অচেনা ভালবাসা

✌✌অচেনা ভালবাসা✌✌ সুপ্তি তোমাকে কতবার বারণ করেছি যে আমার চায়ের কাপে লুকিয়ে লুকিয়ে চুমুক দেওয়া বাদ দাও।তারপরেও একই কাজ বারবার কেন করো? ছুটির দিনে জানালা খুলে দিয়ে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার অনূভুতিটাই অন্যরকম। আজকেও আমি এমনটাই করছিলাম। হঠাৎ আমার শোবার ঘর থেকে মোবাইলের রিংটোনের শব্দ ভেসে আসছিল। তাই চায়ের কাপ আর খবরের কাগজ টেবিলের উপর রেখে ভেতরে গেলাম মোবাইল ধরতে। মোবাইলে কথা শেষ করে আবারো বসে পড়লাম খবরের কাগজ নিয়ে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে গিয়েই আমি থেমে গেলাম। চায়ের কাপে লিপস্টিকের দাগ। আমার আর বোঝার বাকি রইলো না, আমি মোবাইল ধরার জন্য যখন ভেতরে গিয়েছি তখনই হয়তো সুপ্তি এসে আমার চায়ে চুমুক দিয়েছে। প্রতিটা ছুটির দিনেই সুপ্তি এই কাজটা করে যাচ্ছে। " সুপ্তি, কথা কানে যায় না? তাড়াতাড়ি আমার সামনে এসে হাজির হও। " চিৎকার করে সুপ্তিকেডাক দিলাম। আজকে এর একটা বিহিত করতেই হবে। প্রতিটা ছুটির দিনে এমন চিৎকার চেঁচামেচি ভাল লাগে না। আমার ডাক শুনে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলো সুপ্তি। ওর হাত পা কাঁপছে ভয়ে। কিন্তু ওর মুখে একচিলতে হাসি। অদ্ভুত ব্যাপার বলতেই হচ্ছে। একদিকে ভয়ের কারণে কাঁপাকাঁপি, অপর দিকে মুখে হাসি। " তোমার সমস্যা কি হুহ? তোমাকে না নিষেধ করেছিলাম আমার চুমুক দেওয়া চায়ে তুমি চুমুক দিবে না। এমন কেন করো আমি বুঝি না। যাও এই চা ফেলে দিয়ে নতুন করে চা বানিয়ে নিয়ে আসো।" আমার কথা শুনে কোন কথা না বলেই সুপ্তি চায়ের কাপটা নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। আমি খবরের কাগজের দিকে নজর দিলাম। রান্নাঘর থেকে কাঁচের চুড়ির মৃদু টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে। পারিবারিক ভাবেই সুপ্তির সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। পারিবারিক ভাবে বিয়ে হওয়াতে আমার কোন সমস্যা নেই। সমস্যা হলো সুপ্তি আর আমার বয়সের পার্থক্য। আমার বয়স পয়ত্রিশ আর সুপ্তির উনিশ। মানে ষোলবছরের পার্থক্য। আমার বয়সের হিসেবে সুপ্তি আমার কাছে বাচ্চা একটা মেয়ে। ভাবতেই অবাক লাগে যখন আমি মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি তখন সবেমাত্র সুপ্তির জন্ম হয়েছে। আর সেই মেয়ে কিনাআমার স্ত্রী? তাই বিয়ের দুইমাস পার হওয়ার পরেও আমি সুপ্তির সাথে সহজ হতে পারিনি। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক তো দূরের ব্যাপার। আসলে যখনই ওর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি তখনই মনে একটা খচখচানি অনূভব করি। " এই নিন আপনার নতুন চা। " চায়ের কাপ টেবিলের উপর রেখে সুপ্তি দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষন। আমি নিজের মনে খবর পড়ছি আর চায়ে চুমুক দিচ্ছি। মেয়েটার চা বানানোর দক্ষতা অসাধারন। হঠাৎ মনে হলো ওর সাথে একটু আগেই প্রচন্ড খারাপ ব্যবহার করেছি। সামান্য একটু চায়ের জন্য এতটা খারাপ ব্যবহার করা ঠিক হয়নি। সরি বলা দরকার। সুপ্তি ততক্ষনে রান্নাঘরে চলে গেছে। আমিও সরি বলার জন্য পা বাড়ালাম সেদিকে। রান্নাঘরের সামনে গিয়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম। রান্নাঘরের ছোট্ট জানালা দিয়ে সকালের কচি রোদ ভেতরে ঢুকছে। সুপ্তি হাসি হাসি মুখ নিয়ে তাকিয়েআছে জানালার দিকে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলোসুপ্তির হাতে সেই চায়ের কাপ, যেই চা আমি ফেলে দিতে বলেছিলাম। সুপ্তি একটু পরপরই চায়ে চুমুক দিচ্ছে। দুপুরে নামাজ পড়ে ঘরে ঢুকলাম। প্রচন্ড ক্ষুদা লেগেছে। সুপ্তি নিশ্চয়ই এখনো রান্না করছে। তাই রান্নাঘরের দিকে গেলাম। নাহ সুপ্তি নেই রান্নাঘরে। রান্নাঘর থেকে বের হতেই শুনতে পেলাম শেবার ঘর থেকে গুনগুন করে গান গাওয়ার শব্দ ভেসে আসছে। তাহলে সুপ্তি ওখানেই আছে। ঘরেরদরজা একটু ফাঁক হয়ে আছে। আমি দরজা না খুলে ওই ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতর তাকালাম। যা দেখলাম তা দেখে আমার চোখ ছানাবড়া। আমার হালকা নীল রংয়ের শার্ট পরে সুপ্তি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সুপ্তি লম্বায় আমার চেয়ে খাটো। তাই শার্টটাকে পাঞ্জাবির মত লাগছে। এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে আমি হাসবো নাকি কাঁদবো বুঝতে পারছি না। অসাবধানতার ফলে দরজায় হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। সুপ্তি আয়নায় আমাকে দেখে ঘুরে তাকালো। তারপরে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। আমি যদিও অনেক অবাক হয়েছি, তারপরেও যথাসম্ভব গম্ভীর গলায় বললাম, " অনেক ক্ষুদা লেগেছে। রান্না হয়ে গেলে তাড়াতাড়ি খেতে দাও।" এতটুকু বলেই আমি চলে আসলাম। খাবার টেবিলেবসে বসে সুপ্তির পাগলামীর কথা ভেবে কিছুক্ষন হাসলাম। আসলেই পিচ্ছি একটা মেয়ে। খেতে বসে দেখলাম সুপ্তি কিছু খাচ্ছে না, শুধু হাত দিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করছে। ও খেলে খাবে, না খেলে নাই আমার কি? আমি নিজের মত খেতে লাগলাম। কিন্তু মনে অপরাধবোধ কাজ করছিলো। " কি ব্যাপার খাচ্ছো না কেন? নিজের হাতের রান্না খেতে খারাপ লাগছে বুঝি? " আমার কথা শুনে সুপ্তি ছলছল চোখে আমার দিকে তাকালো। ওর চোখ দেখে বুঝতে পারলাম ওর মন খারাপ হয়ে আছে। নিশ্চয়ই ওর বাবা মার কথা মনে পড়ছে। " কি মন খারাপ? বাবা মার কথা মনে পড়ছে বুঝি? " এবার সুপ্তি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। বোকা মেয়ে কোথাকার, বাড়ির কথা মনে পড়ছে আমাকে বললেই তো আমি ফোনে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারতাম। মুখ ফুটে কোন কথা বলে না, কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে আমার খাওয়া চা ঠিকই খেতে পারে। " আচ্ছা এখন খাও।খাওয়া শেষ হলে তোমার বাবা মার সাথে ফোনে কথা বলো।" " খেতে ভাল লাগছে না।" " না খেলে শরীর খারাপ করবে তো। আচ্ছা আমি খাইয়ে দেই? এবার তো খাবে নাকি? " এই প্রথমবার সুপ্তির প্রতি একটু টান অনুভব করছি। কেন এই টান অনুভব করছি তা জানিনা। সেটা এক রহস্য। আমি সুপ্তিকে খাইয়ে দিতে লাগলাম। ও অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। থাক একটু অবাক হওয়া শরীরের জন্য ভাল। খাওয়া শেষে সুপ্তি তার বাড়িতে কথা বললো। এখন মেয়েটার মন ভাল হয়েছে নিশ্চয়ই। বিকেলবেলা বই পড়ে কাটিয়ে দেয়া আমার অভ্যাস। তবে আজকের বিকেলবেলা অন্যভাবে কাটালে কেমন হয় তাই ভাবছি।" সুপ্তি একটু পর আমরা বাইরে ঘুরতে বের হবো। তৈরী হয়ে নাও তাড়াতাড়ি।" সুপ্তিকে ডেকে কথাটা বললাম। হ্যা আজকের বিকালটা একটু অন্যভাবে কাটালে মন্দ হয় না। সবসময় ঘরে থাকতে থাকতে নিশ্চয়ই হাঁপিয়ে গেছে সুপ্তি। আমার প্রস্তাবে টু শব্দ না করে সুপ্তি চলে গেল। তবে আমি জানি সুপ্তি অনেক খুশি হয়েছে। কিছুক্ষন পরই আমি আর সুপ্তি বের হলাম ঘুরতে। সুপ্তির চোখে অবাক বিস্ময়। সে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে আমার দিকে। আমিওমাঝে মাঝে তাকাচ্ছি ওর দিকে। আমরা পাশাপাশি হাঁটছি, কিন্তু তারপরেও যেন আমাদের মাঝখানে একটা দেয়াল রয়েছে, বয়সের দেয়াল। দেয়ালটা আজকে ভাঙ্গতে হবে। নয়তো কোনদিন ভাঙ্গতে পারবো না। রাস্তার পাশে ফুচকার দোকান। সুপ্তি আড়চোখে তাকাচ্ছে ফুচকার দোকানের দিকে। বুঝতে পারছি ও ফুচকা খেতে চাচ্ছে। কিন্তু মুখে বললে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত? " সুপ্তি ফুচকা খাবে? " " নাহ খাবো না। " " আরে খাও, আমি জানি তোমার ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে।" " আচ্ছা ঠিক আছে।" সুপ্তি ফুচকা খাচ্ছে, আর আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য অবলোকন করছি আমি।" এই আপনি এমন হা করে কি দেখেন? " " দেখছি একজন ফুচকা খাচ্ছে। ফুচকা খেতে গিয়ে ঠোঁটের লিপস্টিক নষ্ট করে ফেলেছে। যদিও লিপস্টিক ছাড়াই তাকে অনেক সুন্দর লাগে।" আমার কথা শুনে সুপ্তি লজ্জা পেয়ে গেল। মাথা নিচু করে বসে রইলো কিছুক্ষন। একটা ফুচকার উপর চামচ দিয়ে তেতুলের টক ঢাললো। তারপর ফুচকাটা দুই অাঙ্গুল দিয়ে অতি সাবধানে ধরলো। আরো সাবধানে আমার মুখের দিকে বাড়িয়ে দিল ফুচকাটা। এবার সে মুখ তুলে তাকিয়েছে। লজ্জায় লাল হয়ে আছে তার ধবধবে ফর্সা নাকের ডগা। ✌✌সমাপ্ত✌✌

কোনো মন্তব্য নেই for "অচেনা ভালবাসা"

Berlangganan via Email