সোমবার, ২৭ মে, ২০১৯

যে আলোয় আঁধার কাটে, লেখিকা ঃসূর্যস্পশ্যা তনয়া

যে আলোয় আঁধার কাটে" ~~`~~`~~`~~`~~`~~ বাংলাদেশে কি হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা আজকাল লোকাল বাসে উঠলেই বোঝা যায়।বাসে যদি ৫০ টা সিট থাকে, হেলপার ঠেসে ঠেসে আরো ৫০/৭০ জন লোক তুলবে।একটা বাসে ১০০-১২০ জন ভাবা যায়? ৭ বছর পার হয়েছে আমি শহরে পড়ালেখা করি।৫ বছর সরকারী গার্লস স্কুলে ছিলাম আর দু বছর হলো সরকারী মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছি,এখন অনার্স ১ম বর্ষে পড়ছি। বেশিরভাগ সময় আব্বু মোটরসাইকেল এ নিয়ে আসা যাওয়া করেন।কিন্তু ইদানিং আব্বুর স্কুলে অনেক পরিশ্রম হওয়ায় আমিই আসতে নিষেধ করি। আব্বু একটা হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক। এখন আমি বাসে করেই আসা যাওয়া করি। প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মখিনও হই। মাঝে মাঝে কিছু বাজে অভিজ্ঞতাও হয়। এই যেমন কিছুদিন আগে বাসে উঠে কি একটা বাজে গন্ধ নাকে আসলো আর আমি হড়হড় করে বমি করে দিলাম। ভাগ্য ভালো বিধায় একজন খাস পর্দা করা আন্টি আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসলেন। বমিতে খালি ফুচকা উঠে এসছে। আন্টিটা বলতেছে,এই মেয়ে বাড়ি থেকে টিফিন আনো না? আমি > আনি তো,কিন্তু ফ্রেন্ডরা খেয়ে নেয়। আন্টি >তাদেরকেও আনতে বলবা। আমি >ওরা অনেক দূর থেকে আসে,না খেয়ে আসে। আন্টি আর কিছু বললেন না। এবার আসি বাসের ঠেলাঠেলির প্রসঙ্গে। এতো মানুষ বাসে উঠলে গায়ে লাগার সম্ভাবনা তো থাকবেই।এটা আমার কাছে খুবই বিরক্তিকর লাগে।কিছু মানুষ তো দেখি ইচ্ছে করেই এমন করে।এইসব শয়তান গুলারে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না,গণপিটুনি দিতে হবে। যদিও আমার কোনো প্রবলেম নাই,আমি যথাসম্ভব সেফটি নিয়েই চলি। এই যেমন,স্টিলের স্কেল,সেফটিপিন,ঝালের গুড়া,ব্লেড এগুলা আমার ব্যাগে অলটাইম রাখা থাকে। সিটে বসে থাকা অবস্থায় কেউ পাশে গা ঘেষে দাড়ালেই সেফটিপিনের সদ্বব্যবহার করি।যার ফলাফল, পুরো বাসে ভিড় থাকলেও আমার পাশে কেউ দাড়ানোর সাহস পায় না হিহি। তবে কাজটা খুব সতর্কতার সাথে করা লাগে।ধরা পড়লে আর রক্ষে থাকবে না। যদিও আমি অনেক ভালো মেয়ে এটা সবাই বিশ্বাস করে,শুধু আমার বান্ধবীরা ছাড়া।আত্মীয়স্বজন ভাবে আমি ভাজা মাছ উল্টিয়েও খেতে পারিনা,কিন্তু তারা তো জানে না আমি ভাজা খাইতে অনেক পছন্দ করি।উল্টানোর কোনো প্রয়োজন নাই পুরো মাছই কড়মড় করে চাবিয়ে খেয়ে নিবো।তবে আমার সকল দুষ্টামি আমার বান্ধবীদের সাথেই।স্কুলের গাছে পেয়ারা, কামরাঙ্গা পাড়া,কলেজের গাছে জাম, সফেদা পাড়া এগুলা আমাকেই করতে হয়। তবে স্কুল/কলেজ থেকে বের হলেই আমি লজ্জাবতী লাজুক লতা।কারো চোখের দিকে তাকিয়েও কথা বলিনা। নিত্যদিন এভাবেই কাটে... এমনি একদিন আমি বাসে আসছিলাম।টার্মিনাল থেকে কিছুদূর আসার পথেই বাস একদম ফুল হয়ে গেলো।গাদাগাদি, চাপাচাপি আর ঘামের অসহ্য ঘন্ধে গা ঘিনঘিন করতেছে। আমার পাশে জানালার দিকে একজন বৃদ্ধা মহিলা।আমি সবসময় মহিলার মানুষের পাশেই বসি। হঠাৎ নাকে মিষ্টি একটা ঘ্রাণ আসলো পারফিউমের।মনে হলো পাশ থেকেই আসছে তাই সাইডে তাকালাম,কিন্তু একি! কেউ দাড়িয়ে আছে লাগছে কিন্তু মাথা দেখতে পাচ্ছি না।মনে হয় ৬ ফিটের মত লম্বা হবে।বাপরে এতো লম্বা মানুষ বাসে। বাসে ভিড় বাড়তেই থাকছে।ব্রেক কষলেই সাইডের লোকটা আমার গা এর সাথে ঘেষে আসছেন। এটা খুব বিরক্ত লাগলো। আমি মনে মনে বললাম সুহা Let's do... যেই ভাবা সেই কাজ।লোকটা সরে সরে যায়তেছে।বাট বাসে এতো ভিড় পা ফেলার জায়গা নেই।তাই উনি সরতেও পারছেন না। উনি নিশ্চয় আমার দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু আমি এমন ভাব করতেছি যেন বাহিরের প্রকৃতি আমাকে মুগ্ধ করে দিয়েছে... একটুপর বাসের ভিড় খানিকটা কমে গেলো।আমার পাশের উনিও নাই। নেমে গেছে কিনা দেখার জন্য এদিক ওদিক তাকাতেই দেখি আমার সিটের পাশের অপজিট সিটে দুইটা ছেলে বসে।যাদের মধ্যে একজন আমার দিকে কটমট লুক নিয়ে তাকিয়ে।শার্ট দেখেই আমি আৎকে উঠেছি।এতো ঐ লোকটা,যিনি আমার পাশে দাড়ায়ছিলো। আমি জানলার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে নিলাম।নামার আগ পর্যন্ত আর তাকায়নি। বাস থামতেই আমি নেমে জোর পায়ে হাটা ধরলাম।আমার বাসাটা বেশ খানিকটা দূরে।৫ টাকা ভাড়া লাগে।আমি সাধারণত অটোতে যাই,আজ কিছু না পেয়ে হাটা ধরেছি। পিছন থেকে কথার আওয়াজ আসছিলো দেখে পিছনে তাকালাম।ওমা এই ছেলে আমার পিছন পিছন কেন আসছে।সাথে আরেকজন গুন্ডা নিয়ে। মনে মনে দোয়া পড়তেছি। হাটার গতি বাড়ালাম বাট তাও ওনাদের চাইতে বেশি আগে যায়তে পারলাম না। কি করেই বা পারব আমি ৫'৩" আর ওনারা মনে হয় ৬ ফিটের কাছাকাছি।ওনারা ১ পা ফেললে যতদূর যাবে আমি ২ পা ফেলে ততদূর যাব। মনে মনে আবার প্লান করলাম যদি ওনারা আমার সাথে কিছু করতে আসে ঝালের গুড়াগুলো চোখে দিয়ে পালাবো।তাই ঝালের প্যাকেট টা হাতে নিলাম। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে তারা তেমন কিছু করার আগেই বাসার কাছে চলে এসছি।বাসায় ঢুকেই মেইনগেট লক করে দিলাম।তারপর উপরে দুতলায় চলে আসলাম। -উফফ কি যে শান্তি লাগছে জানালা দিয়ে দেখতে গেলাম ওনারা চলে গেছি কিনা,দেখি কার সাথে কথা বলছে। একটুপর দেখি কলিং বেলটা বাজছে।আব্বু বলল কিরে সুহা,গেইট লক করে এসছিস নাকি? আমি বললাম,জী আব্বু। আব্বু গেইট খুলতে নিচে চলে গেলেন। সাথে করে কারা যেন আসলো। আম্মু আমাকে বলল সুহা তাড়াতাড়ি দু গ্লাস শরবত বানিয়ে ফেল,তোর আব্বুর স্কুলের প্রিন্সিপাল স্যারের ছেলে আর ভাইপো এসছে। আমি শুধু বললাম,ওনারা কি অনেক লম্বা? আম্মু বলল হ্যা,অনেক লম্বা। আমি তো ভয়ে ঢোক গিলতেছি। আজ আমার কীর্তি ফাঁস না হয়ে যায়। ওনারা আবার নালিশ করতে আসেনি তো? ভয়ে ভয়ে গেলাম রান্নাঘরে শরবত বানাতে। আব্বু আমাকে শরবত নিয়ে যাওয়ার জন্য ডাকতেছে।আমি তো ভয়ে শেষ।এমন সময় আম্মু বলল থাক,তোর যাওয়া লাগবে না।তোর বাপের কোনো কান্ডজ্ঞান নাই,আইবড়ো ছেলের সামনে সেয়ানা মেয়েকে ডাকতেছে।বুড়া হতে চলল,কবে যে হুশ হবে। যদিও আমি সেই লেভেলের সুন্দরী না,তবে বিয়ের জন্য দেখতে এসে পাত্র পক্ষ ফিরে যাবে না এটা শিওর।লম্বা চুল,বড় বড় চোখ যদিও গায়ের রং টা খুব বেশি ফর্সা নয়। যাগ গে,আমি তো বাঁচলাম। আম্মুদের রুমটা গেস্ট রুমের পাশে হওয়ায় ওই রুমে যেয়ে ওনাদের কথা শোনার চেষ্টা করলাম। যা বুঝলাম, প্রিন্সিপালের মেয়ের বিয়েতে আমাদের পুরো পরিবারকে দাওয়াত দিতে এসছে।আম্মু উনাদের দুপুরের খাবার না খাইয়ে ছাড়লেন না।যাওয়ার সময় ওনাদের ভিতর একজন আব্বু কে বলল,মামা আপনাকে একটা কথা বলব যদি কিছু মনে না করেন। আব্বু> হুম বাবা বলো। লোকটি> আপনি জানেনই তো আমাদের পুরো পরিবার মোটামুটিরকম খাস পর্দা করে।তাই আব্বু চাচ্ছে বিয়েতেও যেন কোনোরকম পর্দার খেলাফ না হয়।তো আপনি পারলে আপনার পরিবারের মহিলাদের শরীয়ত মোতাবেক পোশাক পরালে ভাল হত। আব্বু> বাহ,বাহ এতো খুব ভালো কথা।দেখো তোমার আন্টি তো মোটামুটিভাবে পর্দা করেই।আর আমার মেয়েরা তো এতো লাজুক মানুষের সামনে বেরোতেই চাই না। লোকটি> মা শা আল্লাহ।তাহলে আজ আসি।আর আপনারা কিন্তু আগের দিন সকালেই চলে আসবেন।সকালের খাওয়া আমাদের বাসায় এসেই খাবেন, না হলে কিন্তু আব্বু আমাকে বকবে। আচ্ছা আসি,আসসালামু ওয়ালাইকুম। আব্বু > ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ,আচ্ছা বাবা যাও। এদিকে আমি আর আমার ছোট বোন হাসতে হাসতে শেষ....বিয়েতে নাকি বোরখা পরতে হবে হে হে হে। এমনিতে বিয়ে বাড়িতে যায়তে আমার মন চাই না।তার উপরে আবার বোরখা পরে। যদিও আমি শর্ট বোরখা আর স্কার্ফ পরি কিন্তু মুখ ঢাকি না। তো আম্মু আমাদের দু বোনের জন্য,বোরখা, হাতমোজা,পা মোজা কিনে আনলেন।আর বললেন এখন থেকে তোদেরকেও খাস পর্দা করাবো।খুব হইছে স্টাইল করে বেড়ানো।আমি বললাম ঠিক আছে করব বাট হুজুরের সাথে বিয়ে দিবা না। আম্মু > কেন? আমি> হুজুররা আনরোমান্টিক হয়। আম্মু> হপপ হি হি হি দেখতে দেখতে বিয়ে বাড়ি যাওয়ার দিন চলে আসলো, সকাল থেকেই প্রিন্সিপাল আঙ্কেল ফোন দিচ্ছে, তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য। আম্মু দুইদিন থেকেই ব্যাগ গুছিয়ে রাখছে। * অবশেষে আমরা বিয়ে বাড়ি পৌছলাম।হাত পা মোজাসহ ফুল বোরখা পরে আমরা দুই বোন সিদ্ধ হয়ে গেছি। বিয়ে বাড়িতে ঢুকে সবাইকে সালাম দিলাম।আম্মু বলছিলো পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে। আমি বললাম আমি ফেসবুকে একটা পোস্টে পড়েছি পায়ে হাত দিয়ে সালাম দেওয়া জায়েজ না। এরপর আমরা কনের রুমে গেলাম,কনের নাম মিলি।আমার বয়সী। তাই কিছুক্ষণেই আমাদেরর ভাব হয়ে গেলো।মিলি আমাকে ওর রুমেই থাকতে বলল। যে আন্টি শরবত দিয়ে গেলেন ওনাকে দেখে অবাক হইছি,উনি মিলির আম্মু ওই যে বাসে যে আন্টি আমাকে হেল্প করেছিলেন, বমি হওয়ার সময়। যাক ভালো লাগলো,আন্টিও আমাকে চিনতে পারলেন। আন্টি জিগ্যেস করলেন খাস পর্দা কবে শুরু করেছি,কি করে যে বলি বিয়ে খাইতে এসে হি হি। বললাম,এইতো কিছুদিন।আমি অতোটা ধার্মিক নয়,তবে মিথ্যা কথা বলতে বা বলা একদম পছন্দ করিনা।কিন্তু এখন সম্মান রক্ষার্থে বলতে হলো। বাসায় কিভাবে পর্দা করব মিলির সাথে শিখে নিলাম।লং কামিজের সাথে,লং প্লাজু আর ওড়নার উপর হিজাব।অবশ্য আমি তো রুমের বাহিরে তেমন যায় না। বিকেলে মিলির রুমে বসে চুল আচড়াচ্ছি,মিলি তো চুল দেখে অবাক।ও যত্ন করে চুল বেঁধে দিলো,এমন সময় দরজা নক করার শব্দ।আমি তাড়িতাড়ি ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে ফেললাম,মিলির ভাইয়া মানে সেই লোকটি রুমের বাহির থেকে মিলির হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে চলে গেলো। আমি মিলিকে জিগ্যেস করলাম,আচ্ছা তোমার ভাইয়ার বয়স কত? মিলি> ২৫ হবে আমি> কি বলো,মাত্র ২৫?আমি তো ভাবছি ৪০ হবে।হি হি মিলি> আসলে অল্প বয়সে দাঁড়ি রেখে দিছে তাই হয়তো মিলি বলল,চলো ছাদে যায়... ওয়াও ছাদে গিয়ে আমার চোখ ছানাবড়া। এতো সুন্দর চারিপাশে গাছপালা।অনেক রকম রং বেরং এর ফুল।আরেকটা জিনিশ ভালো লাগছে,ছাদের চারপাশে ৫ ফিট উঁচু দেওয়াল দেওয়া।তাই ছাদে থাকলে কেউ দেখতেও পাবেনা। মিলি বলল,ছাদে তেমন কেউ আসেনা। কিছুক্ষণ থেকে আমরা আবার নীচে গেলাম। ডাইনিং ক্রস করার সময়,মিলির ভাইকে দেখে বাসের ঘটনাটা মনে পড়ে গেলো।মনে মনে হেসে ফেললাম।বেচারা,.... * বিয়ের দিন মিলির আম্মু আমাকে কাজ দিলেন আমি যেন মিলির বান্ধবী যারা আসবে সবার আতিথেয়তার দিকে খেয়াল রাখি। মিলির বিয়েটা এতো সাধারণভাবে হলো,আমি অবাক হয়ে গেলাম। মসজিদে খেজুর বিলিয়ে বিয়ে হলো,পাত্রের বাসা থেকে মাত্র ৫ জন লোক এসছে।ভাবলাম মিলি পার্লারে যাবে কিন্তু না সে জিলবাব,হাত মোজা,পা মোজা পরে রেডি হলো।বিয়ের পাত্রীর সাজ দেখে আমি আমার বোন থ হয়ে গেছি। বাসার যত মহিলা এসছে সবাই বোরখা পরে মনে হচ্ছে কোনো জান্নাতি বাগান। চলবে.... লেখিকা- সূর্যস্পশ্যা তনয়া

কোন মন্তব্য নেই: