ধীরে ধীরে রাত বাই আসাদ

৪র্থ পর্ব রাত তখন প্রায় ১১টা বাজে। একটা পুলিশ ভ্যানে করে শান্তা মারিয়াকে নিয়ে বড় রাস্তার পাশের সেই বাঁ পাশের নির্জন রাস্তা ধরে এগিয়ে চলছে পুলিশ অফিসার আজগর। অলৌকিকতায় তার মোটেই বিশ্বাস নেই। তবুও একটা অজানা আতংক যেন তাকে ঘীরে ধরছে। শান্তা মারিয়া এটা নিশ্চিত হয়েই সেদিকে যাচ্ছিল যে, এমন কোনো অলৌকিকতার মুখোমুখি তারা হতে চলেছে যেটা এই মুহুর্তে তারা ভাবতেও পারছে না। কে জানে তাদের সাথে কী ঘটতে চলেছে! . গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে পুলিশ ভ্যানটি এগিয়ে চলছে বাঁ পাশের রাস্তাটি ধরে। রাস্তাটার যত ভিতরে যাচ্ছে তারা ততই যেন নির্জনতা ঘীরে ধরছে তাদের। অজানা একটা আতংক। হঠাৎ দূরে তারা দেখতে পেল কয়েকটা ছোটঘর এবং ঘরগুলোতে আলো জ্বলছে। প্রত্যাশিত সেই দৃশ্যটা দেখার পরও শান্তা মারিয়ার বুকটা যেন ধ্বক করে কেঁপে উঠল। আজগরের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, চোখে-মুখে অজানা অচেনা ভয়। ঐতো দূরে কতগুলো ঘরে আলো জ্বলতে দেখা যাচ্ছে, বলল মারিয়া। আজগর ভাবে, এই রাস্তায় এই ঘরগুলো এল কোথা থেকে! কোনোদিনতো এই ঘরগুলো দেখেনি সে। ঘরগুলোর সামনে এসে আজগর আর শান্তা মারিয়া স্তম্ভিত হয়ে গেল। সেই ধ্বংস হওয়া পতীতাপল্লীটি আবার যেন জেগে উঠেছে। রমণীরা নানান সাজে দাঁড়িয়ে আছে ঘরগুলোর সামনে, কয়েক জন পুরুষকেও দেখা যাচ্ছে। শান্তা মারিয়া এবং আজগর দুজনেই বিস্ময়ে আর কোনো কথাই বলতে পারে না। গাড়িটা ঐ মানুষগুলোর কতটা কাছে এসে থামল। কিন্তু কেউ এইদিকে ফিরেও চাইল না। আজগর হঠাৎ বলে উঠল, আমাদের মনে হয় নিচে নেমে দেখা উচিত আসল ঘটনাটা কী! মারিয়া সাথে সাথে বলল, না! এখন গাড়ি থেকে নামাটা নিরাপদ হবে না। আমার ধারণা এরা সকলে প্রেতাত্মা। এরাই সেরাতে আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল এবং এখানে যারা আসে তাদের ওরাই খুন করে। আজগর ভেজা কন্ঠে বলল, এখন কী আমাদেরও মারবে না কি? সেইরকমইতো হওয়ার কথা, উত্তর দিল মারিয়া। তারা কী করবে ঠিক বুঝতে পারছি না। আজগর কয়েকবার জোরে হর্ণ বাজাল। তবুও তাদের গাড়ির দিকে ফিরে তাকাল না কেউ। এরা যে প্রেতাত্মা আর এই জায়গাটা যে সেই ২০ বছর আগে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সেই পতীতাপল্লী এটা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না আজগরের। তার বারবার মনে হচ্ছে তারা অন্ধকারে রাস্তা গুলিয়ে অন্য কোথাও চলে এসেছে। গাড়ির জানলা দিয়ে আজগর কয়েকবার চেঁচিয়ে ডাকল তাদের, এইযে শুনছেন, একটু এইদিকে আসুন! কই তাও তাদের কোনো সাড়া নেই। হঠাৎ আজগরের মনে হচ্ছে তার, শান্তা মারিয়া এবং এই গাড়িটার কোনো অস্তিত্বই যেন নেই তাদের কাছে। এর জন্যই অস্বস্তীতে পড়ে যায় আজগর। শান্তা মারিয়াও কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। সে রহস্য সমাধানের ক্ষেত্রে কখনই ঠান্ডা মাথায় আগে থেকে একের পর এক বিচক্ষণ পদক্ষেপ নিয়ে এগোয় না। সে একটা সোজা রাস্তা ধরে এগোতে থাকে এবং যা হওয়ার হলে দেখা যাবে ভাব নিয়ে অগ্রসর হয়। পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ যাকে বলে। এখন কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় সেটা তার মাথায় আসছে না। আপাতত এই জায়গাটা যে অভিশপ্ত এটাতো নিশ্চিত হওয়া গেল। এখন এই বিষয়ে আজগরেরও অনেক সহযোগীতা পাওয়া যাবে। কিন্তু আপাতত পরিস্থিতি না বুঝে গাড়ি থেকে নামা উচিত হবে না তাদের। শান্তা মারিয়া আজগরের দিকে তাকাতেই দেখল সে লোভাতুর দৃষ্টিতে মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। শান্তা মারিয়ার ডাকে বেশ লজ্জা পেয়েই চোখ সড়ালেন তিনি। শান্তা মারিয়া বলল, আজকে জায়গাটা দেখা হলো। আমাদের আর বেশিকিছু করা উচিত হবে না। এখন পর্যন্ত আমাদের সাথে উল্টো-পাল্টা কিছুই ঘটেনি। তবে যে কোনো মুহূর্তেই ঘটতে পারে। এখন যাওয়া যাক। আজগর আর কোনো কথা না বলে গাড়ি স্টার্ট করে দেয়। পুরো রাস্তা নির্বিঘ্নে চলে তারা। কোনো বাধার সম্মুখীন হয় না তারা। বাঁ পাশের রাস্তাটার শেষ বড় রাস্তায় উঠে এসেছে। বড় রাস্তায় উঠতেই আজগরের মনে হলো এতক্ষণ সে যেন কোনো একটা ঘোরে ছিল। মাত্রই ঘোরটা কাঁটল। সে স্বাভাবিক হয়ে শান্তা মারিয়াকে প্রশ্ন করল, এখন তাহলে আমাদের কী করা উচিত? এই খুনগুলো এখানে কেন হচ্ছে আর এইগুলো বন্ধই বা হবে কী করলে? শান্তা মারিয়া বলল, তাদের মনের কোনো একটা ইচ্ছা পূরণ হয়নি বলেই তাদের আত্মাগুলো এখনও মুক্তি পায়নি। সেই ক্ষোভেই তারা হয়তো মানুষগুলোকে খুন করছে। কিন্তু তারা কী চায়! তারা হয়তো নিজেদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চায়। আজগর কিছুটা চমকে বলে, মৃত্যুর প্রতিশোধ! সেরাতে যে, কেউ তাদের ঘরগুলোতে ইচ্ছে করে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল এটাতো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি এখনও। আর দিলেও ২০ বছর আগে কে এই কাজ করেছিল এটাতো খুঁজে বের করা মুশকিল। শান্তা মারিয়া এই কথার কোনো উত্তর দিল না। বিড়বিড় করে শুধু বলল, সে যদি মারা গিয়ে থাকে তবুও এরা মুক্তি পাচ্ছে না কেন! এরা কী জানে না যে সে মারা গেছে। না জানলে এদেরকে জানানোর উপায় কী! . . তারা গাড়ি নিয়ে থানার সামনে চলে আসে। আজগর সাহেব মারিয়াকে তার বাড়িতে রাতটা থেকে যেতে বলে। মারিয়া বলে সে থানাতেই কাঁটিয়ে দিবে। থানার একটা কক্ষের চেয়ারেই গা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে মারিয়া। . যখন ঘুম ভাঙে তখন সকাল। ঘুম থেকে উঠেই শান্তা মারিয়া ভাবে এখন সে কী করবে। এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে একজনই তাকে সব সময় সাহায্য করেন। এখন তার কাছে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভালো হবে। তার আগে একবার আসিফা এবং রিয়াদের সাথে দেখা করতে হবে। আসিফা এরমধ্যে অনেকবার কল করেছে। সে হয়তো দুঃশ্চিন্তা করছে। . আজগর সাহেব থানাতেই সকালের নাস্তার ব্যবস্থা করলেন মারিয়ার। মারিয়াকে পৌঁছে দেওয়ার কথা বললে সে বলে সে একাই যেতে পারবে। মারিয়া যেই থানা থেকে বের হবে, আমতা আমতা করে আজগর তাকে বলতে লাগল, আপনাকে একটা বিষয়ে বলা হয়নি। গতরাত থেকে বলব বলব করেও বলতে পারছি না। শান্তা মারিয়া জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আজগরের দিকে তাকাল। আজগর বিড়বিড় করে বলল, না, থাক! আজ না। পরে আরেক দিন বলব। আপনি এখন যান। . শান্তা মারিয়া স্বাভাবিক ভাবেই থানা থেকে প্রস্থান করল। . কয়েক ঘন্টা পর মারিয়া এসে পৌঁছল আসিফাদের এলাকায়। এলাকাটা আগে ঘুরে দেখেনি সে। এলাকাটিতে বেশ কয়েকটা একতলা, দুতলা বাড়ি, মুদির দোকান, চায়ের দোকান ছাড়া বিশেষ কোনো কিছুই দেখার মতো নেই। শান্তা মারিয়া যেই আসিফাদের বাড়ির দিকে যাবে হঠাৎ পেছনে ঘুরেই দেখল একটা বৃদ্ধ লোক লুঙ্গী পরা, খালি গায়ে তার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রথমে তাকে দেখে চমকে যায় মারিয়া। পরে স্বাভাবিক হয়ে লোকটার পাশ কাঁটিয়ে যেই চলে যাবে সে হঠাৎ লোকটা গম্ভীর তবে কৌতুহলী কন্ঠে বলে, কই যাইবা মাইয়া? মারিয়া বলে, এই এলাকারই একটা বাড়িতে যাবে সে। পুলিশ অফিসারের কোয়াটারে। সাথে সাথেই বৃদ্ধের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চোখে-মুখে ভয় আর আতংক আর ভয়। বুড়ো চমকে উঠে বলে, মরতে জ্বীনের বাড়িতে যাইবেন কেন? মারিয়া কিছুই না বুঝে বড়বড় চোখ করে বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকায়। বৃদ্ধ আবার বলে, আপনে কী এই বাড়িতে এর আগে কখনো গেছেন? মারিয়া হঠাৎ কী বলবে বুঝতে পারে না। নিজের অজান্তেই না সূচক ভাবে মাথা নাড়ায়। বৃদ্ধ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, আপনের কপাল ভালো ঐ বাড়িতে যাওয়ার আগেই আমার লগে দেখা হইছে। নাইলে আপনের লগে যে কী বিপদ হইতো তা আপনে ভাবতেও পারতেন না। . কিছুটা দূরেই একটা গাছ দেখা যাচ্ছে। গাছের নিচে সুন্দর করে বসার ব্যবস্থা আছে। বৃদ্ধ লোকটা মারিয়াকে নিয়ে গিয়ে সেই গাছের নিচে বসলেন। মারিয়া লোকটার কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারছে। তাই লোকটাকে পুরো ঘটনা খুলে বলতে বলল। লোকটা অতি উৎসাহেই মারিয়াকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলতে লাগল। ঘটনাটা অনেকটা এই যে: . রিয়াদ এবং আসিফা এখন যেই বাড়িটাতে রয়েছে সেই বাড়িটাতে আজ থেকে ৩০ বছর আগে একটা লোক তার পরিবার নিয়ে বাস করত। লোকটার নাম জাবেদ আলি। ঐ বাড়িটার মালিক ঐ লোকটাই ছিল। লোকটা তার স্ত্রী এবং কণ্যা সানজিদাকে নিয়ে ভালোভাবেই দিন কাঁটাচ্ছিল। সানজিদার বয়স তখন ছিল ১৮। উঠতি বয়সেই অন্য এলাকার এক ছেলের প্রেমে পড়ে যায় সে। তার প্রেমের কথা তার বাবা-মা জানতে পারলে তার কলেজ বন্ধ করিয়ে একটা ঘরে আটকে রাখে তাকে। মেয়েটা তার বাবা-মার কাছে ক্ষমা চায় আর বলে এমন আর কখনই সে করবে না। তার বাবা-মা আবার তাকে কলেজে যেতে দেয়। এই সুযোগেই একদিন কলেজের নাম করে সানজিদা ঐ ছেলেটার সাথে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। জাবেদ আলি এবং তার স্ত্রীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তারা দুজনেই যেহেতু প্রাপ্ত বয়স্ক এবং মেয়ে নিজের ইচ্ছায় পালিয়েছে তাই পুলিশও তাদের তেমন সহযোগিতা করল না। পুলিশ ছেলেটা সম্পর্কে যতটুকু জানায় ছেলেটা এখানকার স্থানীয় না। এখানে একটা কম্পানীতে মার্কেটিং এর কাজ করতো সে। তার আসল পরিচয় বা ঠিকানা কিছুই জানতে পারে না পুলিশ। অফিসে তার তেমন কোনো ডকোমেন্ট ই নেই। জাবেদ আলি এবং তার স্ত্রী প্রায় পাগল হয়ে গেল। তারা ছিল ধর্মভীরু এবং কুসংস্কারচ্ছন্ন মানুষ। তারা এক কবিরাজের মাধ্যমে জানতে পারলেন জ্বিন সাধনার মাধ্যমে তার মেয়ে কোথায় আছে এটা তারা সহজেই জানতে পারবেন। কবিরাজ তাদের জ্বীন সাধনার নিয়ম বলে দিলেন। জাবেদ আলি জ্বীন সাধনা করে পুরোই ব্যর্থ হলেন তার লক্ষে। উল্টো তার একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেল। জ্বীন সাধনার মাধ্যমে একটা খারাপ জ্বীন চলে এসেছিল তাদের বাড়িতে। সে জাবেদ আলির স্ত্রীকেই খুন করে ফেলে। জাবেদ আলি এবার পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে যায়। সৃষ্টিকর্তার প্রতি তীব্র বিদ্বেষ কাজ করতে থাকে তার মনে। সে তীব্র ভাবে জ্বীন সাধনায় মনোনিবেশ করেন। শয়তান জ্বীনদের তার বাড়িতে এনে হাজির করেন। শয়তান জ্বীনদের তুষ্ট করতে অনেক রকমের শয়তানী কাজ করতে হতো। খারাপ মেয়ে এনে বাড়ি অপবিত্র করতেও হতো মাঝে মাঝে। সবই তিনি করতেন। কিন্তু শয়তান জ্বীনদের ক্ষমতা এই এলাকার বাইরে পর্যন্ত ছিল না। তাই তার মেয়ে সম্পর্কে তারা কোনো সাহায্যই করতে পারল না। এর জন্য প্রয়োজন ছিল একটি ভালো জ্বীন। কিন্তু এর মধ্যেই জাবেদ আলি শয়তান জ্বীন সাধনায় অপবিত্র হয়ে যাওয়ায় ভালো জ্বীনদের আর আহ্বান করতে পারলেন না। খারাপ জ্বীনগুলোর জন্য সে যেমন অশুভ হয়েছে তাই সেই জ্বীনগুলোও তার কথামতো অনেক কাজ করতো। তার এত বড় জায়গা থাকলেও তার আয়ের উৎস ছিল সামান্য। মধ্যবিত্ত ভাবেই পুরোটা জীবন কাটিয়েছিলেন তিনি। তাই জ্বীনগুলোকে দিয়ে তিনি তার ঘরের ভেতরটাকে আকর্ষণীয় করে তুলেন। জ্বিনগুলো তার নানান আবদার পূরণ করতো। বাইরে থেকে তার বাড়ি দেখলে এর ভেতর টা যে এতো আকর্ষণীয় তা বোঝা যায় না। তার এই জ্বীন চর্চার কথা এলাকার সবাই জানতে পেরে যায়। এই এলাকায় তার বিরুদ্ধে যেই কথা বলতে যেত তার পোষা জ্বীন তার ক্ষতি করত। তাই সবাই তাকে খুব ভয় পেত। . একরাতে তার বাড়ি থেকে ভয়ংকর কিছুর চেঁচানোর শব্দে কেঁপে উঠে এই পুরো এলাকা। এলাকার সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে তার বাড়ির চারপাশে জড় হয়। ভয়ংকর ভয়ংকর সব অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসছিল সেই ঘর থেকে। কেউ কিছুই বুঝতে পারছিল না ভেতরে কী হচ্ছে! সবাই ভয়ে আর আতংকে যার যার ঘরে চলে গেল। পরেরদিন সকালে থেকে ঐ বাড়িতে কারও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। কয়েক জন সাহস করে বাড়িটাতে ঢুকল। এত সৌন্দর করে সাজানো বাড়ি দেখে সবাই বিস্মিত না হয়ে পারলো না। কিন্তু পুরো বাড়ি খুঁজেও জাবেদ আলিকে আর পাওয়া গেল না। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত কেউ জাবেদ আলিকে আর দেখেনি । অনেকের ধারণা জ্বীনেরা কোনো কারণে তার উপর রেগে তাকে খুন করেছে বা অত্যাধিক পছন্দ করে তাদের সাথে করে তাকে নিয়ে গিয়েছেন। অনেকেই ভাবল তার সাথে সাথে জ্বীনেরাও চলে গিয়েছে। তাই এই বাড়ির আসবাবপত্র চুরি করতে চাইল। কিন্তু যারাই এই কাজটা করতে আসতো তাদের শরীরের কোনো একটা অংশ অবশ হয়ে যেত। কয়েক জন পরিত্যাক্ত এই বাড়িটা দখল নিতে চাইল। তাদের ক্ষেত্রেও অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটতে লাগল এবং তাদের প্লান বেস্তে গেল। সবাই এই বাড়িটাকে ভয় পেয়ে এড়িয়ে চলতে থাকে। এর অনেক বছর পর পরিত্যাক্ত হিসাবে সরকার এটার দখল নিয়ে নেয়। সবাই ভাবে এখন এই বাড়িটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। নতুন সরকারি কর্মকর্তারা তাদের পরিবার নিয়ে এখানে আসেন। এরপরেই ঘটে আবার অদ্ভুত সব ঘটনা। এই বাড়ির কারও সাথে যদি এই এলাকার কেউ ঝামেলা করত তাহলে অদ্ভুত ভাবে তার কোনো একটা বড় ক্ষতি হয়ে যেত। যে এই বাড়িতে থাকে জ্বিনগুলো যেন তাদেরই বসে চলে যায়। একদিন এই বাড়িতে আসা এক পুলিশ অফিসারের মেয়ে পাশের বাড়িতে গিয়ে একটা গাছের ফুল ছিড়ে ফেলে। সেই বাড়ির মহিলাটি রেগে গিয়ে বাচ্চা মেয়েটির গালে একটা জোরে থাপ্পর দেন। পরের দিন সকালে সেই মহিলাটিকে হাত ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। মহিলাটি বলেন, রাতে নাকি অদৃশ্য কেউ জোর করে তার হাত চেপে ধরে ভেঙে দিয়েছে। এরপরে আরও এই বাড়িকে নিয়ে এইরকম অদ্ভুত , অলৌকিক সব ঘটনা ঘটতে থাকে। তাই ঐ বাড়িতে যারা বসবাস করে তাদের সকলে ভয় পেতে শুরু করে। কিন্তু কোনো পরিবারই বেশিদিন এই বাড়িতে থাকে না। কোনো এক বিচিত্র কারণে মাস খানেক এখানে থাকার পর তারা চলে যায় পরিবার সহ। হয়তো বদলি হতে হয়। ঐ বাড়িতে যারা উঠে তাদের এই এলাকার সকলেই ভয় করে। এদের সাথে যদি এলাকার কেউ ভালো সম্পর্ক গড়তে চায়, বেশিক্ষণ কথা বল তাহলে জ্বীনগুলো তাদেরও ক্ষতি করে। . . . শান্তা মারিয়া হতভম্ব ভাবে বৃদ্ধের মুখের দিকে তাঁকিয়ে পুরো ঘটনাটা শুনে। বৃদ্ধ আঞ্চলিক ভাবেই এক নাগাড়ে পুরো ঘটনা বলে ফেলে। মারিয়া কখনও ভাবতেও পারেনি একটা রহস্য সমাধান করতে গিয়ে এইরকম অদ্ভুত আরেকটা রহস্যের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। সেদিন রাতে নেকড়ের মতো মানুষটিকে জানালা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ভেবেছিল হয়তো নতুন কোনো জালে জড়িয়ে যাচ্ছে সে। কিন্তু পরের দিন আসিফার ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মারিয়া দেখে একটা ওয়্যারউলফের জামা আসিফা প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে আটকে রাখছে। তখন পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হয় শান্তা মারিয়ার কাছে। যদিও আসিফার ওমন অদ্ভুত আচরণের পেছনে কোনো কারণ খুঁজে পায় না সে। তবে লোকটার কথা শুনে শান্তা মারিয়া এখন খুবই বিস্মিত। পুরো ঘটনা শুনে মারিয়া উদ্বিগ্ন হয়ে বৃদ্ধ লোকটাকে প্রশ্ন করো, নিখুত ভাবে এই পুরো ঘটনাটা আপনি জানলেন কী করে ? বুড়োর গম্ভীর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল। ফ্যাকাশে মুখ আরও ফ্যাকাশে করে বৃদ্ধ বলে, আমার কউনের আমি কইছি। আপনে হুনলে হুনবেন। না হুনলে নাই। বিশ্বাস বড়ই কঠিন জিনিস। আপনের ভালোর লাইগাই কইতাছি ঐ বাড়িত যাইয়েন না। . . বৃদ্ধ শান্তা মারিয়ার আর কোনো কথা না শুনে আপন মনে হাঁটা দেয়। মারিয়া স্তম্ভিত হয়ে সেখানেই কিছুক্ষণ বসে থাকে। এরপর ধীরে ধীরে আসিফাদের বাড়ির দিকে এগোয়। তার শরীর গুলিয়ে উঠছে। . আসিফা দরজা খুলেই মারিয়াকে দেখে উল্লাসিত কন্ঠৈ চেঁচিয়ে উঠে, তুমি! তুমি জানো, তোমাকে নিয়ে আমি কত দুঃশ্চিন্তা করছিলাম। কল ধরছিলে না। কোনো খোঁজই নেই। রাতে ছিলে কই, খেয়েছ কী? মারিয়া ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল, সব বলছি। আগে একটু বিশ্রাম নিয়ে নেই। . দেখতে দেখতে দুপুর হয়ে গেল। মারিয়া গোসল করে আসিফার সাথে খেতে বসল। রিয়াদ ডিউটিতে আছে রাতে ফিরবে। খেতে খেতে মারিয়া গতরাতের পতীতাপল্লীর রোমাঞ্চকর ঘটনাটা খুলে বলল আসিফাকে। আসিফা মুগ্ধ হয়ে মারিয়ার কথা শুনল এবং মারিয়ার সাহসের প্রশংসাও করল। . খাবার শেষে মারিয়া তার ঘরে গিয়ে দুপুর ঘুম দিল। ঘুম স্থায়ী হলো সন্ধ্যা পর্যন্ত। তারপর উঠে আসিফার সাথে গল্প করল। রিয়াদ রাতে বাড়িতে ফিরল। একসাথে রাতের খাবার খেয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়ল। . পরের দিন সকাল ৮টায় তারা ৩ জনই নাস্তার টেবিলে বসল খাবার খেতে। মারিয়া চিন্তিত মুখে হঠাৎ পুলিশ অফিসার আজগরের কথা ভাবতে লাগল। লোকটা তাকে কিছু একটা বলতে চাইছে কিন্তু বলতে পারছে না। কী এমন কথা থাকতে পারে যা বলতে আজগর এত ইতস্তততা করছে! আজগরের সাথে আজকে একবার দেখা করতে হবে। এরপর আরেক জনের সাথে দেখা করতে হবে যিনি পতীতাপল্লীকে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি করার কোনো একটা উপায় তাকে বলে দিবেন এবং এই অদ্ভুত বাড়ির রহস্য নিয়েও তার সাথে আলোচনা করতে হবে। মারিয়া যখন খাবার টেবিলে বসে এসব ভাবছে তখন রিয়াদের মোবাইলে হঠাৎ একটা কল আসলো। রিয়াদ খাবার খেতে খেতেই কলটা ধরল। ওপাশ থেকে কেউ কিছু একটা বলল। রিয়াদ সাথে সাথে আঁৎকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার গলা দিয়ে একটা অস্ফুঃট স্বর বেরিয়ে এল, ওহ মাই গড! মারিয়া এবং আসিফা দুজনেই বিস্মিত, বিহব্বল দৃষ্টিতে রিয়াদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কল কেটেই রিয়াদ ধপাস করে আবার চেয়ারে বসে পড়ল। একবার আসিফা এবং একবার মারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ম্লান কণ্ঠে বলল, আমাকে একবার পাশের শহরে যেতে হবে। সেই ধ্বংস হওয়া পতীতাপল্লীর সামনে নাকি আজগরের লাশ পাওয়া গিয়েছে। ................................................................... . . . . . . . চলবে . . . . . . .

কোন মন্তব্য নেই

diane555 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.