Recents in Beach

ধীরে ধীরে রাত বাই আসাদ

৩য় পর্ব . বারান্দার দিকের জানালাটা ধরে এক বিশাল নেকড়ের মতো মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে। রক্তবর্ণ চোখ দুটি তার জ্বলজ্বল করছে। লোমশ দেহ। ধারালো নখভরা হাত দুটি জানালা ধরে আছে। আবছা আলোতে কী ভয়ংকর লাগছে দৃশ্যটা! এটা কী ওয়্যারউলফ! শান্তা মারিয়া এমন জিনিস কখনই দেখেনি। শান্তা মারিয়ার থ ভাব কাঁটার আগেই জিনিসটা তার চোখের আড়ালে চলে গেল। এক অজানা ভয় তাকে ঘীরে ধরল। সে নিচে নামার সাহস পেল না। ১৫ মিনিট স্তম্ভিত হয়ে বসেই রইল মারিয়া। এরপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে বারান্দার দিকে এগুলো সে। সেখানে গিয়েও বেশ চমকাল সে। বাহিরে ভরা পুর্ণিমা। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে, মুগ্ধ দৃষ্টিতে চাঁদ দেখছে আসিফা। শান্তা মারিয়ার পায়ের শব্দ পেয়ে পেছনে ঘুরে তার চোখ বরাবর তাকিয়ে আসিফা বলল, কী ব্যাপার এখনও ঘুমাও নি? এই দৃষ্টির চাহনীতে হিম হয়ে গেল যেন শান্তা মারিয়ার শরীর। . শান্তা মারিয়া আসিফাকে এইভাবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। তাই তার প্রশ্ন প্রথমবারে শান্তা মারিয়ার কানে যায় না। আসিফা চোখ-মুখে স্বাভাবিক ভাব ফুটিয়ে মিষ্টি করে হেসে আবার বলে, কী হলো মারিয়া, এইভাবে ভূত দেখার মতো আমাকে কী দেখছ? অচেনা বাড়িতে ঘুম হচ্ছে না বুঝি? শান্তা মারিয়াও এবার কিছুটা স্বাভাবিক হলো। পুর্ণিমার আলোতে আসিফাকে এখন বেশ স্বাভাবিকই লাগছে। শান্তা মারিয়া মিষ্টি করে হেসে বলে, ঘুমাচ্ছিলাম। কারও হাঁটার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। এখন দেখি তুমি। তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে চাঁদের আলোয়। আসিফা কথাটা শুনে লজ্জামাখা একটা হাসি দেয়। এইভাবে ১০-১৫ মিনিট তারা কথা বলার পর যে যার ঘরে চলে গেল। শান্তা মারিয়া বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। তার কিছুতেই ঘুম আসছে না। তার চোখের সামনে ভাসছে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষের মতো দেখতে নেকড়েটার ভয়ংকর ছবি। আবছা আলোতে স্পষ্ট কিছুই দেখতে পায়নি সে। তবুও যা দেখেছে তাই ভয় পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। আবার আসিফার অস্বাভাবিক ভাবে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকাটাও তাকে বেশ ভাবাচ্ছে। ওয়্যারউলফ বলে কী সত্যিই কিছু আছে। আর থাকলে সেটাতো এই শহরে থাকার কথা না। ঘুমের ঘোরে সে ভূলও দেখতে পারে। হয়তো অবচেতন মনের কল্পনা , হেলুসিনেশন। এসব ভাবতে ভাবতেই চোখ লেগে যায় মারিয়ার। গভীর ঘুম আচ্ছন্ন করে ফেলে তাকে। . . সকাল ৭টার দিকে ঘুম ভাঙে আসিফার। ঘুম থেকে উঠেই একবার শান্তা মারিয়ার ঘরে উঁকি দেয় সে। অঘোরে ঘুমাচ্ছে মারিয়া। সে রান্নাঘরে চলে যায় সকালের নাস্তা বানাতে। তার কিছুক্ষণ পরেই ঘুম ভাঙে রিয়াদের। সে বিছানা থেকে উঠে হাত-মুখে ধুয়ে ওয়ার্ডরোবের দিকে এগিয়ে যায় তার ইউনিফর্ম নিতে। ওয়ার্ডরোবের ড্রয়ের খুলতেই রিতীমতো আঁতকে উঠতে হয় রিয়াদকে। ড্রয়ারে একটা ওয়্যারউলফের পোশাক। যে পোশাক পরে ওয়্যারউলফের মতো সাজা যায়। রিয়াদ দ্রুত আসিফাকে খুঁজতে খুঁজতে রান্না ঘরে চলে আসে। বিস্ময় ভরা কন্ঠে আসিফাকে প্রশ্ন করে, ওয়্যারউলফের পোশাকটা ওয়ার্ডরোবে এল কী করে? এটা তুমি আবার কেন বের করেছ? আসিফা খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলে, কেন ভয় পেয়েছ বুঝি? তোমার মনে নেই এই পোশাকটার কথা? আমাদের বাসররাতে তুমি ঘরে ঢুকে দরজা আঁটকিয়ে দেখলে বিছানায় কেউ নেই। তুমি আমাকে খুঁজতে লাগলে। এমন সময়েই এই ওয়্যারউলফের পোশাকটা পরে আমি খাটের নিচ থেকে বের হলাম। তুমি ভয়ে চিৎকার করতে করতে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গেলে। হাহাহা। তুমি কতো ভীতু!আমি ভেবেছিলাম পুলিশরা সাহসী হয়। . কথাটা শুনে লজ্জায় চোখ-মুখ ছোট হয়ে আসে রিয়াদের। সেই রাতের কথা মনে পড়তেই শরীরটা আবার কেঁপে উঠে তার। আসলেই বেশ ভয় পেয়েছিল সে সেরাতে। এই ওয়্যারউলফের জামাটা আসিফাকে তার কোন মামা যেন উপহার দিয়েছিল। জামাটা পড়লে অন্ধকারে সত্যি কারের ওয়্যারউলফের মতই লাগে। এটার মুখোশের চোখগুলোও অন্ধকারে ঝলঝল করে লাল হয়ে, নখগুলোও ধারালো মনে হয়ে দেখে। রিয়াদ গম্ভীর কণ্ঠেই জবাব দেয়, সেটা আমার ভালো করেই মনে আছে আসিফা। কিন্তু এইটাতো অন্য কোথাও প্যাকেট করে রাখা ছিল। ওয়্যারড্রোবে এল কী করে? তুমি আবার কোন উদ্দেশ্যে বের করেছ জিনিসটা? এবার আসিফার মুখে দুষ্টু একটা হাসি ফুঁটে উঠে। সে মুঁচকি হাসতে হাসতে রিয়াদকে বলে, কালরাতে এটা পরেছিলাম শান্তা মারিয়াকে ভয় দেখাতে। কথাটা শুনেই আঁতকে উঠে রিয়াদ। বলে, তোমার আর এই ছেলেমানুষী গেল না! একজন অতিথী এসেছেন আমাদের বাড়িতে আর তুমি তাকে এইভাবে ভয় দেখাচ্ছ? আসিফা শান্ত স্বরেই উত্তর দিল, ধুর! ও তোমার মতো ভীতুরাম না। মেয়েটাকে দেখে যতটানা বোকা লাগে সে আসলে ততটাও বোকা না। বেশ সাহসী। আমি ভেবেছিলাম জানালার পাশে আমাকে এই অবস্থাতে দেখে ভয়ে চিৎকার করে তোমার মতো অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। কিন্তু না! কোনো প্রকার ভয় না পেয়ে ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাঁকিয়ে রইল। চোখে-মুখে বিস্ময় কিন্তু ভয় নেই। আমি জানলা থেকে সড়ে ঘরে চলে এলাম। দ্রুত ড্রেসটা খুলে স্বাভাবিক হয়ে ওর ঘরে উঁকি দিতেই দেখি ও নিচে নামছে। কতটা সাহস দেখেছ মেয়েটার! আমি দ্রুত সড়ে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। ওর পায়ের আওয়াজ পেয়েই ভয়ংকর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালাম। ওর মধ্যে যেন ভয় ভাবটাই নেই। শুধু বিস্ময়। পরে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বললাম কিছুক্ষণ। . তুমি ওকে বলোনি যে তুমি ওকে ভয় দেখানোর জন্য ওমনটা করেছ? আসিফা আবার হাসি চেপে বলল, না, মাঝেমধ্যে ভয় পাওয়া সাস্থের জন্য ভালো। . এমনিতে আসিফা বেশ গম্ভীর মানুষ। কিন্তু যখন ছেলেমানুষী করে সেটা হয় ভয়ংকর! আসিফা মূলত শান্তা মারিয়ার রুপে ঈর্ষান্বীত হয়েই মাঝরাতে ওকে ভয় দেখাতে যায়। রিয়াদ তাকে শান্তা মারিয়াকে গিয়ে সত্যটা খুলে বলতে বলে। আসিফা বলল, শান্তা মারিয়া যখন চলে যাবে। তখন সে বলবে। এতক্ষণ আতংকেই থাক মেয়েটা। মারিয়া মেয়েটা যে একজন ডিটেকটিভ এবং অলৌকিক বিষয়ের পেছনে ছুঁটে এই বিষয়ে রিয়াদকে আজগর কিছুটা বলেছিল। এখানে নাকি কোনো এক পতীতাপল্লীর ভয়ংকর রহস্য সমাধানে এসেছে মেয়েটা। রিয়াদ এগুলোই আসিফাকে বলল। আসিফা এ কথাগুলো শুনে বেশ কৌতুহলী হলো শান্তা মারিয়ার ওপর। রহস্যের পেছনে ছুটে! বেশ মজাদারতো। ঈর্ষা ভাবটাও তার কেঁটে যায় কিছুটা। আসিফা ভাবে এইখানে আসার পর থেকে তার সাথে যা যা ঘটেছে তা কী অলৌকিক কোনো রহস্য! এবিষয়ে কী সে শান্তা মারিয়াকে কিছু বলবে! . . . বেশ বেলা করেই ঘুম ভাঙল শান্তা মারিয়ার। একটা অপরিচিত বাড়িতে এসে এতবেলা পর্যন্ত ঘুমানো তার উচিত হয়নি। তারা কী না কী ভাবছে। সে হাত-মুখ ধুয়ে আসিফার ডাকে খাবার টেবিলে গেল। খাবার শেষে ব্যাগ নিয়ে এবার শান্তা মারিয়ার তাদের বিদায় দিয়ে চলে যাবার পালা। আসিফা তাকে যেতে দিতে চাইল না কিছুতেই। চেপে ধরল তাকে। তার এখানে আশার প্রকৃত কারণ যে পতীতাপল্লীর রহস্য সমাধান করা এই বিষয়ে অনেক কিছুই জেনে নিল মারিয়ার কাছ থেকে। আসিফা স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সে এই শহরে যতদিন আছে ততদিন মারিয়াকে এখানেই থাকতে হবে। মারিয়ার এমনিতেই বাড়িটা বেশ পছন্দ হয়েছিল এছাড়া আসিফার জোড়াজুড়িতে সে আর না করতে পারেনি। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল যতদিন না এই রহস্যের সমাধান হবে সে এই বাড়িতে থাকবে। রাতটাই তো শুধু এখানে কাটাতে হবে। . কিন্তু আপাতত তাকে এই বাড়ি থেকে বের হতে হবে। ঐ পতীতাপল্লীর জায়গার মালিকের ছেলের ঠিকানা সে জানে। তার সাথে এই বিষয়ে কিছু কথা বলতে হবে। পুলিশ নিয়ে সেখানে যাওয়াটা ঠিক হবে না। তাই সে আজগরকে আর কল দেয় না। একাই রওনা দেয় ঐ লোকটার বাড়ির উদ্দেশ্যে। লোকটার নাম সম্ভবত মিজানুর রহমান। . . . মিজানুর রহমানের রোজকার রুটিন দুপুর ১টায় বাড়ির দু'তলার বারান্দায় বসে উদাস হয়ে তার পুরো বাড়িটা দেখা। বয়স তার ৪০ এর কাছাকাছি। হঠাৎ করেই যেন তিনি অনেক সম্পত্তির মালিক হয়ে গিয়েছিলেন। যদিও এত সম্পত্তির কিছুই তার রোজগারের না। ১০ বছর আগে তার বাবা হঠাৎ হার্ট ফেইল করে মারা যান। একমাত্র পুত্র হওয়াতে সব তার হাতে চলে আসে। দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে ভালোই সময় কাটছে তার। তার স্ত্রী এবং মেয়েরা বেড়াতে গেছে তার শশুর বাড়িতে। এখন সে আর কাজের লোক ছাড়া বাড়িতে তেমন আর কেউ নেই। হঠাৎ তার চোখ গেল বাড়ির বড় গেটের দিকে। দাড়োয়ান মকবুল কোনো একটা মেয়ের সাথে তর্ক-ঝগড়া করছে। মকবুলকে কড়া ভাবে বলে দেওয়া আছে অপরিচিত কাউকে কিছুতেই যাতে এই বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া না হয়। মিজান সাহেবের কাছে সব সময় একটা দূরবীন থাকে। তিনি দূরবীনে চোখ রেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মেয়েটাকে দেখছেন। মেয়েটা কোনো সাজগোজ করে আসেনি। সাজগোজ ছাড়া এত রুপবতী একটা মেয়েকে অনেক বছর পর দেখলেন যেন মিজান সাহেব। তার বাড়িটা বেশ বড়। বাড়ি থেকে মেইনগেট মোটামুটি অনেকটা দূরে। মেইনগেট দিয়ে ঢুকলে একটা সোজা রাস্তা বাড়িটা পর্যন্ত এসেছে। রাস্তার এক পাশে বাগান। আরেক পাশে সবুজ ঘাসের মাঠ। সেই মাঠে বসার জন্য সুন্দর করে চেয়ার-টেবিলের পাতা। টেবিলের উপর ব্যাঙের ছাতার মতো ছাদও রয়েছে। মিজান সাহেব মকবুলকে ফোন করে বললেন, মেয়েটাকে ভেতরে আসতে দাও। মাঠের টেবিলটায় বসতে বলো। আর মর্জিনাকে বলো ২কাপ চা যাতে দিয়ে যায়, সাথে কিছু হালকা নাস্তা। . . শান্তা মারিয়া ১৫ মিনিট ধরে মাঠের টেবিলটায় বসে আছে। এক কাপ চা খেয়েছে এরমধ্যে এবং ভালো করেই বাড়িটা পর্যবেক্ষণ করছে। বাড়িটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশ বিলাসবহুল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পায়জামা-পাঞ্জাবী পরা একটা মাঝবয়সী লোককে এইদিকে আসতে দেখা গেল। লোকটা যে মিজান সাহেব এটা নিয়ে শান্তা মারিয়ার কোনো সন্দেহ নেই। লোকটাকে দেখেই দাঁড়িয়ে সালাম দেয় সে। লোকটা সালামের জবাব না দিয়ে হাত ইশারা করে মারিয়াকে বসতে বলেন। নিজেও গোল টেবিলের একপাশে চেয়ার টেনে বসলেন। বসেই গলা খাঁকারী দিয়ে দাড়োয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, মকবুল, আমার জন্য এক কাপ চা পাঠাই দিতে বলো। এরপর শান্তা মারিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল, আপনি চা নিবেন নাকি অন্যকিছু? শান্তা মারিয়া একসাথে এক কাপের বেশি চা খায় না। তবুও ভদ্রতার খাতিরে বলল, চা। . দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। মারিয়া কি দিয়ে কথা বলা শুরু করবে বুঝতে পারছে না। লোকটাই আবার গলা খাকারী দিয়ে বলল, আপনি কিসের জন্য এসেছেন? আমি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি? মারিয়া কিছুটা ইতস্তত করে বলল, আসলে আপনার বাবা একটা পতীতাপল্লী করেছিল। সেটাতে ২০ বছর আগে একরাতে আগুন ধরে যায় এবং অনেকেই মারা যায়। এ বিষয়ে আপনার থেকে কিছু জানার ছিল। মুহুর্তেই বিদ্যুৎ গতিতে মিজান সাহেবের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। রাগান্বীত কণ্ঠে শান্তা মারিয়াক বললেন, আপনি সাংবাদিক, পুলিশ কিংবা গোয়েন্দার লোক হলে নিজ দায়িত্বে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারেন। শান্তা মারিয়াও উঠে দাঁড়াল। অনুনয়ের সুরেই বলল, দেখুন। আমি সাংবাদিক বা গোয়েন্দা পুলিশ নই। আপনি হয়তো জানেন না, সেই পুড়ে ধ্বংশ হয়ে যাওয়া পতিতাপল্লীটি ঘীরে অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। এই পর্যন্ত ১৭জন মানুষ সেখানে মারা গেছেন। আরও হয়তো অনেকেই মারা যাবেন যদি এই অভিশাপকে ধ্বংস করা না যায়। আমি এই বিষয়ে অনেকটা তথ্য জানতে পেরেছি। এখন আপনার থেকে আসল ঘটনাটা জানতে চাই। প্লিজ আমাকে সাহায্য করুণ। . লোকটা স্বাভাবিক হয়ে আবার চেয়ারে বসল। শান্ত স্বরেই প্রশ্ন করল, আচ্ছা কী জানতে চান, বলুন? শান্তা মারিয়া কোন প্রশ্নটা দিয়ে শুরু করবে ভাবছে। এমন সময় একটা ৮-১০ বছরের ছেলে একটা ট্রেতে ২কাপ চা আর কিছু বিস্কুট এনে তাদের সামনের টেবিলে রাখল। এক কাপ চা মারিয়ার দিকে এগিয়ে দিল, আরেক কাপ মিজান সাহেবের দিকে। দুজনেই একসাথে চায়ে চুমুক দিল। মারিয়ার চায়ে যেন চিনি কিছুটা কম। মিজান সাহেব চায়ে চুমুক দিয়েই একটা বিকৃত চিৎকার দিয়ে পুরো এক কাপ গরম চা ছেলেটার শরীরে ছুড়ে মেরে রাগি গলায় বললেন, কতবার বলেছি আমার চায়ে চিনি কম দিতে! এতো দেখি শরবত! ছেলেটার গায়ে গরম চা পড়ার সাথে সাথে সে আর্তনাদ করে উঠে। তার মা দূর থেকে দৌড়ে এসে কাঁদো কাঁদো চোখে ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে সেখান থেকে চলে যায়। দূর থেকে ভয়ার্থ দৃষ্টিতে মকবুলও এইদিকেই তাকিয়ে রয়েছে। ছেলেটার জন্য মমতায় মন ভরে উঠে মারিয়ার, সাথে ঘৃণা জন্মে সামনের লোকটার উপর। লোকটা কিছুটা সময় নিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বলতে শুরু করে। . দেখুন এই কথাগুলো আমি কখনও কাউকে কোনোদিন বলিনি। আপনি যখন বিস্তারিত জানতে চাইছেন তাহলে আপনাকে বলি। আমাদের অনেক শহরে জায়গা থাকলেও ঐ এলাকাটাই মূলত বাবার সবচেয়ে বেশি পছন্দ ছিল। সেখানে সে মাতব্বরের মতো থাকতো। অনেকেই বলতো আমার বাবার নাকি চরিত্র দোষ ছিল। আমার জন্মের সময়ই আমার মা মারা যান। আর বিয়ে করেননি বাবা। তাই নানান মেয়েদের সাথে রাত কাটাতেন তিনি। ঐ এলাকাগুলোতে একসময় খুবই দরিদ্রতা দেখা দেয়। মানুষ চুরি ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ে এবং অনেক মেয়েই বখাটেদের ধারা ধর্ষণ হতে থাকে। বাবা ধর্ষণ কমাতে সেখানে একটা পতীতাপল্লী খুলেন। যেখানে মেয়ে বৌরা গিয়ে তাদের দেহ বিলাবে এবং সেই অর্থে দারিদ্রতা কমাবে। অল্প কিছু টাকা দিয়ে যখন মেয়ে শরীর পাওয়া যাবে তখন আর কেউ ধর্ষণও করবে না। বিষয়টা হাস্যকর শুনালেও তখন সেই এলাকার সবাই তার সাথে একমত হয়। পতীতাপল্লী ঘরে উঠে। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা গেলেও খারাপ কাজ দিয়ে কখন খারাপ কাজকে ধ্বংশ করা যায় না। পতীতাপল্লীটি যে উদ্দেশ্যে খোলা হলো ঘটল তার উল্টো। ধর্ষণতো কমল না উল্টো দুর-দুরান্ত থেকে ভদ্র ঘরের ছেলে-পুরুষরা তাদের পরিবার ফাঁকি দিয়ে যেতে লাগল সেখানে। এলাকা ভরে গেল দালালে। পুলিশের জন্য যেন এটা স্বর্গরাজ্য হয়ে গেল। তারা কোনো বাধা দিল না। এই দিকে এই ফাঁকে এখানে গড়ে উঠতে লাগল নেশার আড্ডাখানা। নানা রকম মাদক বিক্রী শুরু হয়। বাবা যতদিনে নিজের করা ভূল বুঝতে পারে ততদিনে বেশ পাকাপুক্ত হয়ে গেছে পতীতাপল্লীটি। তাই বাবার কথায় তারা এটা বন্ধ করে না। উল্টো তাকেই মারার চেষ্টা করে। বাবা তখন বেশ চটে যায় তাদের উপর। তার ক্ষমতাও নেহাত কম ছিল না। একদিন মধ্যরাতে শ'খানেক গুন্ডা ভাড়া করে পতীতাপল্লীটি ঘেড়াও করেন বাবা। যারা পালাতে চায় তাদের কে কুপিয়ে সেখানেই জখম করা হয়। বাকিরা কিছু বুঝে উঠার আগেই কেরোসিন,পেট্রোলে দাউ দাউ করে চারদিকে আগুন জ্বলে উঠে। একটি মানুষও বাঁচেনি সে রাতে সেখানের। এই ঘটনাটা এখন পর্যন্ত কেউই জানে না। সবাই রাতারিতী আগুন ধরে যাওয়ায় হতভম্ব হয়ে যায়। পুলিশেরা সন্দেহ করে এই আগুন ইচ্ছা করে কেউ ধরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কে ধরিয়েছে এটা তারা খুঁজে পায়না। জখম হওয়া মানুষগুলোকেও একটা ঘরে আটকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনাটাও কেউ জানে না। এই প্রথম আপনাকে বললাম। এবার নিজেকে কিছুটা হালকা লাগছে। এখন অবশ্য সবাই জানলেও কিছু হবে না। আমার জানামতে এই কেসটা ক্লসড করে দেওয়া হয়েছে অনেক আগে। এছাড়া বাবাওতো হার্ট এটাকে মারা গেছেন প্রায় দশ বছর আগে। আমি অলৌকিকতায় বিশ্বাস করিনা। আপনি জানতে চাইলেন তাই জানালাম আসল ঘটনা। মৃতরা কখনো ফিরে আসে না। জায়গাটা বেশ নির্জন হওয়াতে আমার ধারণা ছিনতাই করার উদ্দেশ্যেই খুন গুলো করা হয়েছে। এদেশে এমনও রাস্তা আছে যেখানে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে বছরে শ'য়ের উপরে মানুষ মারা যায়। আর এখানেতো মাত্র ১৭ জন! . . এক নাগাড়ে কথা বলে যায় মিজান সাহেব। শান্তা মারিয়াও এক মনে কথাগুলো শুনে যায়। এক মুহুর্তের জন্যও মনোযোগ হারায় না। এখন তার কাছে অনেক কিছুই পরিষ্কার। সে ভাবতে থাকে, যেই লোকটা ঐখানে ২০বছর আগে আগুন লাগিয়েছিল সেতো ১০বছর আগেই মারা গেছে। তাহলে এখনও ঐ জায়গাটা অভিশাপ মুক্ত হয়নি কেন! মৃত আত্মারা কিসের জন্য মধ্যরাতে আবার জেগে উঠছে! কিসের জন্য নিরীহ মানুষগুলোকে হত্যা করছে তারা! . মিজান সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে বাড়ির বাইরের দিকে এগিয়ে চলল শান্তা মারিয়া। মিজান সাহেবও তাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে তার পিছু পিছু চলল। গেট থেকে বের হওয়ার আগে শান্তা মারিয়া মিজান সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল, আপনার ব্যবহার অনেক ভালো লাগল। আপনি সবার সাথে যেমন ভালো,মায়িক ব্যবহার করেন তেমন কাজের লোকদের সাথেও একটু ভালো ব্যবহার করতে পারেন। তারা আপনাকে দেখে আতংকে থাকে এবং আপনার ব্যবহারও তাদের প্রতি বেশ রুঢ়, অমায়িক। মিজান সাহেব গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন, আমি সবার সাথেই খারাপ ব্যবহার করি। আমি এমনি। আজ অনেক কাল পরে আপনার সাথে শুধু ভালো ব্যবহার করলাম। এরও একটা বিশেষ কারণ রয়েছে। আমি অনেক বছর পর আপনার মতো প্রাকৃতিক রুপবতী একটা মেয়েকে দেখলাম। উর্তী বয়সে আপনার মতো একটা রুপবতী মেয়েকে ভালোবেসেছিলাম। বাবার ভয়ে সে ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়নি। তার সাথে আপনার অনেকটা মিল রয়েছে। . এতটুকু কথা বলেই লোকটা তার বাড়ির দিকে ফিরে গেল। এই প্রথম লোকটার জন্য মমতা অনুভব করল মারিয়া। তাকেও ফিরে যেতে হবে তার পথে। . দুপুরে মারিয়া আসিফার কয়েকটা ফোন কল পায়। ইচ্ছা করেই ধরেনি। বাইরের দুপুরের খাবার সেড়ে বিকালে থানায় যায় পুলিশ অফিসার আজগরের সাথে দেখা করতে। তাকে থানায় পাওয়া যায় না। কোনো একটা কেসের তদন্তে কোথাও গিয়েছেন। ফোনেও পাওয়া যায় না তাকে। রাত ৮টা পর্যন্ত থানাতেই শান্তা মারিয়া বসে থাকে। এরপর আজগর পুলিশ ভ্যানে করে থানায় ফিরে আসে। শান্তা মারিয়াকে দেখে কিছুটা অবাক হয়। শান্তা মারিয়া আজগরকে বলে যে সে আজ মধ্য রাতেই সেই অভিশপ্ত পতিতাপল্লীতে যেতে চায়। আজগর প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেও পরে রাজি হয়। . রাত তখন প্রায় ১১টা বাজে। একটা পুলিশ ভ্যানে করে শান্তা মারিয়াকে নিয়ে বড় রাস্তার পাশের সেই বাঁ পাশের নির্জন রাস্তা ধরে এগিয়ে চলছে পুলিশ অফিসার আজগর। অলৌকিকতায় তার মোটেই বিশ্বাস নেই। তবুও একটা অজানা আতংক যেন তাকে ঘীরে ধরছে। শান্তা মারিয়া এটা নিশ্চিত হয়েই সেদিকে যাচ্ছিল যে, এমন কোনো অলৌকিকতার মুখোমুখি তারা হতে চলেছে যেটা এই মুহুর্তে তারা ভাবতেও পারছে না। কে জানে তাদের সাথে কী ঘটতে চলেছে! . . . . . . . . . . . . . ........... . . . . . . . চলবে . . . . . . . . লেখা: #Asad_Rahman

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ