ধীরে ধীরে রাত -বাই আসাদ

#ধীরে_ধীরে_রাত . ৫ম পর্ব . মারিয়া এবং আসিফা দুজনেই বিস্মিত, বিহব্বল দৃষ্টিতে রিয়াদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কল কেটেই রিয়াদ ধপাস করে আবার চেয়ারে বসে পড়ল। একবার আসিফা এবং একবার মারিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ম্লান কণ্ঠে বলল, আমাকে একবার পাশের শহরে যেতে হবে। সেই ধ্বংস হওয়া পতীতাপল্লীর সামনে নাকি আজগরের লাশ পাওয়া গিয়েছে। . কথাটা শুনে শান্তা মারিয়া পুরোই স্তম্ভিত হয়ে গেল। আজগর কেন পতীতাপল্লীতে তাকে না জানিয়ে আবার একা একা যাবে! তার লাশ পাওয়া গিয়েছে মানেটা কী! তারা আর কেউই নাস্তা শেষ করতে পারল না। রিয়াদ দ্রুত উঠে তার ইউনিফর্ম পরে নিল। শান্তা মারিয়া কিছুতেই উঠে দাঁড়াতে পারছে না। তার পা সমানে কাঁপছে। সে হতভম্ব ভাব ছেড়ে কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না। আসিফা হা করে দুজনের কার্যকলাপ দেখছে। রিয়াদ পুলিশের ইউনিফর্ম পরে তৈরি হতেই শান্তা মারিয়া উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, আমিও যাব আপনার সাথে। রিয়াদ কোনো আপত্তি করল না। আসিফাকে একা বাড়িতে রেখে রিয়াদ আর শান্তা মারিয়া দুজনেই বেরিয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে। প্রথমে তারা গেল রিয়াদের থানায়। সেখান থেকে পুলিশ ভ্যানে করে তারা সোজা চলে গেল পতীতাপল্লীতে অর্থ্যাৎ ঘটনাস্থলে। . সেই জায়গাটিকে বা জায়গাটির বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণণা করার মতো বিশেষ কিছু আর অবশিষ্ট নেই। রিয়াজ হোসাইনের মৃত্যু যেভাবে হয়েছে এটা যেন তারই পুনরাবৃত্তি। অবশ্য এখানে যে কয়টি হত্যা হয়েছে সবগুলো একই প্রক্রিয়ায় সংগঠিত হয়েছে। পতীতাপল্লীর ভেতরে আজগরের ছিন্নভিন্ন লাশ পড়ে রয়েছে। তার কাছেই একটা পুলিশ ভ্যান যেটা চালিয়ে আজগর এখানে এসেছিলেন। তার পুলিশ ভ্যান দাড়াই সে খুন হয়েছে। ভারী রহস্য জনক পুরো বিষয়টা সবার কাছে। . এরই মধ্যে আজগর সাহেবের পরিবার এখানে চলে এসেছেন। তারা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। শান্তা মারিয়া কিছুতেই বুঝতে পারছে না এখন সে কী করবে। হঠাৎ এই ধরণের একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি যে তাকে হতে হবে এটা সে ভাবতেও পারেনি। এই কেসের তদন্ত কর্মকর্তা রিয়াদ হলে এই কেসটার রহস্যে উন্মোচনে শান্তা মারিয়ার সুবিধা হতো। কিন্তু কেসটার তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছে অন্য একজন অফিসারকে। ঐ অফিসার মারিয়াকে চেনে না এবং বিশ্বাস করে এই কেসের সঙ্গে মারিয়াকে রাখবেন না এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই তার। আজগর শেষমেশ কিছু একটা বলতে চাইছিল মারিয়াকে। কিন্তু কী! মারিয়ার মাথায় আসে না! আজগরের বাড়িতে গিয়ে তার ঘর তল্লাসী করলে কী কিছু পাওয়া যাবে! অনেক সময় অনেকে মনের কথা তার ঘরের মধ্যে সে লুকিয়ে রাখে। কোনো ডায়রী বা খাতায়! কিন্তু কারও বাড়ির তল্লাসী করার অধিকার তার নেই। ঐ তদন্ত পুলিশ অফিসারের সহায়তা ছাড়া শান্তা মারিয়ার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব না। তাই তার সঙ্গে আগে মিশতে হবে। . রিয়াদের কাছে এ ব্যাপারে মারিয়া সাহায্য চায়। রিয়াদ সেই তদন্তকর্তা পুলিশ অফিসারের সাথে শান্তা মারিয়ার পরিচয় করিয়ে দেন। শান্তা মারিয়াও যে এই ধ্বংস হয়ে যাওয়া পতীতাপল্লীর একের পর এক খুনের রহস্য সমাধান করতে এখানে এসেছেন তাও বললেন তাকে। শান্তা মারিয়া ভেবেছিল লোকটা তাকে এড়িয়ে চলবে এবং তাকে তেমন গুরুত্ব দিবে না। কিন্তু পুলিশ অফিসার লোকটা তার কথা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গেই নিলেন। মারিয়াও তাকে সে রাতে আজগরের সাথে এখানে আসার অভিজ্ঞতা পুরোটা বর্ণণা করে বলে। পুলিশ অফিসার সাদিক, এর পুর্বেও এই পতীতাপল্লী যে মধ্যরাতে জেগে উঠে এই ধরণের অদ্ভুত কথা শুনেছিলেন। কিন্তু অলৌকিকতায় তার বিশ্বাস নেই। তাও শান্তা মারিয়ার এমন অদ্ভুত কথা শুনে তিনি বেশ অবাক হলেন। তার ধারণা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই খুনগুলো করা হয়। আজগর হয়তো রাতে ছিনতাইকারী দলের কাউকে চিনে ফেলেছিল তাই তাকে ফাঁদে ফেলে হত্যা করা হয়। শান্তা মারিয়া সাদিককে বলেন, একবার আজগরের বাড়িতে তাদের তল্লাসী করা উচিত। হয়তো সেখান থেকে কোনো সুত্র পাওয়া যেতে পারে। পুলিশ অফিসার সাদিক বেশি কিছু না ভেবেই তার সাথে একমত হলেন। আজগরের লাশ পোস্ট মর্টেমের জন্য পাঠান হলো। রিয়াদ আজগরের পরিবারকে কয়েকবার স্বান্তনা দিতে চাইলেও পরিবার পর্যন্ত সাহস করে যেতে পারল না। কাউকে স্বান্তনা দেওয়ার অভ্যাস তার কখনই ছিল না। তার বিশ্বাস এতে কারও কষ্ট কমে না। আজগরের পরিবার এম্বুল্যান্সে করে আজগরের লাশের সাথেই হাসপাতালে গেল। আজগরের স্ত্রী থেকে তাদের বাড়ির চাবি নিয়ে সাদিক, শান্তা মারিয়া আরও কয়েক জন কনস্টেবলকে নিয়ে তাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। রিয়াদের আর কোনো কিছু করার থাকে না। পুলিশ ভ্যানে করে এম্বুল্যান্সের সাথে গিয়ে আজগরের লাশ হাসপাতাল পর্যন্ত পৌছে দিয়ে সে আবার তার বাড়ির দিকে ফিরে চলে। . . . শান্তা মারিয়া এবং রিয়াদ চলে যাওয়ার পর আসিফা গেট বন্ধ করে চুপচাপ ঘরে বসে ছিল। আজগরের হঠাৎ মৃত্যুতে সেও শোকে রয়েছে। তবে বুঝতে পারছে না শোকটা কিভাবে সে প্রকাশ করবে। আসিফার নিজেকে কেন যেন এখন খুব নিঃসঙ্গ লাগছে। রিয়াদ ও মারিয়া কী সুন্দর ইচ্ছে হলেই যেখানে সেখানে ছুটে যেতে পারে। কিন্তু সে পারে না। কোনো একটা অদৃশ্য মায়া যেন তাকে বাড়ির বাইরের দুনিয়া থেকে আড়াল করে রাখে। যে শহরে যে বাড়িতেই সে যায় না কেন, তার গৃহিনীর বাইরে আর যেন কোনো পরিচয়ই নেই। অথচ একসময় সে কত ভালো গাইত আর নাচতো। আসিফা যখন ড্রয়িংরুমে বসে এসব ভাবছে ঠিক সেই সময়েই তার বেডরুম থেকে খটখট শব্দে কারও চেয়ার নাড়ানোর শব্দে আঁতকে উঠে সে। চমকে উঠে বলে, কে ওখানে? শব্দটা কমলো না। সময়ের সাথে সাথে বেড়েই চলেছে। আসিফা যেন ভয়ে কুঁচকে গেল। কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে বেডরুমের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। বেডরুমে ঢুকে তার সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হলো। আশ্চর্যের বিষয় এ ঘরে কোনো চেয়ার বা টেবিল নেই। আছে একটা বিছানা, একটা ওয়ার্ডরোব, বিছানার সাথে লাগোয়া একটা ড্রেসিং টেবিল আর দেয়ালের পাশে একটা আলমারি। তাহলে খটখট শব্দটা কোথা থেকে আসছিল! এটা কী তার মনের ভূল ছিল! নাহ, সে স্পষ্ট শুনেছে শব্দটা। একী! হঠাৎ আবার সেই খটখট শব্দটা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে শব্দটা এঘর থেকেই আসছে। কিন্তু কোনো কিছুই নড়তে দেখা যাচ্ছে না। আসিফার ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে। তার মনে হয় রিয়াদকে একটা কল দেওয়া উচিত। এমন সময়ে তার চারপাশটা পুরো ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যায়। সে আর কিছুই দেখতে পায় না আশে পাশের। আসিফা ভাবে সে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু না! সে বেশ স্বাভাবিকই আছে। এইতো একটু আগে ওতো সূর্যের আলোয় ভরে ছিল চারদিক। মুহুর্তেই চারদিকে আমাবস্যার রাত নেমে এল কী করে! আসিফা এসব ভাবতে ভাবতে এক ধমকা বাতাসে যেন ঘরের একটা জানলা খুলে গেল। জানলা গলে ঘরের ভেতর পড়ল এক টুকরো চাঁদের আলোর মতো আলো। ধীরে ধীরে আসিফা আবছা আলোয় পুরো ঘরটা অস্পষ্ট ভাবে দেখতে পায়। আলোটা ধীরে ধীরে কিছুটা তীব্র হয়। যে আলোতে একটা মানুষের অবয়ব বোঝা যায় কিন্তু তার চেহারা বোঝা যায় না। আবছা আলোয় অস্পষ্টভাবে আসিফা দেখতে পায় তার কিছুটা সামনে তার দিকে পিঠ করে একটা রকিং চেয়ার দুলছে। চেয়ারটাতে যে কেউ একজন বসে আছে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কে? এর এই ঘরে রকিং চেয়ার এল কোত্থেকে! প্রচন্ড ভয় আর আতংকে আসিফা টু শব্দটাও করতে পারে না। তার শরীরের রক্ত যেন জমে হিম হয়ে যাচ্ছে। তারচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার রকিং চেয়ারে দু'পাশে সাদা পোশাক পরা দু'টি দানব আকৃতির মানব মুর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ গতিতে রকিং চেয়ারটা উল্টো দিকে ঘুরে আসিফার মুখোমুখি হলো। চেয়ারের লোকটা হাত উঁচিয়ে পেছনের দিকে ইশারা করতেই সেই দানব আকৃতির মূর্তি দুটো শুণ্যে মিলিয়ে গেল। আবছা আলোয় চেয়ারটা এবং লোকটার অবয়বের অস্তিত্ব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। আসিফার মুখ থেকে অস্ফুঃট কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বেরিয়ে এল, কে আপনি? প্রশ্ন শুনে সামনের চেয়ারে বসা লোকটা যেন দাড়ুন মজা পেল। হাহাহা করে বিকট বিশ্রী ভয়ংকর শব্দ করে হাসতে লাগল। এরপর হাসি কিছুটা কমিয়ে বেশ ঠান্ডা কন্ঠেই চেয়ারের লোকটা আসিফাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ভয় পাশ না মেয়ে। আমি তোর কোনো ক্ষতি করতে আসিনি। আমি তোর কল্পনা মাত্র। বাস্তবে তোর মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আমার থেকে কেড়ে নিয়েছেন। তাই কল্পনার আশ্রয় নেওয়া। তুই তোর চারপাশে যা দেখছিস, এমন কী আমি নিজেও একটা মায়া। কথাটা শুনে আসিফার হতভম্ব ভাবটা কাঁটার বদলে উল্টো যেন আরও বেড়ে গেল। সে যা দেখছে তা কল্পনার বেশি কিছু হতে পারে না। কিন্তু কল্পনায় কেউ তাকে বলবে এটা একটা কল্পনা মাত্র, এটা অভাবনীয়। আসিফা আবার বলল, আপনি আমার কাছে কী চান? লোকটা কথাটা শুনে আবার সেই বিশ্রীভাবে হাসতে হাসতে বলতে লাগল, আমার কিছু চাওয়ার নেই রে বোকা। আমি যাবতীয় চাওয়া-পাওয়ার উর্ধ্বে চলে গেছি। আমি এসেছি তোর জন্য। তোর কিছু চাওয়ার থাকলে সেটা আমি পুর্ণ করব। তোর কোনো বিপদ হলে আমি রক্ষা করব। তোর কেউ ক্ষতি করতে চাইলে তাকে শেষ করে দিব। আমার কাছে এমন একটা জিনিস আছে যা আমি তোকে দিতে পারি। আমি দেওয়ার জন্যই এসেছি। যেই জিনিসটার জন্য মানুষ অনেক সাধনা করেও পায় না সেই জিনিসটাই আমি তোকে দিতে চাই। আসিফা কিছুটা কৌতুহলী কন্ঠে জানতে চাইল, কী সেটা? এবার লোকটা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কিছুটা অহংকার মিশ্রিত উঁচু কন্ঠে বলল, ক্ষমতা! আমি তোকে অদ্ভুত অলৌকিক ক্ষমতা দিতে চাই। যে ক্ষমতার সঠিক ব্যবহারে তুই এই পৃথিবীতে রাজত্ব করতে পারবি। চোখের নিমিষেই যে কোনো শত্রুকে করতে পারবি ধ্বংস। অনুগত ভৃত্যের মতো তোর কথা অনুসরণ করে চলবে অনেক জ্বীন। এর জন্য তোকে শুধু করতে হবে একটা কাজ। কাজটা করবি আমার জন্য। লোকটার সাথে এতক্ষণ কথা বলে লোকটাকে এখন একজন অতি সাধারণ মানুষ মনে হচ্ছে আসিফার। চারপাশের ভয়ংকর পরিবেশটাও কিছুটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। আসিফার ভয় অনেকটাই কমে গেছে। সে কিছুটা বিদ্রুপ মেশানো কন্ঠে বলল, এই না আপনি বললেন আপনি সকল চাওয়া-পাওয়ার উর্ধ্বে! তাহলে আমাকে দিয়ে আবার কী কাজ করাতে চাইছেন! লোকটা কথাটা শুনে কিছুটা যেন রেগে গেল। ধপাস করে আবার চেয়ারে বসে পড়ল। কন্ঠ কিছুটা মলীন করে আবার বলল, আমি এখন যাচ্ছি। তোর কল্পনার জগৎ ছিড়ে যাবে, তুই আবার বাস্তবতার দুনিয়ায় ফিরে যাবি। আমি আবার আসব তোর কল্পনায়। একটা বিশ্বাস রাখতে পারিস। আমি তোর বন্ধু। আমি তোর ভালো ছাড়া খারাপ কিছুই চাই না। আমি শুধু তোর উপকারই করে যাব। তুই শুধু আমার একটা কাজ করে দিবি। তুই আগে স্বাভাবিক হয়ে আমাকে বিশ্বাস কর। পরে তোকে কাজটা করতে দিব। এখন কল্পনা মুক্তি পাক। . হঠাৎই প্রচন্ড আলোতে ধাঁধিয়ে উঠল আসিফার চোখ। সে কয়েক মুহুর্ত চোখ খুলতে পারল না। যখন চোখ খুলল চারপাশে আলো। জানালা বন্ধ। এর উপরের কাঁচ দিয়ে রোদের আভা ঘরে প্রবেশ করছে। আসিফার মাথা ঘুরাচ্ছে। তার সাথে এতক্ষণ কী ঘটল তার কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। হঠাৎ বাড়ির কলিং বেলটা বেজে উঠল। রিয়াদ এসেছে বোধহয়। আসিফা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। . . . শান্তা মারিয়া ও সাদিক আজগরের বাড়ির সামনে পুলিশ ভ্যানে করে পৌঁছে বেশ কিছুক্ষণ পর। এরইমধ্যে আজগরের মৃত্যুর খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এবং পুলিশের ভ্যান আসতে থেকে আশেপাশের মানুষরা বাড়ির সামনে ভীর জমাচ্ছে। কনস্ট্যাবলরা সেদিক নিয়ন্ত্রনেই ব্যস্ত। সাদিক এবং মারিয়া গেটের তালা খুলে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। বাড়ি তল্লাসীতে সাদিকের তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। তার এখন মনে হচ্ছে এই মেয়েটার কথা শোনা তার মোটেও উচিত হয়নি। মেয়েটাকে দেখে তেমন বুদ্ধিমতী মনে হচ্ছে না। এছাড়া এই আজগরের খুনটা হয়েছে বাকি খুনগুলোর মতোই। সেখান থেকে বোঝা যায় এটা পুর্বপরিকল্পিত কোনো খুন না। হঠাৎ পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে বাকিদের মতো তাকেও মরতে হয়েছে। তাহলে এই বাড়িতে যে খুনের কোনো সুত্র খোঁজা পুরোই বৃথা। কিন্তু এই মেয়েটার বাড়িটা তল্লাসীর পেছনে এতটা আগ্রহ দেখে বেশ অবাক হচ্ছেন সাদিক। . শান্তা মারিয়াও জানে যে এই বাড়িতে খুনের কোনো সুত্র পাওয়া যাবে না। তার তল্লাসী করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আজগর তাকে কী কথা বলতে চেয়েছিল তার কোনো সুত্র যদি এই বাড়িতে পাওয়া যায়। আজগর যখন কথাটা বলতে চেয়েছিল তখন মারিয়ার কাছে কথাটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও, এখন মনে হচ্ছে। আজগর হয়তো এই পতীতাপল্লী সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য জানতো যেটা শান্তা মারিয়া জানে না। . তারা দুজনেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাড়িটা দেখছিল। বাড়িটাতে মোট ২টা বেডরুম, একটা ড্রয়িং রুম। খুব সহজেই শান্তা মারিয়া বুঝে ফেলল দু'টো রুমের একটা শোবার ঘর আরেকটা ঘর আজগরের কাজ করার জন্য। কাজ করার ঘরটাতে দু'টো আলমারি ভর্তি নানান বই। একপাশে একটা টেবিল এবং তার সামনে একটা চেয়ার। টেবিল ভর্তি নানান ফাইল। মারিয়া ভাবল কিছু থাকলে এই ঘরটাতেই থাকতে পারে। সাদিক যাতে তাকে সন্দেহ না করে তাই স্বাভাবিক কণ্ঠেই তাকে বলল, আপনি বরং বেডরুমটার তল্লাসী নিন, আমি এই ঘরটা দেখি কিছু পাওয়া যায় কিনা। নিরুৎসাহে সাদিক পাশের বেডরুমে চলে গেল। সাদিক চলে যেতেই শান্তা মারিয়া দ্রুত ঘরটাতে তল্লাসী শুরু করে। তল্লাসী বলতে টেবিলের কয়েকটা ফাইল উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দেখতে থাকে। এইভাবে যে কোনো সুত্র থাকলেও পাওয়া যাবে না তা জানে মারিয়া। কিন্তু তার আর কিইবা করার আছে। সংকীর্ণ সময়। হঠাৎ টেবিলের নিচের দিকে তাঁকাতেই কয়েকটা ফাইলের নিচের দিকের একটা ডায়েরীতে চোখ আটকে যায় মারিয়ার। তার মনে কিছুটা আশা জাগে। এই ডায়েরিটা যদি আজগরের বেক্তিগত ডায়েরি হয় তাহলে অনেক কিছুই জানতে পারবে সে। মারিয়া ডায়েরিটা হাতে তুলে নেয়। যেই খুলতে যাবে এমন সময় সাদিক আবার এই ঘরে চলে আসল। মলীন মুখে বলল, আমার শুধু সময়টাই নষ্ট হলো। আর কিছুই না। কোনো বিশেষ কিছুই তো দেখতে পেলাম না বাড়িটিতে। এখন তবে যাওয়া যাক। এই বলেই সাদিক এই ঘরটা চোখ দিয়ে কয়েক বার পর্যবেক্ষণ করে নিল। সাদিককে হঠাৎ এই ঘরে আসতে দেখেই আৎকে উঠেছিল সে। শান্তা মারিয়া চুপসে ডায়েরিটা নিজের শরীরের সাথে লাগিয়ে ধীরে ধীরে ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে চলল। হঠাৎ পেছন থেকে সাদিক মারিয়া বলে ডাক দিতেই মারিয়ার বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। মারিয়া এবার নিশ্চিত সে এই ডায়েরি সম্পর্কে জানতে চাইবে এখন। মারিয়া ম্লান মুখে পেছনে ঘুরে তাকাল। দেখল সাদিকের হাতে একটা কাগজ। কাগজটা সে মারিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এই যে আপনার ডায়েরি থেকে কাগজটা পড়ে গেছে। মারিয়া ভেতরে ভেতরে যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মারিয়ার কাঁধে একটা ব্যাগ রয়েছে। সাদিক স্বাভাবিক ভাবেই ভেবেছে মারিয়া যেহেতু একজন ডিটেকটিভ তাই সে সাথে করেই হয়তো একটা ডায়েরি নিয়ে এসেছে ইনফর্মেশনগুলো নোট করতে। মারিয়া কাগজটা হাতে নিয়ে ডায়েরির ভেতরে কাগজটা ঢুকিয়ে ডায়েরিটা তার কাঁধ ব্যাগে রাখে। এরপর তারা দুজনেই বাড়ি তালা দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। মারিয়া আর সাদিকের সাথে পুলিশ ভ্যানে করে যায় না। সে সাদিককে বলল যে, সে এখান থেকেই রিয়াদের বাড়িতে চলে যাবে। তাদের সাথে তার আর কাজ নেই। তার সময় নষ্ট করার জন্য দুঃখিত। সাদিক পুলিশ ভ্যান নিয়ে চলে যেতেই মারিয়া দ্রুত ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করে। ডায়েরির পৃষ্ঠাগুলো উল্টিয়ে সে বেশ হতাশ হয়। পুরো ডায়েরিটাই ফাঁকা। কোনো কিছুই লেখা নেই এতে। এখানে আসাটাই তাহলে বৃথা গেল। অন্য কোন সূত্র ধরে এগোতে হবে তাকে। হঠাৎ তার মনে পড়ে সেই কাগজটার কথা যেটা এই ডায়েরি থেকে পড়ে গিয়েছিল এবং সাদিক তাকে দিয়েছিল। ডায়েরির ভেতরে কাগজটা না পেয়ে চমকে উঠে মারিয়া। পরক্ষণেই বুঝতে পারে হয়তো ব্যাগের ভেতরে পড়ে গেছে। ব্যাগের ভেতরেও নেই! কাগজটা আবার ডায়েরি খোলার সাথে সাথে পড়ে গিয়েছিল তার পায়ের কাছে। ডায়েরিটা ব্যাগে রেখে কাগজটা হাতে তুলে নেয় মারিয়া। দেখতে পায় এটা একটা চিঠি। যেটা আজগর লিখেছে শান্তা মারিয়ার উদ্দেশ্যেই। মারিয়া বেশ অবাক হয়। সে যে এখানে আসবে এই বিষয়ে আজগর এতটা নিশ্চিত ছিল কী করে! শান্তা মারিয়া চিঠিটা পড়ে পুরোই স্তম্ভিত,হতভম্ব হয়ে গেল। চিঠিটাতে পতীতাপল্লীর রহস্য বিষয়ে কিছুই লেখা নেই। রিয়াদ এবং আসিফা বর্তমানে যে বাড়িটাতে থাকে সে বাড়ি সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য লিখেছে আজগর যা পড়ে শান্তা মারিয়ার গাঁ শিহরে উঠলে। .................................................................................... . . . . . . . . . চলবে . . . . . . . . লেখা: #Asad_Rahman

কোন মন্তব্য নেই

diane555 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.