Recents in Beach

ঝিনাইদহ শহরের ইতিকথা Story of Jhenaidah Town

ঝিনাইদহ শহরের ইতিকথা Story of Jhenaidah Town পোস্ট অফিসের সামনে বাঁকটিকে কেন্দ্র করেই কড়াই গাছতলায় গড়ে উঠে দোকান-পাট। দোকান-পাট গড়ে উঠার ফলে ঝিনাইদহ শহর আস্তে আস্তে প্রসারিত হয়ে আজকের জেলা শহরে পরিণত। এইটি মূল শহরের প্রাণকেন্দ্র। পোস্ট অফিসের পিছনে এবং সামনে বড় দু’টি পুকুর থাকায় চুয়াডাঙ্গা-মাগুরা ও যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের মিলন কেন্দ্রে এক বাঁকের সৃষ্টি হয়। বাস লাইন চালু হলে যশোরগামী বাস দাঁড়াতো বর্তমান ‘বাঁটার’ দোকানের সন্নিকটে, মাগুরাগামী বাস দাঁড়াতো বর্তমান সুইট হোটেলের সামনে অর্থাৎ জামে মসজিদের পার্শ্বে, আর চুয়াডাঙ্গাগামী বাস দাঁড়াতো ট্রাফিক আইল্যান্ডের পার্শ্বে। এক সময় এই স্থানগুলি বাস স্ট্যান্ডে পরিণত হয়। ফলে অত্র এলাকা জমজমাট হয়ে উঠার সুবিধা লাভ করে। বৃটিশ আমলে ঝিনাইদহ শহর পূর্বের ফৌজদারী ও দেওয়ানী আদালত প্রাঙ্গন থেকে পুরাতন হাটখোলা পর্যন্ত জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ঝিনাইদহ ছাড়াও নবগঙ্গাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশখালী বাজার, মধুপুর বাজার ও হাটগোপালপুর বাজার। বর্তমানে সুইট হোটেলের সামনে এক সময় ঘোড়ার গাড়ীর স্ট্যান্ড ছিল। অবসরে ঘোড়ার গাড়ীর সহিসরা চুল, দাড়ি ছাটতো বলে এ জায়গায় অর্থাৎ বর্তমান সুইট হোটেল থেকে বাটার দোকান পর্যন্ত সেলুন গড়ে উঠে। আর এ কারণে ঝিনাইদহ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অর্থাৎ মুখ্যস্থানে এত বেশী সেলুন গড়ে উঠেছিল। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সেলুন থাকায়- ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পাকিস্তান অবজারভারে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল ‘ঝেনিদা ই এ টাউন অব সেলুন’। কোটওয়ান এবং ক্ষৌরকারদের (নাপিত) জন্য তখন পোস্ট অফিসের দক্ষিণ পার্শ্বে পুকুরপাড়ে গড়ে কয়েকটি চায়ের দোকান গড়ে উঠে। একদিকে চায়ের দোকান অন্যদিকে সেলুন অর্থাৎ পোস্ট অফিসের পিছনে অবস্থিত পুকুর পাড়ে চায়ের দোকান আর সামনের পুকুরপাড়ে চুল ছাটার দোকান। এই ছিল তৎকালে ঝিনাইদহ শহরের চেহারা। ১৯৪৭ সালের পরে ভারতের হুগলী জেলার কিছু লোক এসে সেলুনগুলির মাঝে মাঝে মনোহারী দোকান শুরু করে। সেলুনগুলি সামনে যে প্রথম চায়ের দোকান করে সে ছিল একজন বুনো সর্দার। তৎকালীন অত্র এলাকার একমাত্র সাংবাদিক শেখ হাবিবুর রহমান কর্তৃক দৈনিক আজাদে প্রেরিত সংবাদ হতে দেখা যায় যে, ১৯৬২ সালের ২০ জুন ঝিনাইদহের টেলিফোন এক্সচেঞ্জের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক জনাব কে. এম. রব্বানী। ছায়াবানী সিনেমা হল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর (বর্তমানে ছবিঘর) নতুন করে শুরু হলে এর উদ্বোধন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬২ সালের ১০ জুন তারিখে। এ সালের ৩০ জুলাই ইউনাইটেড ব্যাংকের (বর্তমান জনতা ব্যাংক) ঝিনাইদহ শাখার উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ত, সেচ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রী জনাব বি. এ. মজুমদার। কে. সি কলেজের ছাত্র সংসদের কমিটি গঠন করা হয় এ সালের অক্টোবরের দিকে। থিয়েটার হলে এক সভায় সংসদে লতাফত হোসেন জোয়ার্দার সভাপতি ও মোহাম্মদ আলী আকবর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওয়াপদা প্রধান জনাব ডিকে পাওয়ারের উপস্থিতিতে যশোহরের ডেপুটি কমিশনার ঝিনাইদহ শহরে বিজলী বাতির উদ্বোধন করেন। এ সালের ৯ জানুয়ারী খুলনা বিভাগের এ্যাডুকেশন অফিসার জনাব জহির উদ্দিন আহমেদ তৎকালীন পাকিস্তান ন্যাশনাল ব্যাংকের (বর্তমানে সোনালী ব্যাংক) ঝিনাইদহ শাখার উদ্বোধন করেন। ১৯৬৬ সালের দিকে শিশু পার্কের পার্শ্ববর্তী নারী সমাজ কল্যাণ সমিতির অফিস গৃহের দ্বারোদঘাটন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন জাতীয় পরিষদের সদস্যা বেগম আয়শা সরদার। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝিনাইদহ সৃষ্টি হয় অনেক ইতিহাস। ব্যক্তি, জায়গা, স্থান, প্রতিষ্ঠান সর্বক্ষেত্রে পরিবর্তন সূচিত হয় নতুন দেশ গড়ার তাগিদে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায়। ঝিনাইদহ শহরে প্রথম যে প্রেসটিতে ছাপানোর কাজ শুরু করে তার নাম সিদ্ধেশ্বর প্রেস। ১৯৫৩ সালের দিকে ঝিনাইদহ শহরে প্রথম শুরু হয় রিক্সা চলাচলের। প্রথমদিকে সাইকেল ও রিক্সা মেরামতের জন্য গড়ে উঠেছিল অমর মাস্টার, মণিমিত্র, সুধীর ও নজীর মিয়ার সাইকেলের দোকান। প্রথম যে মিউনিসিপ্যালিটির লাইট পোস্টে আলো জ্বালাতো তার নাম নিরাপদ দাস। সে আমলে কবিরাজদের কদর ছিল। আর কবিরাজির সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন ও কবিরাজি যারা করতেন তারা হলেন ঋষিকেশ মুখার্জী, নৃপেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (ভোলা সেন) ও আব্দুর রউফ। ঝিনাইদহ শহরে সে আমলে বাঘা ডাক্তার বলে একজন ডাক্তার ছিলেন। অনেক সামাজিক কাজের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। মুসলমান ডাক্তারদের মধ্যে প্রথম সরকারী ডাক্তার ছিলেন ক্যাপটেন আব্দুস সামাদ ও বেসরকারী ডাক্তার ছিলেন ডাঃ কে আহমেদ। এ অঞ্চল থেকে ঢাকার দৈনিক পত্রিকায় প্রথম সাংবাদিকতা শুরু করেন শেখ হাবিবুর রহমান। ১ এপ্রিল ১৯৫৮ সালে ঝিনাইদহ মিউনিসিপ্যালটিতে ঝিনাইদহ শহরের রাস্তার নামকরণ বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় চেয়ারম্যান ছিলেন ডাঃ কে আহমেদ। সভায় জাতীয় নেতা, স্মরণীয় ব্যক্তিদের সাথে ঝিনাইদহের কৃতি সন্তানদের নামেও ঝিনাইদহের অনেকগুলির রাস্তার নামকরণ করা হয়। যেমন বাঘা যতীন রোড, কে পি বসু রোড, পাগলা কানাই রোড ইত্যাদি। স্বাধীনতার পর অর্থাৎ জনাব ইউনুচ আলী যখন মহকুমা প্রশাসক ছিলেন তখন আবার রাস্তার নামকরণ নিয়ে আর একটি সভা হয় এবং এ সভায় বিভিন্ন কবি সাহিত্যিক ও নামকরা গ্রন্থের নামে রাস্তার নামকরণ করা হয়। যেমন অগ্নিবীনা সড়ক, গীতাঞ্জলী সড়ক ইত্যাদি। ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগানে এক সময়ে বুনো সর্দারদের বসবাস ছিল। নদীর পাড় ঘেঁষে এরা এখানে প্রচুর কলাগাছ লাগাতো। অনেকে বলেন জমিদারী আমলে হাতীর খোরাক হিসেবে এ জায়গায় কলাগাছের চাষ হতো। সেই থেকে এ জায়গার নামকরণ কাবাগান হয়ে যায়। ব্যবসা, দোকানদারী, ফড়িয়া, ব্যাপারী তেজারতি ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বসবাস করতেন যে জায়গায় সেই থেকে জায়গাটি ব্যাপারীপাড়া হিসেবে অভিহিত হয়ে আসছে। ব্যাপারী পাড়া ঝিনাইদহ শহরের মধ্যে অন্যতম জনবহুল এলাকা। এখানে যারা বাস করেন তাদের অধিকাংশই দফাদার এবং এরা ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে জড়িত। অনেক ধনী ব্যক্তি এখানে বসবাস করতেন এবং এখনও করেন। পুরাতন আমলের পাকা বাড়ী-ঘর ব্যাপারী পাড়ায় এখনও বিদ্যমান। নীলকর সাহেবদের পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার করার জন্য ধোপারা নদীর ধারে বসবাস করতো। এলাকাটি ধোপাঘাটা নামে বিশেষভাবে পরিচিত। পেয়াদাপাড়ার নামকরণের কারণ অনুসন্ধানে জানা যায় যে, বৃটিশ আমলে এ জায়গার বেশ কয়েকজন অফিস-আদালতে পিত্তন-চাপরাশির কাজ করতো। তাদের চাকরীর বৈশিষ্ট্যের উপরই জায়গার নাম হয় পেয়াদাপাড়া। আবাপুরের উকিলপাড়া ও আদর্শপাড়ার নামকরণও এভাবে হয়েছে। এ জায়গা এক সময় ধানের মাঠ ছিল। লোকজন জমি-জমা ক্রয় করে বাড়ীঘর তৈরী করায় এলাকাটি জনবসতি হিসেবে গড়ে উঠেছে এবং নামকরণ করেছে আদর্শপাড়া। ষাটবেড়ে গ্রামে এক সময়ে মাত্র ৬ ঘর চর্মকার (মুচি) ছিল। এখন এদের সংখ্যা ১২/১৩ হাজারের মত। ষাটবেড়ে ছাড়াও ছোটভাদরা, বড়ভাদরা, কেষ্টনগর ও হামদহে মুচি শ্রেণীর লোকের বসবাস আছে। পবহাটি গ্রামের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, গ্রামটি তিন দিকে নদী বেষ্টিত। অনেকের ধারণা যে, এ এলাকা এক সময় নবগঙ্গা নদীর মধ্যে ছিল। আস্তে আস্তে বা কালের চক্রে মাটি ভরাট হয়ে জনবসতি গড়ে উঠেছে। পবহাটিকে তাই ছোটখাট একটি দ্বীপ বলা যায়। আরাপপুর ও হামদহে আছে কাপড় তৈরীর কারিগর শ্রেণীর লোক। এছাড়া কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানেও সূতা দ্বারা দেশীয় পদ্ধতিতে কাপড় তৈরী হয়ে থাকে। অত্র এলাকার সবচেয়ে পুরাতন মসজিদটি ভুটিয়ারগাতী গ্রামে অবস্থিত। আনুমানিক ১৬৫০ খৃষ্টাব্দের দিকে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। এ এলাকায় আর কোন মসজিদ না থাকায় দূর দূরান্ত হতে মুসল্লীরা আসতেন এই মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করতে। ঝিনাইদহ জামে মসজিদটিও যথেষ্ট পুরাতন। এই মসজিদের ইমাম আলহাজ্ব হাতেম আলী জানান, তিনি ১৯৪৬ হতে এই মসজিদে ইমামতি করছেন। তাঁর অভিমত অনুযায়ী জানা যায় ঐ সময় হতে প্রায় একশত বছর পূর্বে এই মসজিদটির গোড়াপত্তন হয়। প্রথম অবস্থায় দুই কাতার নামাজ পড়ার মত অবস্থা থেকে সম্প্রসারিত হতে হতে মসজিদটি বর্তমান অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। ঝিনাইদহ শহরের অনতিদূরে ডাক বাংলা একটি প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক এলাকা। এই এলাকার পাশেই আছে একটি ইনেসপেকশন বাংলো। এই বাংলোর জন্যই জায়গাটির নামকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডাকবাংলো বাজার। ১৯৪৭ সালের দিকে হিন্দু শিক্ষকদের দেশ ত্যাগের ফলে তৎকালীন নারী শিক্ষার একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বালিকা বিদ্যালয়টি (তখন প্রাইমারী থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত ছিল) অচল হয়ে পড়ে। এ সময়ে নলডাঙ্গার রাজাদের সাথে সংশ্লিষ্ট জনৈক বানু বাবু স্কুলটির অচলাবস্থা মোচনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষক যোগাড় করে স্কুলটি চালু রাখার চেষ্টা করতেন। তৎকালীন স্থানীয় একমাত্র কলেজ পড়ুয়া মহিলা মনোয়ারা খাতুন ও তৎকালীন মহকুমা সেকেন্ড অফিসার জনাব ইকরামুল হকের স্ত্রীর সহযোগিতা পান। শান্তি সুধা রায় ও বিমলা বালা নামে আরো দুইজন মহিলা স্কুলটি রক্ষার জন্য শিক্ষকতায় যোগ দেন। কঠোর পর্দা মেনে মুসলিম ছাত্রীরা তখন একে একে আসতে শুরু করে। বোরখা পরা ছাড়াও ঘোড়ার গাড়ীর দুই দিকে পর্দা দিয়ে অনেক ছাত্রী স্কুল আসতো। এই স্কুলটিই এখন সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। তখন এটি কে. সি কলেজের পিছনে ছিল। পরে স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমান জায়গায় এসেছে। ঝিনাইদহ অঞ্চল ছিল এক সময় ম্যালেরিয়ার ডিপো। যত্রতত্র ঝোপজাড় ও বনাঞ্চল থাকায় মশার প্রাদুর্ভাব ছিল অত্যন্ত বেশী ছিলো। ১৮৮১ সালে কোটচাঁদপুরে প্রতি মাইলে ম্যালেরিয়া জ্বরে মৃত্যুর হার ছিল ২৮.২১ ভাগ। ঐ সময় ঝিনাইদহ ম্যালেরিয়া জ্বরে মৃত্যুর হার ছিল ৩১ ভাগ। ম্যালেরিয়ার জন্য জনসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। ১৮৯১ সালে ঝিনাইদহের লোকসংখ্যা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৩,১১,৯৭৩ জনে। তথ্য সূত্র: যশোর গেজেটিয়ার