোরে বসে। আমি ফ্লোরে বসে খাচ্ছি তাই ভাইয়া ও আপু দু'জনেই বিছানায় উঠে খাওয়ার জন্য বলেন। আমি খাবার প্লেট হাতে নিয়ে আপুর পায়ের কাছে বসে যাই। খাবার শেষ করে আপুর ঔষধ নিজ হাতে খাইয়ে দেই। সবকিছু গুছিয়ে টিভি রুমে টিভি ছেড়ে বসি। তারপর নিজের মোবাইল হাতে নিয়ে ফেবুতে একটা স্ট্যাটাস দেই। খুব ছোট্ট একটা স্ট্যাটাস। আর তা ছিল, "আমরা মেয়েরা সবার কাছে নিজেকে আপন মনে সহজ করে দিতে চাই, কিন্তু সবাই আমাদের আপন ভাবে না। আমরা প্রিয়োজন হয়ে পাশে থাকতে চাই, কিন্তু তারা আমাদের প্রয়োজন ভেবেই পাশে টানে।" টিভি চলছে। ঠিক কোন চ্যানেল চলছে আমি জানি না। মাথায় শুধু একটা জিনিস ঘুরপাক খাচ্ছে; আমাকে এই সমস্যা থেকে রক্ষা পেতেই হবে। আমি ভয় পাচ্ছি ভীষণ ভয়। ভয়ে থাকা অবস্থায় কি করবো না করবো তা ভেবে আরো বেশি ভয় পাচ্ছি। এমন সময় আমাদের স্কুলের জিয়াউল স্যারের কথা মনে পরে যায়। তিনি বলেছিলেন বিপদে নাকি আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করা সর্বোত্তম কাজ। যত বড় বিপদ হোক ২ রাকাত নফল নামাজ মনোযোগ সহকারে আদায় করলে আল্লাহ সাহায্য করেন। আমি আর কিছুই ভাবালাম না। টিভি অন রেখেই অযু করে পাশের রুমে গিয়ে এশার নামায আদায় করি। সবশেষে দু'রাকাত নামাজ খুব মনোযোগের সাথে আদায় করি। নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে কান্না করে সমস্যা সমাধানের সাহায্য চাই। নামাজ শেষ করে উঠে আপুর রুমে যাই। রোমান ভাইয়া আমাকে দেখেই মুখে হাসি নিয়ে বলেন, 'কী ব্যাপার তিতলী, টিভি অন রেখে কেউ নামায পড়ে নাকি?' 'আসলে খেয়াল ছিল না ভাইয়া।' 'তো যাও রাত তো অনেক হয়েছে ঘুমিয়ে যাও।' ভাইয়া যখন আমাকে ঘুমিয়ে যেতে বলেন তখন আমি হঠাৎ করেই নিজের কোনো পূর্ব সিদ্ধান্ত ছাড়াই বলে দেই, 'ভাইয়া আমার না ভয় লাগে, আমি আপুর কাছে ঘুমাবো। আপনি ঐ রুমে গিয়ে ঘুমান না?' 'তোমার আপু তো অসুস্থ, তোমার এখানে ঘুমাতে কষ্ট হবে তো।' 'না ভাইয়া আমার খুব ভয় লাগে।' তখন আপু একটু জোরেসোরেই রোমান ভাইয়াকে বলেন, 'তিতলী ভয় পাচ্ছে দেখো না। ও আমার কাছেই ঘুমাক। যাও তুমি ঐ রুমে গিয়ে ঘুমাও।' আপুর কথায় মনে কেমন যে এক শান্তি অনুভব করি যা বলে প্রকাশ করতে পারবো না। রোমান ভাইয়া অন্য রুমে গিয়ে শুয়ে পরেন। আমি দরজা লক করে আরিয়ানাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকি। ফজরের আযান হলে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি বিছানা ছেড়ে অযু করে নামায আদায় করি। নামায শেষে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থণা করি। সকালের নাস্তা খেয়ে রোমান ভাইয়া অফিসে চলে যায়। ভাইয়া সোনালী ব্যাংকে চাকরি করেন। সপ্তাহে শুক্রবার ও শনিবার অফডে থাকে। আজ তো বৃহস্পতিবার। আগামীকাল সারাদিন রোমান ভাইয়া বাসায় থাকবে। 'আগামীকাল সারাদিন বাসায় থাকবে' কথাটা ভাবতেই বুকে ভীষণ ভয় অনুভব হয়। মনে মনে আল্লাহকে ডাকি। এই ছাড়া তখন আর কিছুই মাথায় আসে না। সারাদিনে তিনবার চারবার আপুর কাছে সবকিছু বলে দিতে চেয়েছি। আমি জানি আপুর কাছে এসব বললে আপু আর রোমান ভাইয়ার সংসার করবে না। আপুর কী হবে? আপুর কিউট বাবু আরিয়ানের কী হবে? ইশ আমি যে পারছি না! রোমান ভাইয়া সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেন। দরজা খুলতেই কেমন একটা হাসি দিলেন। হাসিটা দিয়ে যা বুঝালেন তা একটা মেয়ে ছাড়া আর কেউ বুঝবে কিনা আমার জানা নেই। এই লোকটা বাসায় ফিরতে না ফিরতে বুকের মধ্যে ভীষণ ভয় করা আরম্ভ হয়ে যায়। বুক ধরপর করে। গতকালের মতো আজকে রাতেও আপুর কাছেই শুয়েছি। আপু এখন অনেকটা ভালো। আজ আপুর সাথে অনেক কথা বলেছি। বারবার আপুর কাছে সবকিছু বলতে চেয়েছি বাট কেন জানি পারি না। আমার নিজের প্রতি নিজের বিরক্ত লাগে। কেন আমি পারি না? কেন আমি আমার নিজের ভালোটা চাই না? আপু ঘুমিয়ে গেছে অনেক আগে। আজ এত রত হলো তাও আমার চোখে ঘুম ধরে না। মধ্যরাত পর্যন্ত আমার ঘুম নেই। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখি রাত ১টা বেজে ৩৪ মিনিট। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে অযু করে ৪ রাকাত নামায আদায় করে রোমান ভাইয়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে সাহায্য প্রার্থণা করি। তারপর আবার শুয়ে পরি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম চলে আসে। আজ শুক্রবার। দুপুরের রান্না শেষে টিভি রুমে বসে বসে টিভি দেখছি। রোমান ভাইয়া আমার পাশে এসে বসেন। কিছুক্ষণ টিভি দেখার পর আমাকে বলেন, 'চলো তিতলী লুডু খেলি। অনেকদিন লুডু খেলা হয় না।' আমি আগে আপুর বাসায় আসলে রোমান ভাইয়ার সাথে অনেক লুডু খেলতাম। কিন্তু এবার খেলা হয়নি। রোমান ভাইয়া আমার হাত থেকে টিভির রিমোট চেয়ে নিয়ে টিভি অফ করে দেয়। তারপর লুডু খুলে টি-টেবিলের উপর রাখেন। আমি আপুর রুমের দিকে তাকাই এবং দেখি আপু ঘুমিয়ে আছেন। আমি ভাবছি কাউকে কিছু না বলে রোমান ভাইয়াকে বললেই বেস্ট হবে। আমি মনে মনে আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করি যাতে ভাইয়াকে বুঝাতে পারি। তারপর হুট করেই রোমান ভাইয়ার ডান হাতে আমার হাত রাখি। রোমান ভাইয়া আমার হাতের স্পর্শ পেয়ে একটা হাসি দেয় এবং অনেকটা অবাকও হয়। আমি ভাইয়াকে বলি, 'ভাইয়া আপনাকে কিছু কথা বলতে চাই।' রোমান ভাইয়া অধির আগ্রহ নিয়ে কেমন একটা হাসি নিয়ে আমার হাতের উপর তার অন্য একটা হাত দিয়ে চেপে ধরে বলেন, 'আমার একটামাত্র শালি। তোমার সবকিছু আমাকে বলতে পারো।' আমি কৃত্রিম একটা হাসি দিয়ে ভাইয়াকে বলি, 'ভাইয়া জানেন, আমাদের না একটা ভাই নেই। সবসময় আমি আর আপু খুব মিস করতাম আর বলতাম, আমাদের একটা ভাই থাকলে কত ভালো হতো। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমি ছোটছোট খেলনা নিয়ে খেলতাম। আমি একাএকা খেলনাগুলো নিয়ে রান্না করতাম। রান্না শেষে আব্বু, আম্মু ও আপুর জন্য ছোট খেলনার প্লেটে খাবার বাড়তাম। ভাইয়া তখন আমি আরেকটা প্লেটেও খাবার বাড়তাম আর সেই প্লেটে কার জন্য খাবার বাড়তাম জানেন?' রোমান ভাইয়া আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বলেন, 'কার জন্য আবার? নিশ্চয়ই তোমার জন্য।' আমি ভাইয়ার হাত ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বুকে একটু সাহস নিয়ে বলতে থাকি, 'না ভাইয়া, আমার জন্য না। আমি ঐ প্লেটে খাবার বাড়তাম আমার একটা ভাইয়ার জন্য। আমি ভাবতাম আমাদের একটা ভাই আছেই আছে। এখন যদি তার জন্য খাবার না দেই পরে যদি ও এসে আমার সাথে কথা না বলে।' আমার চোখে জল এসে যায়। আমি চোখের জল মুছে ভাইয়াকে আবারও বলতে থাকি, 'জানেন ভাইয়া আমাদের পাশের বাসার একটা আন্টির ছেলে বাবু হয়েছিল। তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়তাম। তো আমার আম্মু আর আমি পাশের বাসার আন্টির ছেলে বাবুটা দেখতে যাই। আমি বাবুটা কোলে নিয়ে খুব আদর করি। একটা সময় তারা আমার কোল থেকে ছেলে বাবুটা নিয়ে যায়। আমি খুব কান্না করি। আম্মু আমাকে বুঝালেন এটা অন্যদের বাবু। আমাদেরও নাকি একটা ছেলে বাবু হসপিটাল থেকে কিনে আনবে। তখন আমি অনেক খুশি হয়ে যাই। জানেন ভাইয়া ঐদিন আমি আম্মুকে কাঁদতে দেখেছি।' রোমান ভাইয়া একটু নড়েচড়ে বসেছে। আমি কথা বলেই যাচ্ছি, 'যখন আমি বড় হই বা যখন আমি মোটামুটি বুঝতে শিখি তখন জানতে পারি আমার জন্মের সময় আম্মুর একটা অপারেশন করা হয়েছিল। যার কারণে আম্মুর সন্তান গর্ভধারণ করার ক্ষমতা থাকে না। এখন বুঝি ঐদিন ছেলে বাবুর জন্য আম্মু কেন কান্না করেছিল।' রোমান ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কি যেন বলবেন মনে হয়। আমি রোমান ভাইয়াকে বলি, 'ভাইয়া আমার কথা শুনুন। আজ শুধু আমি বলবো আর আপনি শুনবেন। আমার কথা শেষ হলে আপনি যা বলবেন তাই শুনবো। এমনকি যা বলবেন তাই করবো।' আমার কথায় রোমান ভাইয়া খুব লজ্জা পেলেন। চুপ করে বসে রইলেন। আমি আবারো বলতে থাকি, 'জানেন ভাইয়া আমরা সবসময়ই একটা ভাই শূণ্যতা অনুভব করতাম। আপুর যখন বিয়ে হয় আপনাকে আমি ভাই হিসেবে গ্রহণ করি। খুব ভালোবাসতাম আপনাকে। আপনি খুব ভালো ছিলেন তখন। আমাকে খুব আদরও করতেন। আম্মু বলতো আপনি যখন আমাদের আম্মুকে "আম্মু" বলে ডাকতেন আম্মুর নাকি কলিজা জুড়িয়ে যেতো।' অনেক কথা বলে ফেলছি। কেন জানি আমার ভেতর থেকে আজ কথাই বের হচ্ছে। একটু ধম নিয়ে ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ড পর রোমান ভাইয়াকে আবারো বলছি, 'ভাইয়া শেষ একটা কথার উত্তর দিবেন আশা করছি। ধরুন আপনার বড়বোনের বর যদি আপনার ছোটবোন তামান্না আপুর সাথে খারাপ সম্পর্ক করতে চায় আপনার কেমন লাগবে? বা আপনি তখন কী করবেন?' . সমাপ্ত . লিখা :আসাদ রহমান

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ