ধীরে ধীরে রাত বাই আসাদ

২য় পর্ব . দীর্ঘ ৩ ঘন্টা গাড়িটি চলার পর এসে থামল একটা জীর্ণশীর্ণ বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে আসিফা এবং তার স্বামী নতুন ট্রান্সফার হয়ে আসা এই থানার এস.আই রিয়াদ হোসাইন নামলেন। বেশ তিরিক্ষি মেজাজে আছে আসিফা। সারা রাস্তা ধরে রিয়াদের সাথে ঝগড়া করতে করতে এসেছে সে। করবেই বা না কেন! তাদের বিয়ে হয়েছে মাত্র ৩ বছর হলো। এর মধ্যেই এই নিয়ে ৫ বার ট্রান্সফার হলো রিয়াদ। রিয়াদের সাথে তার বিয়ে হয় পারিবারিক সিদ্ধান্তেই। কলেজ জীবনে একটা ছেলের প্রেমে পড়েছিল আসিফা। অন্তরঙ্গও হয়েছিল তার সাথে। বিয়ে ছাড়া সবকিছুই হয়ে গিয়েছিল তাদের মধ্যে। ছেলেটা তাকে ধোঁকা দেয়। এরপরে আর কোনো ছেলেকে বিশ্বাস করতে পারেনি সে। অনার্স ২য় বর্ষে পড়ার সময় রিয়াদের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়। ছেলে পুলিশ কর্মকর্তা। আসিফাও তাই অমত করেনি। পাড়ার আন্টি-ভাবিরা তাকে বলে বেড়াতো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারীদের মধ্যে প্রথম ১০ জনই হচ্ছে পুলিশের বউরা। এদের জীবনে কোনো দুঃশ্চিনা, দুঃখ, বেদনা নেই। এরা চার হাতে টাকা কামাবে আর আলাদিনের জিনের মতো স্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ করবে। কিন্তু আসিফার ভাগ্যটা খারাপ। ৯৫ ভাগ অসৎ পুলিশ অফিসারের দেশে বাকি ৫ ভাগের একজন পড়েছে তার কঁপালে। রিয়াদ যেমন সৎ, নিষ্ঠাবান তেমন দায়িত্বশীল। মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত দায়ীত্বও কাঁধে তুলে নেয়। এতেই ঘটে বিপত্তি। এইতো সেদিন একজন সার্জেন্ট এর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে গাড়ির লাইসেন্স না থাকায় এদেশের রাষ্ট্রপতীর চেয়ে অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন একজনের নামে কেস ঠুকে দিল। প্রতিমন্ত্রীর শালকের গাড়িতে মামলা করার ধরুণই মূলত ট্রান্সফার হয়ে এই শহরে আসতে হয়েছে তাদের। নতুন কোনো জায়গায় ট্রান্সফার হলে রিয়াদ প্রফুল্ল মেজাজেই থাকে। যত ঝড় বয়ে যায় আসিফার মাথার উপর দিয়ে। ঘরের সব জিনিসপত্র গোঁছানো, ঘরের বড় জিনিসপত্র গুলো দায়িত্ব নিয়ে জায়গামতো রাখার তদারকি করা, আসবাব পত্র গাড়িতে তুলতে-নামাতে গিয়ে যাতে কোনো ক্ষতি না হয় তা দেখা। এইসব যে কত ঝামেলার কাজ তা কেবল আসিফাই জানে। তাই ওর মেজাজ এতটা তিরিক্ষি এখন। আপাতত বাড়ির কোনো বড় আসবাব পত্র কোয়াটার থেকে আনেননি তারা। কয়েকটা বড় ব্যাগে শুধু প্রয়োজনীয় জামা-কাপড় রয়েছে। ড্রাইভার ব্যাগ গুলো ও তাদের বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়েই চলে গেল। পড়ন্ত বিকেল। আসিফার মেজাজ এতক্ষণ যতটা খারাপ ছিল বাড়িটা দেখে তার কয়েকগুণ বেড়ে গেল। জীর্ণশীর্ণ বাড়িরটার উঠান ভর্তি শেওলা, আগাছা। দেয়ালের রং উঠে প্লাস্টার খসে যাওয়ার উপক্রম। বাড়ির বাহিরে এই অবস্থা হলে ভেতরটা কেমন হতে পারে এটা ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আসিফা। প্রচন্ড বিরক্তির সাথে রাগ মিশে তার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে এবং থরথর করে কাঁপছে। এখন রাগ দেখিয়ে লাভ নেই। সে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। . সে বাড়ির আশেপাশে তাঁকিয়ে বেশ বিস্মীত হলো। বাড়ির গেট থেকে কিছুটা দূরে একটা চায়ের দোকানে ১০-১২ জন মানুষ বসে রয়েছে। তারাও বিস্ময় ভরা চোখে আসিফা এবং রিয়াদের দিকে তাঁকিয়ে রয়েছে। আসিফা সেদিকে তাঁকাতেই তারা চোখ নিচে নামিয়ে নিল। তাদের চোখে-মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। তার পাশেই একটা মুদির দোকান। সেও কেমন যেন ভয়ার্থ দৃষ্টিতে বাড়বাড় তাকাচ্ছে তাদের দিকে। এই বাড়িটার গেটে বাড়ির নাম লেখা , 'রাত্রি ভিলা'। রাত্রি ভিলার পাশে বেশ কয়েকটা দু'তলা বাড়ি রয়েছে। কয়েকটা একতলা ছাপড়া ঘরও দেখা যাচ্ছে। দু'তলা কয়েকটা বাড়ি থেকে মানুষজন উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে আসিফা এবং রিয়াদকে দেখার চেষ্টা করছে। আসিফা সেদিকে তাঁকাতেই তারা জানলা গুলো আঁটকে সড়ে দাঁড়াচ্ছে। ভয়ে পাংশু হয়ে আছে যেন তাদের মুখ। আসিফা তাদের মুখে স্পষ্ট বিস্ময়ভরা ভয়ের ছাপ লক্ষ করল। আসিফা তাদের এই অদ্ভুত আচরণে নিজেও বেশ বিস্মীত হলো। বিস্ময়ে তার মেজাজ কিছুটা শান্ত হলো। রিয়াদ আশেপাশে তেমন না তাঁকিয়ে যেই একটা ব্যাগ উঁচিয়ে বাড়ির ভেতরের দিকে প্রবেশ করবে তখনি আসিফা শান্ত কন্ঠে রিয়াদকে বলল, দেখেছ, আশেপাশের লোকেরা কী অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাঁকাচ্ছে! রিয়াদ ভাবলেশহীন ভাবে কয়েকবার চারপাশে তাকাল। তার কাছে কিছুই অস্বাভাবিক লাগছে না। কিছুটা রসিকতার স্বরেই আসিফাকে বলল, আমাদের দিকে তাকাচ্ছে না। তাকাচ্ছে শুধু তোমার দিকে। তোমার মতো রুপসী মেয়ে হয়তো এই তল্লাটে আর নেই। যে কেউ তোমার দিকে ফ্যালফ্যাল করেই তাঁকাবে। তোমার মনে নেই, তোমাকে যেদিন প্রথম দেখতে গেলাম, সেদিন তোমাকে প্রথমবার দেখে ফ্যালফ্যাল করে তাঁকাতে তাঁকাতে এক গ্লাস শরবত নিজের পাঞ্জাবীতে ঢেলে দিলাম। হাহাহা। ওদের দোষ কী! রিয়াদের রসিকতা আসিফার পছন্দ হলো না। সে রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ির ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। রিয়াদও ব্যাগ হাতে তার পিছু পিছু চলল। বাড়ির দরজায় কোনো তালা নেই। হয়তো তারা আসবে ভেবে আগে থেকেই তাঁলা খোলা হয়েছে। . বাড়ির ভেতর ঢুকে রিয়াদ আর আসিফা দুজনেই স্তম্ভিত হয়ে গেল। বিস্ময়ে তাদের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। বিস্ময়ে তারা মুগ্ধ, অভিভূত। এটা তারা কোথায় প্রবেশ করেছে! এ যেন এক জমিদার বাড়ি। মেঝেতে বেশ মূল্যবান আকর্ষণীয় ডিজাইনের টাইলস। দেয়ালগুলো ঝকঝক করছে অসাধারণ পেইন্টিং এ। মাথার ওপর বিশাল একটা ঝাড়বাতি। ড্রয়িং রুমে গুছানো , পরিপাটি। বিশাল বাড়ি। বেডরুম,ওয়াশরুম, রান্নাঘর সব ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে আসিফা। সব কিছুই সুন্দর করে রাখা। বিছানা-আসবাব পত্র এতটা সুন্দর অবস্থায় এই বাড়িতে থাকবে এটা অভাবনীয়। সাধারণত পুরনো বাড়ি গুলো থাকে সম্পুর্ণ খালি। বাড়ির বাহিরের সাথে ভেতরের কোনো মিলই নেই। আসিফা এবং রিয়াদ দুজনেই মুগ্ধ,হতভম্ব, বিস্মিত। আসিফার মনের সকল রাগ, দুঃশ্চিন্তা শুণ্যে মিলিয়ে গেল। সে পুরো বাড়ি হেঁটে বেড়াল। রিয়াদও বিস্ময় কাঁটিয়ে একটা ঘরের বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল। ক্লান্তিতে তার চোখ বুজে এলো। . . রাতের জন্য তারা খাবার আগে থেকেই রান্না করে নিয়ে এসেছিল। রিয়াদকে রাতে উঠিয়ে খাবার পর্ব সেড়ে দুজনে আবার একসাথে ঘুমিয়ে পড়ল। . পরেরদিন সকাল ৮টায় ঘুম ভাঙল আসিফার। রিয়াদের জয়েনিং আরও ৩ দিন পর। তাই তার ঘুম ভাঙানোর কোনো তাড়া নেই। এই বাড়িটা একতলা। আসিফা সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে এল। চারপাশে অনেক গাছ আছে। পাখির কিচির-মিচিরের শব্দ নেই। এত বেলায় থাকারও কথা না। তবে পরিবেশটা অনেক শান্ত এবং সুন্দর। আসিফা ছাদে উঠতেই দেখল পাশে আরেকটা বিল্ডিংএ একজন মহিলাও ছাদে উঠে বসে আছে। আসিফা তাকে হায় বলাতেই মহিলাটি আঁতকে উঠে। মুখে সমস্ত ভয় আর বিস্ময় ফুঁটিয়ে দৌড়ে ছাদ থেকে চলে যায়। আসিফা তার আচরণে অবাক হয়। কিছুক্ষণ ছাদে পায়চারী করার পর আসিফা আবার নিচে নেমে আসে। ঘরে বাজার বলতে কিছুই নেই। রিয়াদও ঘুমাচ্ছে। অন্তত রুটি আর মাখন হলেও সকালের নাস্তাটা সাড়া যেত। আসিফা রিয়াদের মানিব্যাগ নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে। বাড়ির বাইরে আসতেই সে আবার উদাস হয়ে যায় জীর্ণশীর্ণ একটা বাড়ি আর উঠান ভর্তি আগাছা দেখে। এগুলো দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে। . বাড়ি থেকে বের হয়েই আবার সেই চায়ের দোকান এবং মুদির দোকান দেখতে পায় আসিফা। দোকানদার সহ আরও কিছু লোক সেখান থেকে তাকে দেখেই ভয়ে কুঁচকে গেল। মাথা নিচু করে ফেলল। আসিফার বেশ অস্বস্তি লাগতে লাগল। সে আর সে দিকে পা বাড়াল না। বিপরীত দিকের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল। সামনে যদি কোনো বাজার পাওয়া যায়। সকাল হওয়ায় সম্ভবত রাস্তায় তেমন মানুষ দেখা যাচ্ছে না। কিছুটা পথ যাওয়ার পর আসিফা দেখতে পেল খালি গায়ে একটা ৭-৮ বছরের বাচ্চা ছেলে চাল হাতে এইদিকেই আসছে। আসিফার এই এলাকার যে কারো সাথেই হোক একটু কথা বলতে ইচ্ছা করছে। তার সামনে ছেলেটা আসতেই আসিফা তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, এই ছেলে, তোর নাম কীরে? ছেলেটা কিছুটা চকিত হয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত, শুভ্র কন্ঠে বলল, আমার নাম হইল গিয়া রতন, বয়স ৮ বছর, ক্লাশ থ্রিতে পড়ি। রোল ২১। আফনের নাম কী? কোন ক্লাশে পড়েন? ছেলেটার একনাগাড়ে এই ধরণের মিষ্টি কথা বলা শুনে আসিফা খিলখিল করে হেসে দিল। কোনো উত্তর দিতে পারল না। ছেলেটা আবার বলল, আফনের বাড়ি কই? এখান থেকেও স্পষ্ট আসিফাদের ঐ বাড়িটা দেখা যায়। আসিফা আঙুলে ইশারা করে তাদের বাড়িটা দেখাল। মুহুর্তেই ছেলেটার চোখ যেন কপালে উঠার জোগাড়। বড় বড় চোখ করে, " ও আল্লা গো!" বলে চেচিয়ে চালের প্যাকেটটা রাস্তাতেই ফেলে এক দৌড়ে আসিফার নজরের বাহিরে চলে গেল। আসিফার বিস্ময়ের সীমা রইল না। ঐ বাড়িতে এমন আছেটা কী যে তাদের সবাই এতটা ভয় পাচ্ছে! আসিফা ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে চলে। পেছনে তাকালে এখন আর তাদের বাড়িটা দেখা যাচ্ছে না। কিছুটা সামনেই একসাথে কতগুলো দোকান খোলা দেখা যাচ্ছে। একটা বড় দোকানের দিকে এগিয়ে গেল আসিফা। দোকানি ইলেক্ট্রিক ওজন মাপার যন্ত্রে আটা মাপায় ব্যস্ত। একজন লোক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি হয়তো ক্রেতা। আসিফাকে দেখে ক্রেতা লোকটার মুখটা যেন শুকিয়ে গেল। আসিফা দোকানির কাছে এক প্যাকেট রুটি আর মাখন চাইল। দোকানি তার দিকে একবার তাকিয়ে আবার আটা মাপায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ক্রেতা লোকটা কাঁপা কাঁপা ভয় মিশ্রীত কন্ঠে দোকানিকে বলল, আটা পরে মাপ মিয়া! আফা কী চায় হেইডা আগে দিয়া নাও। লোকটার এমন উদ্বিগ্ন কন্ঠে আসিফার সাথে সাথে দোকানিও অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন। সে যেন কিছু বুঝতে পারছে না। এমন সময় হঠাৎ আসিফা তার কোমরে একটা শক্ত হাতের অস্তিত্ব অনুভব করে। সে আঁতকে উঠে পেছনে ফিরতেই দেখে, সেন্টো গেঞ্জি আর লুঙ্গী পরা একটা লোক বিশ্রী অশ্লীন একটা হাসি দিয়ে তার দিকে তাঁকিয়ে রয়েছে। আসিফার কাঁধে হাত দিয়ে লোকটা বলে, কী মাল রে বাবা! কইতে আইছে এই হুরপরী! আমার লগে যাইবা নাকি ঘরে? বিশ্রী লোকটা এরমধ্যে আসিফার হাত ধরে ফেলেছে। লোকটার মুখের বিশ্রী গন্ধে আর এই অদ্ভুত আঁচরণে ভয়ে কুঁচকে যায় আসিফা। এমন সময় সেই দোকানের সামনের ক্রেতা লোকটা চেঁচিয়ে উঠে বিশ্রী লোকটাকে বলল, এইডা তুই কী করলি বোকারাম! তোর এখন কী হইব! তুই জানোস কার গায়ে হাত দিছস? এই আফা ঐ পাশের পুরনো বাংলোয় গতকাল উঠছে। . লোকটার চেঁচানোর শব্দে আশেপাশে থেকে বেশ কিছু লোক জড় হয়ে যায়। সবার মুখেই আতংক। যে লোকটা এতক্ষণ বিশ্রী ভাবে আসিফার গায়ে হাত দিচ্ছিল কথাটা শুনেই মুহুর্তেই যেন রাজ্যের সকল ভয় তার মুখে ছাপ ফেলল। সে নতজানু হয়ে আসিফার পায়ের কাছে বসে ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমি বুঝতে পারি নাই আফা! আমারে মাফ কইরা দেন। . আসিফা পুরোই হতভম্ব। এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় ততই ভালো। সে রুটি আর মাখন নিয়ে দ্রুত বাড়িতে চলে আসে। . রিয়াদ ততক্ষণে উঠে আসিফাকে খোঁজা শুরু করে দিয়েছে। আসিফাকে দেখে জানতে চাইল সে কোথায় গিয়েছিল। আসিফা ব্রেড আর মাখন দিল তাকে। একবার ভাবল বাহিরে কী কী ঘটেছে তা রিয়াদকে জানাবে। পরে ভাবল, জানিয়ে কোনো লাভ নেই। উল্টো-পাল্টা একটা যুক্তি দিয়ে সে বিষয়টা হালকা ভাবেই নিবে। . খাবার শেষে আসিফাকে ঘরে রেখে রিয়াদ বাড়ির বাইরে গেল এলাকাটা দেখতে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু বাজার করতে হবে, আর আগাছা পরিষ্কারের জন্য একজন লোকও লাগবে। তাকে দেখেই যেন এলাকার সবাই ভয়ে গুঁটিয়ে যায়। একজন অতি ভয়ে ভয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে রাজি হলো। দোকানিও বেশ আতংকের সাথেই তাকে বাজার দিল। লোকগুলোর এমন আতংক এবং ভয় রিয়াদকেও বেশ ভাবিয়ে তুলল। রিয়াদের ধারণা হলো, এই এলাকায় হয়তো পুলিশেরা প্রচুর অত্যাচার করে মানুষের ওপর। তাই সে পুলিশ এটা জানায় এলাকার সবাই তাকে দেখে ভয় পাচ্ছে এবং আতংকিত হচ্ছে। . আগাছা পরিষ্কার শেষে মোটামুটি একটা অবস্থায় এসেছে বাড়িটি। আগের কোয়াটার থেকে ট্রাকে করে সব আসবাব পত্রও আনা হয়েছে এই বাড়িটিতে। স্বাভাবিক একটা গতি আসতে লাগল তাদের জীবনে। রিয়াদ থানায় জয়েন করল। আসিফা সারাদিন বাড়িতেই থাকে। বেশ কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পরও প্রতিবেশীদের সাথে কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠে না তার। আসিফা যে বেশ মিশুক টাইপের মেয়ে তা না। আগের বাড়িগুলোতে থাকার সময় সে সারাদিন বই পড়ে, টিভি দেখে, রান্না করে ঘর গুঁছিয়েই সময় পার করে দিত। প্রতিবেশীদের সাথে তেমন মিশতো না। কিন্তু এই জায়গার মতো এমন অস্বাভাবিক ব্যবহার কেউ করেননি তার সাথে। এই বিষয়টা তাকে বেশ ভাবায় এবং কৌতুহলী করে তুলে। এই বাড়িতে কী এমন আছে যে সবাই তাঁদের এতটা ভয় পায়। রিয়াদ পুলিশ বলে! উত্তর জানা নেই আসিফার। . রিয়াদ রাতে থানা থেকে ফিরে। তারা একসাথে খাবার শেষ করে। টেবিল গুঁছাতে গিয়ে রিয়াদের একটা ফাইলের ছবিতে চোখ আঁটকে যায় আসিফার। ছবিটার মানুষটাকে বেশ চেনাচেনা লাগছে আসিফার। কোথায় যেন দেখেছে। হঠাৎ মনে পড়ে, আরে!এই লোকটাইতো সেদিন বিশ্রী ভাবে তার গায়ে হাত দিয়েছিল। এই লোকটার ছবি এখানে কেন! রিয়াদের কাছে এই লোকটা সম্পর্কে জানতে চায় আসিফা। রিয়াদ যা বলে তা শুনে শিহরে উঠে সে। রিয়াদ বলে, আর বলোনা! জয়েনিং এর দিনই এই অদ্ভুত কেসটা হাতে এসেছিল। আন সলভ। লোকটা এই এলাকাতেই থাকত। নেশা-টেশা করে আর কী! হঠাৎ সেদিন একটা গাছের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়। তার ডান হাতের পাঁচটা আঙুলই কেউ কেঁটে দিয়েছে। এলাকার কেউই এ বিষয়ে কিছু বলতে পারেনি। আমরাও অনুসন্ধান করে খুনের কারণ এবং খুনীকে খুঁজে পেলাম না। নেশাগ্রস্থ অন্য কেউই হয়তো খুনটা করেছে। . আসিফার গলা শুকিয়ে যায় আতংকে। লোকটাতো সেদিন ডান হাত দিয়েই তো তার গায়ে হাত দিয়েছিল! . . . শান্তা মারিয়া মানসিক চাপে টানা ৭দিন পর্যন্ত পতীতাপল্লীর অদ্ভুত মৃত্যুর রহস্য থেকে দূরে ছিল। তারপরেই তার মনে হলো, এটা সে কী করেছে! একটা জায়গায় রহস্য জনক ভাবে একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছে আর সে সেই রহস্যের কুল কিনারা না করে নিজের বাড়িতে বসে রয়েছে! আবার একজন নিরপরাধ মানুষ মারা যাবে আর সে কিছুই করবে না! মুহুর্তেই তার মন আবার বদলে যায়। সে ছুটে যায় আবার সেই শহরে। পুলিশ অফিসার আজগর তাকে আবার দেখে বেশ অবাক হয়। শান্তা মারিয়া রিয়াজ হোসাইনের মৃত্যুর পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট সহ সবকিছু জানতে চায় আজগরের কাছে। আজগর কোনো প্রকার ইতস্ততা ছাড়াই তাকে পুরো ঘটনা খুলে বলেন। এই কেসটাও আনসলভ ই রয়ে গেছে। পোস্ট মর্টেমে এক্সিডেন্টে মৃত্যু ছাড়া আর কিছু জানা যায়নি। এই খুনটার মটিভ বা আর কোনো কিছুই জানা যায়নি। শান্তা মারিয়া জানতে চায়, এইখানে যে এতগুলো খুন হয় এর জন্য কোনো নিরাপত্তার আওতায় জায়গাটিকে আনা হয়নি কেন। আজগর সাহেব বলেন, কয়েক জন পুলিশ অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাদের ধারণা এই পতীতাপল্লীটি নাকি সত্যি সত্যিই মাঝরাতে জেগে উঠে। তাই তারা আর এখানে দায়িত্বপালনে রাজি হয়নি। পরে একজন চৌকিদারকেও রাখা হয়েছিল বড় রাস্তায়। সে যেন ওই দিকের রাস্তায় মানুষ জনদের যেতে নিষেধ করে। ২ রাত দায়িত্ব পালনের পর ৩য় দিনে পুলিশ তার লাশ পায় সেই রাস্তা থেকে। শান্তা মারিয়া দিনের আলোতেই আজগর সাহেবের সাথে সেই জায়গাটাতে যায়। ২০ বছর আগে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটা স্তুপ ছাড়া জায়গাটিকে বেশি কিছু মনে হয় না। এত বছরেও এইগুলো পরিষ্কার করা হয়নি কেন কে জানে! আজগর সাহেব বললেন, এখানে নাকি সবাই কাজ করতে ভয় পায়। এই জায়গাটা যার তিনি ১০ বছর আগেই মারা গিয়েছেন। তার একটা পুত্র আছে। তিনি এই জায়গাটা নিয়ে তেমন মাথা ঘামান নি। তাদের বিষয় সম্পত্তির অভাব নেই। এই জায়গাটা অভিশপ্ত রটে জাওয়ায় কেউ জায়গাটা কিনতেও চায় না। শান্তা মারিয়া যতটুকু জানেন এই পতিতাপল্লীতে ২০ বছর আগে সে রাতে আপনা-আপনি আগুন ধরে পুড়ে যায়নি। কেউ প্লান করে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এই কেউ টা কে, এটা সে জানে না। এই জায়গার মালিকের ছেলের সাথে কথা বলে কিছু তথ্য জানা যেতে পারে। এছাড়া একদিন মধ্যরাতে নিজেকেই এই জায়গাটিতে এসে দেখে যেতে হবে আসল ঘটনা কী। তবে আজ রাতে না। রহস্যের দিকে এগোতে হবে ধীরে ধীরে। আগে এই জায়গার মালিকের ছেলের সাথে দেখা করতে হবে। . দেখতে দেখতে বিকেল পেরিয়ে প্রায় সন্ধ্যা। থাকার মতো একটা জায়গা লাগবে শান্তা মারিয়ার। তবে এ শহরে যে কোনো আবাসিক হোটেল নেই এটা শহর দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আজগর বললেন, দেখুন ম্যাডাম। আপনি কিছু মনে করবেন না। আপনি দেখতে খুব রুপবতী। তাই আপনাকে যে এখানকার কোনো বাড়িতে রাখব, সেখানে আপনি নিরাপদ থাকবেন না। আমার স্ত্রী বাড়িতে থাকলে আমি আপনাকে আমার বাড়িতেই থাকতে বলতাম। সে গেছে বাপের বাড়ি। বাড়িতে আমি একা। এই শহরের পাশের শহরেই আমার এক বন্ধু,পুলিশ অফিসার রিয়াদ উঠেছে। এখান থেকে যেতে বড়জোড় পৌনে এক ঘন্টা লাগবে। তার নতুন কোয়াটারটা নাকি বিশাল। আপনি চাইলে রাতটা সেখানে কাঁটাতে পারেন। তার স্ত্রীও আপত্তি করবেন না। যদিও আমি ঐ শহরে কোনোদিন যাই নি। আপনি বললে আমি তার সাথে যোগাযোগ করে পুলিশ ভ্যানে করে পৌছে দিয়ে আসি। . . শান্তা মারিয়া আপত্তি করল না। ঠিকানা শুনে শুনে রিয়াদদের বাড়িতে পৌঁছতে মোটামুটি দেড় ঘন্টার মতো লাগল। শান্তা মারিয়াকে রিয়াদ এবং আসিফা দুজনেই ভালো ভাবে অভিবাধন করল। আজগর এক গ্লাস পানি খেয়েই পুলিশ ভ্যানে করে আবার ফিরে গেল। সেও এত সুন্দর বাড়ি দেখে অভিভূত। . শান্তা মারিয়া বেশ রুপবতী হওয়ায় প্রথম তাকে দেখেই রিয়াদ ড্যাবড্যাব করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল কতক্ষণ। শান্তা মারিয়া তা লক্ষ করেনি। আসিফা ঈর্শান্বীত দৃষ্টিতে চোখ লাল করে তাঁকাল রিয়াদের দিকে। রিয়াদ নিজের ভূল বুঝতে পেরে কিছুটা লজ্জা পায়। তবে শান্তা মারিয়ার এত রুপ দেখে মনে মনে খুব হিংসা হয় আসিফার। শান্তা মারিয়ার হঠাৎ এতরাতে উদ্দেশ্যহীন ভাবে থাকতে আসায় বেশ বিরক্তও হয়েছে আসিফা। সেই বিরক্তিটা যাতে শান্তা মারিয়া বুঝতে না পারে তাই বেশ ভাব জমায় সে তার সাথে। শান্তা মারিয়া তেমন মিশুক না হলেও অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ ভাব করে ফেলে আসিফার সাথে। একজন অনাকাঙ্খীত অতিথীর সাথে এত ভালো ব্যবহার মুগ্ধ করে তাকে। রাতে ৩ জনে একসাথে খাবার শেষ করে। শান্তা মারিয়াকে আলাদা একটা ঘর গুঁছিয়ে দেয় তারা। এত গুঁছালো পরিপাটি বাড়ি অনেকদিন দেখেনি শান্তা মারিয়া। ধীরে ধীরে রাত গভীর হয়ে আসে। আসিফা এবং রিয়াদ তাদের ঘরে যায়। শান্তা মারিয়া তার ঘরে। . শান্তা মারিয়া যে ঘরে রয়েছে। ঘরটিতে দুটি জানালা। একটি জানালা ঘরের বাহিরের দিকে, একটা বারান্দার দিকে। প্রচন্ড ক্লান্তিতে বিছানাতে শুয়ার সাথে সাথেই চোখ লেগে যায় মারিয়ার। মাঝরাতে হঠাৎ কিছুর হিসহিস শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তার। চোখ খুলে সে যা দেখে তা দেখে পুরো স্তম্ভিত হয়ে যায়। বারান্দার দিকের জানালাটা ধরে এক বিশাল নেকড়ের মতো মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে। রক্তবর্ণ চোখ দুটি তার জ্বলজ্বল করছে। লোমশ দেহ। ধারালো নখভরা হাত দুটি জানালা ধরে আছে। আবছা আলোতে কী ভয়ংকর লাগছে দৃশ্যটা! এটা কী ওয়্যারউলফ! শান্তা মারিয়া এমন জিনিস কখনই দেখেনি। শান্তা মারিয়ার থ ভাব কাঁটার আগেই জিনিসটা তার চোখের আড়ালে চলে গেল। এক অজানা ভয় তাকে ঘীরে ধরল। সে নিচে নামার সাহস পেল না। ১৫ মিনিট স্তম্ভিত হয়ে বসেই রইল মারিয়া। এরপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে বারান্দার দিকে এগুলো সে। সেখানে গিয়েও বেশ চমকাল সে। বাহিরে ভরা পুর্ণিমা। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে, মুগ্ধ দৃষ্টিতে চাঁদ দেখছে আসিফা। শান্তা মারিয়ার পায়ের শব্দ পেয়ে পেছনে ঘুরে তার চোখ বরাবর তাকিয়ে আসিফা বলল, কী ব্যাপার এখনও ঘুমাও নি? এই দৃষ্টির চাহনীতে হিম হয়ে গেল যেন শান্তা মারিয়ার শরীর।. . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . চলবে . . . . . . . লেখা: #Asad_Rahman

কোন মন্তব্য নেই

diane555 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.