বিলুপ্ত নগরী বারোবাজার Barobazar the Extinct City

বিলুপ্ত নগরী বারোবাজার Barobazar the Extinct City কত কালের কত মানুষের ইতিহাস বুকে ধারণ করে আছে এই বারোবাজার। একদা এখানে গড়ে উঠেছিল একটি সুন্দর জনবহুল জনপদ। কালের বিবর্তনে আজ তার কোন চিহ্ন নেই। এখানে ওখানে আজ কেবল দেখা যায় প্রাচীন ইটের ভগ্নস্তুপ। মাটির তলদেশে নরকঙ্কালের ছড়াছড়ি আর প্রাচীন কয়েকটি দীঘি। মহাকালের গর্ভে সবই বিলীন হয়ে গেছে। শুধু সাক্ষী হিসাবে বেঁচে আছে সেকালের কীর্তিরাজী। যশোর শহর বর্তমানে যে পিচঢালা রাজপথ সোজা চলে গেছে ঝিনাইদহের দিকে, এই পথের সাথে বারোবাজার নাম ধারণ করে আজও একটি গ্রাম্যবাজার পথিক জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রুগ্ন বয়োবৃদ্ধ মানুষের শ্রীহীন উৎকট চেহারা নিয়ে আজকের বারোবাজার প্রাচীন কালের কাহিনী স্মরণ করিয়ে দেয়। বারোটি বাজার নিয়ে প্রসিদ্ধ ছিল প্রাচীন বারোবাজার। এই শহরের পরিধি ছিল দশ বর্গমাইল। খোসালপুর, পিরোজপুর, বাদুড়গাছা, সাদেকপুর, ইনায়েতপুর, মুরাদগড়, রহমতপুর, মোল্লাডাঙ্গা, বাদেডিহি, দৌলতপুর, সাতগাছি প্রভৃতি গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছিল। শহরের দক্ষিণ বাহু স্পর্শ করে কুলু কুলু নাদে বয়ে যেত সেকালের বিশাল ভয়ঙ্করী ভৈরব নদ। এই নদ বেয়ে দেশ-বিদেশ থেকে পণ্য সম্ভার বয়ে আনতো সওদাগরী বহর। হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলমানেরা তিলে তিলে সুন্দর সুষমাময় করে গড়ে তুলেছিল এই নগরটিকে। অপূর্ব শ্রীবৃদ্ধি লাভ করেছিল বারোবাজার। শহরের বিভিন্ন স্থানে জলাশয় ছিল। সেসব জলাশয় আজো আজো দৃষ্টিগোচর হয়। প্রত্যেকটি জলাশয়ে পাশ ঘাট ছিল। এই নগর কে বা কারা প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা’ জানা যায় না। এটা যে প্রাচীন কালের হিন্দু ও বৌদ্ধ নরপতিদের রাজধানী ছিল, তা’ সহজেই অনুমেয়। খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে গঙ্গারিডি রাজ্যের উল্লেখ্য পাওয়া যায়। এই গঙ্গারিডি বা গঙ্গা রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল বারোবাজার। তখন এই বারোবাজারের নাম ছিল গঙ্গে বা গঙ্গারোজিয়া। পাক-ভারতের মধ্যে একটি প্রাচীন বাণিজ্য বন্দর হিসাবে এর নাম সুবিদিত ছিল। ‘পেরুপ্লাস অব দ্য এরিথিয়ান সি’ নামক একটি গ্রীক ইতিহাসে দেখা যায়, এই গঙ্গে বন্দর থেকে প্রবাল, উৎকৃষ্ট মসলিন প্রভৃতি দ্রব্যাদি বিদেশে নিয়ে যাওয়া হতো। কবি ভার্জিলের ‘জার্জিকাশ’ নামক কাব্য গ্রন্থে লিখিত আছে, কবি তার জন্মভূমি মন্টুয়া নগরীতে ফিরে গিয়ে গঙ্গারিডিদের শৌর্য-বীর্যের খোদিত করে রাখবেন। বুদ্ধদেবের আমলে এই গঙ্গারিডি থেকে বিজয় সিংহ তাম্রপর্র্ণী দ্বীপে পদার্পণ করে সিংহল পরাক্রমশালী ছিল, তা’ মেগাস্থিনিসের বিবরণে লিপিবদ্ধ আছে। মেগাস্থিনিস বলেছেন, “গঙ্গারিডিদিগের হস্তি সৈন্যের ভয়ে অন্য রাজ্েযর রাজন্যরা তাদের আক্রমণ করিতো না। স্বয়ং দ্বিগ্ধিজয়ী আলেকজাণ্ডার গঙ্গাতীরে উপনতি হইয়া গঙ্গারিডিদের প্রতাপের কথা শুনিয়া সেখান হইতে প্রস্থান করেন।” মুসলমান আমলে এই নগরটি আরো শ্রীবৃদ্ধি লাভ করেছিল। এখানে সুরম্য মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন মুসলমান পীর-দরবেশরা। সে সব স্মৃতি বহন করছে আজো কয়েকটি দীঘি ও মসজিদ। খোন্দকারের দীঘি ও পাঁচপীরের দীঘি মুসলমান পীর-দরবেশদের কীর্তি ঘোষণা করছে। এই মসজিদগুলি আস্তে আস্তে মৃত্তিকা গর্ভে বিলনি হতে চলেছিল, ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা তা’ উদ্ধার করে পুনরায় তাদের প্রার্থনালয়ে পরিণত করেছে। বারোবাজারে প্রথমে কোন মুসলমান পীর-দরবেশ ধর্ম প্রচারে পদার্পণ করেছিলেন, ইতিহাসে তার কোন পরিচয় নেই। ইতিহাস এখানে নীরব হয়ে আছে। লোকমুখে এবং অনৈতিহাসিক পুঁথির মারফত আমরা যতটুকু জানতে পারি, তাতে গাজী-কালু ও উলুম খান জাহান আলীর নাম বিশেষভাবে প্রচারিত। এই সকল পুঁথি এবং লোককথা শ্রবণ করে পরবর্তীকালে অনেকেই ইতিহাস রচনা করেছেন। গাজী ও কালু ধর্ম প্রচারার্থে প্রথমে এসে আশ্রয় নেন সুন্দরবনে। সেখানে খোদার আরাধনায় সাতটি বছর অতিবাহিত করার পর আবার অজানা পথের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলেন। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে যে জনপদে গিয়ে আশ্রয় নিলেন, তার নাম ছাপাই নগর। ছাপাই নগরের রাজা তখন ছিলেন শ্রীরাম। গাজী ও কালু দুজনে নগরের মধ্যে প্রবেশ করলেন। বেলা তখন দ্বিপ্রহন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়লেন গাজী ও কালু। তাদের দেহ ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়ছিল। লোকমুখে তারা রাজার অনেক দান-খয়রাতের কাহিনী শুনেছিল। রাজার দয়ার্দ্র মনের কথা শুনে তারা আশ্বস্ত হলেন। অবশেষে রাজার দরবারে যাওয়া স্থির করলেন। যথাসময়ে দরবার গৃহের সম্মুখে উপস্থিত হলেন দুজনে। কণ্ঠে তাদের ইসলামের তৌহিদ বাণী। রাজা শ্রীরাম মুসলমান ফকিরের আগমনবার্তা শুনে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে কোতওয়াল ডেকে গর্দান ধরে নগরের বাইরে বের করে দিলেন। রাজার কাছ থেকে লাঞ্ছিত অপমানিত হয়ে গাজী ও কালু নিরাশ হয়ে পড়লেন। নগরের কেউ তাদের অন্ন দিলো না। ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর হয়ে নগরের সন্নিকটে একটি জঙ্গলের মধ্যে তারা আশ্রয় নিলেন। ক্ষুৎ-পিপাসায় তারা এমনি পীড়িত হয়ে পড়লেন যে, তাদের চোখ বেয়ে দর দর করে অশ্র“ গড়িয়ে পড়তে লাগলো। দুজনে অপার-করুণাময়ের দরবারে রাজার বিরুদ্ধে ফরিয়াদ জানালেন। দৈবক্রমে শ্রীরাম রাজার বাড়িতে আগুন লেগে গেল। আস্তে আস্তে সে আগুন ছড়িয়ে পড়লো নগরের চারদিকে। রাজপ্রাসাদ থেকে রাণী অপহৃত হলেন। চারদিকে প্রলয় কাণ্ড। পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে সমস্ত জনপদ। রাজা প্রাসাদে এসে রাণীকে না দেখতে পেয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসলেন। প্রাসাদের এক একটি কক্ষ তখন আগুনের গ্রাসে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। রাজা জ্যোতিষ তলব করলেন। রাজা আজ্ঞা পেয়ে ছুটে এলো জ্যোতিষীরা। গণনা করে তারা আগুন ধরবার সমস্ত রহস্য খুলে বললো। মুসলমান দুই ফকিরের কাজ এসব। এমন মহা বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে হলে তাদের শরণ নিতে হবে। চারিদিক থেকে তখন খোঁজ খোঁজ রব পড়ে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সংবাদ পেলেন নগরের বাইরে একটি জঙ্গলের মধ্যে মুসলমান ফকির দুজন আস্তানা গেড়েছে। রাজা পারিষদসহ তাদের কাছে গিয়ে ক্ষমা ভিক্ষা চাইলেন। আগুন লেগে ধ্বংস হতে চলেছে। রাজ মহিষীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। “কহনে শ্রীরাম রাজা জোড় করি কর, আগুন জ্বরিয়া পুরি হৈয়া গেল ছাই, কোথায় গেলেন রাণী খুঁজিয়া না পাই।” রাজার বিপদের কথা শুনে গাজী তাকে মুসলমান হবার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। রাজা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলেন। গাজী তখন তিনবার আল্লাহর নামে ধূলোয় ফুঁক দিয়ে ছাপাই নগরের দিকে ছুঁড়ে দিলেন। দেখতে দেখতে নগরের সমস্ত আগুন নিভে গেল। অপহৃতা রাণীকে রাজা খুঁজে পেলেন। যে ছাপাই নগরে বিষাদের ছায়া নেমে করুণ কণ্ঠে আকাশ বাতাস ভরে তুলছিল, দেখতে দেখতে সেখানে আবার আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করলো। রাজা মহা সমারোহে গাজী ও কালুকে রাজধানীতে নিয়ে গেলেন। তাদের নামে প্রতিষ্ঠা করে দিলেন সুন্দর মসজিদ। নিজের হাতে পরিচর্যা করতে লাগলেন গাজী ও কালুর। “বসিলেন গাজী কালু পালঙ্কের উপর। নিজ হাতে রাজা আসি দুলায় চামর॥” আজ শ্রীরাম রাজ প্রাসাদ মৃত্তিকার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। রাজপ্রাসাদের চতুর্দিক গড় বেষ্টিত ছিল। সে গড় আজও দেখা যায়। গড়ের মধ্যে সম্বৎসর পানিতে ভরপুর থাকে। এই গড়ের নিকটবর্র্তী একস্থানে বহুকাল আগের একটি বটগাছ ছিল। এই গাছটি বর্তমানে নাই। পূর্বে এই গড়খাই খুব বিস্তৃত ছিল। এতো গভীর এবং দুর্গম ছিল যে, এপার হতে স্তুপের কাছে যাওয়া যেত না। বাঁশের ঘন ঝোপে ও বন্য অরণ্যে শ্বাপদ সঙ্কুল হয়ে পড়েছিল স্থানটি। (মতান্তরে জানা যায়, ছাপাই নগরের শ্রীরাম রাজার বিরুদ্ধে গাজী যুদ্ধ করেন। যুদ্ধে রাজা সপরিবারে নিহত হন। কথিত আছে, রাজার একমাত্র নাবালক পুত্র অজিত নারায়ণ কোন এক দাসীর কৌশলে রক্ষা পান। তারই পুত্র রাজা কমল নারায়ণ রায় বোধখানায় বসতি স্থাপন করেন এবং বিখ্যাত চৌধুরী বংশের তিনি আদি পুরুষ।) ইদানীং তা’ পরিষ্কার হয়ে গেছে। স্থানীয় লোকেরা বিশ্বাস করতো যে, এই পরিখা বেষ্টিত বাড়ির দক্ষিণ তীরে কোন এক বৃহস্পতিবারে গাজী প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন। কিছুকাল পূর্বে কয়েকটি পাকা কবর এখানে আবিষ্কৃত হয়েছে। লোকমুখে শোনা যায় এখানে নাকি গাজীর এবাদতখানা ছিল। গাজীর স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে হাসিলবাগ গ্রামের দক্ষিণে ভৈরব নদের তীরে এক বটগাছের তলায় গাজীর দরগাহ আছে। গাজী শ্রীরাম রাজা কর্তৃক অপমানিত হয়ে এখানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখানে শ্রীরাম রাজার একটি সুন্দর জলাশয় আছে। এই দীঘিটি উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ। জলাশয়ে শৈবালাদি নেই। সুউচ্চ পাহাড়। পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে প্রকাণ্ড বাঁধা ঘাটের ভগ্নাবশেষ দৃষ্টিগোচর হয়। এই ছাপাই নগর বারোবাজারের একাংশ। বর্তমান ছাপাই নগর বাদুর গাছা মৌজার অন্তর্ভূক্ত। বারোবাজারের দক্ষিণে মাসলেহাসিলবাগ নামক গ্রামে পীর বদরের নামে একটি হাট আছে। বারোবাজার থেকে যে রাস্তা যশোর পর্যন্ত এসেছে, তার পূর্ব নাম গাজীর জঙ্গল। হাসিলবাগে এসে শ্রীরাম তাঁতির উপর গাজীর শুভ দৃষ্টি পড়ে এবং তারই কৃপায় সে অগাধ ঐশ্বর্যের মালিক হয়। এখানে তিনি জামাল গোদা নামক এক ব্যক্তির গোদ আরোগ্য করে দিয়েছিলেন। গাজীর প্রচেষ্টায় বারোবাজারে বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বারোবাজারে। এখান থেকেই তারা ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছিলেন তদানীন্তন দক্ষিণ বাংলায়। তাদের স্মৃতি বুকে ধারণ করে আজও নীরব নিথর হয়ে আছে বারোবাজার। পুণ্যশ্লোক গাজী ও কালুর পর বারোবাজারের মাটিতে যাঁর পদধূলি পেয়ে ধন্য হয়েছে, তিনি হচ্ছেন ইসলামের অমর পতাকাবাহী মহাত্মা উলুঘ খান জাহান আলী। এই কামেল শ্রেষ্ঠ পীর খান জাহান আলী বারোবাজারে পদার্র্পণ করেছিলেন গাজী ও কালুর চল্লিশ বছর করে। তিনি কোথা থেকে যে বারোবাজারে এসেছিলেন, তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেন না। প্রবাদ এই-হিন্দু-মুসলমান ঘটিত কোন গুরুতর বিবাদের মীমাংসার জন্যে তিনি সসৈন্যে বঙ্গে আসেন। গঙ্গা পার হয়ে নদীয়ার মধ্য দিয়ে ভৈরবের কূল দিয়ে তিনি প্রথমে উপনীত হন। সম্ভবতঃ তিনি নদীপথেই এসছিলেন। বারোবাজারে তিনি যে পথ দিয়ে উপনীত হয়েছিলেন, সে পথে কোন কীর্তি চিহ্ন তার নাই। তিনি যদি স্থলপথে আগমন করতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি পথে কীর্তি চিহ্ন প্রতিষ্ঠা করতেন। ঐতিহাসিকদিগের মতে তিনি জৈনপুর থেকে এদেশে এসেছিলেন। ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, তোগলক আমলে কয়েকজন খাজা জাহানের পরিচয়। একজন স্বীয় কার্যদক্ষতার বলে দিল্লীর সম্রাট মাহমুদ তোগলকের মন্ত্রিপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তোগলক-কুলতিলক দিল্লীশ্বর ফিরোজশাহ নবতিবর্ষ বয়সে প্রাণ ত্যাগ করলে (১৩৩৮) দিল্লীতে ভীষণ এক অরাজকতা দেখা দেয়। (গাজীর বিস্তারিত বিবরণ ‘গাজী-কালু-চম্পাবতী’ অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।) ফিরোজের নাবালক পুত্র মাহমুদ তোগলক যে সময়ে দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত, তৈমুরলঙ তখন দিল্লী লুণ্ঠন করলে দিল্লী শ্মশানে পরিণত হয়। এই সময়ে মাহমুদের এক উজির ছিলেন খাজা জাহান। খাজা জাহান ১৩৯৪ খৃষ্টাব্দে জৌনপুরে এক নতুন রাজ্য স্থাপন করেন। তিনি প্রবল প্রতাপে রাজ্য শাসন করেছিলেন। এই জন্য তার নাম হয় মালিক-উস-শর্ক। ঐতিহাসিক স্টুয়াট বলেনঃ The founder of the Jaunpur dynasty was the eunuch Khwaja-i-Jahan, Wizir of Sultan Mahmud II of Delhi. In A. H. 796 (A. D. 1394) he had been governor of the Eastern Procvinces of the Delhi Empire with title of Malik-us-Sharq (East). (Wright H. N. Catalogue of Coins, Vol. II, P-206; Elphinstonis History, Bk. VI, P-359; Stewart’s, History, P-110.) এই সময়ে বাংলাদেশে এক বিরাট অরাজকতা দেখা দিয়েছিল। কেহ কেহ বলেন, খান জাহান মোহাম্মদবিন তোগলকের মন্ত্রী ছিলেন; পরবর্তীকালে এগারোজন আওলিয়া ও ষাট হাজার সৈন্যসহ বাংলাদেশে আসেন। কথিত আছে, শবে কদরের রাত্রে তিনি ও বাদশাহ একত্রে এবাদত করেছিলেন। বাদশাহ এবাদত করতে গিয়ে নিদ্রায় ঢলে পড়েন। খান জাহান আলী একান্ত চিত্তে ঐশী শক্তি প্রাপ্ত হন। এসব ঘটনা ইতিহাস বিবর্জিত। কেননা তার সমাধি ফলকে যে মৃত্যুর তারিখ লিপিবদ্ধ আছে, তাতে দেখা যায়, সনের দিক থেকে তিনি মোহাম্মদ বিন তোগলকের সমসাময়িক হতে পারেন না। ইতিহাসের পাতা থেকে আমরা জানতে পারি, তার বাংলাদেশে আগমন হয়েছিল, সম্রাট মোহাম্মদ বিন তোগলকের অনেক পরে। ১৩২৫ খৃষ্টাব্দে মোহাম্মদ বিন তোগলক সিংহাসনে আরোহণ করেন। মৃত্যুমুখে পতিত হন ১৩৫১ খৃষ্টাব্দের ২০ শে মাচ। তার মন্ত্রিদের মধ্যে একজন ছিলেন খাজা জাহান। তিনি সম্রাট ফিরোজ তোগলকের রাজত্বের প্রথম দিকে মৃত্যুবরণ করেন। বাগেরহাটের খান জাহানের সমাধি লিপিতে দেখা যায় ‘উলুঘ খানে আযম খান জাহান’ লেখা আছে। তার মৃত্যু হয় ৮৬৩ হিজরীতে, ইংরেজী ১৪৫৯ সালে। এই হিসাবে সাল তারিখ নির্ণয় করলে মোহাম্মদ বিন তোগলকের তিনি সমসাময়িক হতে পারেন না। অনেক ঐতিহাসিক এই মহাত্মার সম্বন্ধে অনেক অলৌকিক গল্প বর্ণনা করে গেছেন। খুলনা গেজেরটির প্রণেদা মিঃ ওমালী বলেছেন, তিনি সম্রাট আকবরের সভাসদ ছিলেন। সম্রাট আকবর সিংহাসনে উপবেশন করেন ১৫৫৬ খৃষ্টাব্দে। এর বহু পূর্বে খান জাহানের মৃত্যু হয়েছে। জৈনপুরে যে খাজা জাহানের পরিচয় আমরা পেয়ে থাকি তিনি ১৩৯৯ খৃষ্টাব্দে জৌনপুরে মৃত্যুবরণ করেন। তার উপাধি ছিল আতাবেক-ই-আযম। বদাউনী ও অন্যান্য ঐতিহাসিকরা তার মৃত্যুর কাহিনী লিখে গেছেন। Advanced History of India তে তার সমর্থন পাওয়া যায়। জৈনপুরে তার সমাধি আছে। অধ্যাপক সতীশ চন্দ্র মিত্র তার ‘যশোর-খুলনার ইতিহাস'-এ লিখেছেন, “যশোহর খুলনার খাঞ্জালি পীর বা খাঁ জাহান আলী এবং জৈনপুর রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা খাজা জাহান অভিন্ন ব্যক্তি বলিয়া আমরা মনে করি। প্রথমতঃ সাধারণ প্রবাদে বলিয়া আসিতেছে, তিনি দিল্লীর মাহমুদ শাহের সময় জায়গীর পাইয়া বঙ্গে আসেন; কার্যতঃ দেখা যাইতেছে, দিল্লীশ্বও মাহমুদ (তোগলক) শর্কী রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা এবং তাহার আমলেই খাঁ জাহান উক্ত শর্কী বা পূর্ব দেশীয় রাজ্যের অধিপতি হন ও বঙ্গে আসেন। জৈনপুরের খাজা জাহানের সমাধি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও যশোর-খুলনার খান জাহানের সংগে তার সমসাময়িকতার সাযুজ্য স্পষ্ট। এখানেই অধিকাংশ ঐতিহাসিকেরা প্রকৃদ অবস্থাটা রহস্যময় করে তুলেছেন। সমসাময়িক ইতিহাসে আমরা তোগলক আমলে আরো কয়েকজন খান জাহান আলীর পরিচয় পেয়ে থাকি। প্রথম জনের নাম খান জাহান মালিক কাবুল। তিনি ছিলেন সম্রাট ফিরোজ তোগলকের মন্ত্রী। এই সময় গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস সম্রাট ফিরোজ তোগলক গৌড়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা কালে খান জাহান মালিক কাবুলকে দিল্লী নগরীর ভর অর্পণ করে যান। ১৩৭০ খৃষ্টাব্দে তার মৃত্যু হয়। তদপুত্র জোনা শাহ পিতার স্থলাভিষিক্ত অপরাধে নিহত হন। সম্ভবতঃ মনে হয়, দ্বিতীয় খান জাহানের হত্যার পর তার বংশীয়গণকে দিল্লী হতে বিতাড়িত করে দেওয়া হয় কিংবা তারা নিজেরাই দিল্লী হতে পলায়নপূর্বক এখানে এসে আশ্রয় নেন। আমাদের ধারণা দ্বিতীয় খান জাহান আলী নিহত হবার পর তার কোন পুত্র খান জাহান উপাধীধারী জৈনপুরে এসে উপস্থিত হন। সেখান থেকে বাংলায় আগমন করে গৌড় সুলতানের কৃপার পাত্র হয়ে যশোর অঞ্চলে শাসনকাযের জন্য সনদপ্রাপ্ত হন। কারণ, দিল্লীর শাহজাদা মোহাম্মদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার দরুন দ্বিতীয় খান জাহানের মস্তক কর্তন করে ঝুলিয়ে রাখা হয়য়। এহেন নৃশংস হত্যার প্রতিশোধের দরুন তার রক্ত উদ্ভূত কোন খান জাহানের জৈনপুরে আসা অস্বাভাবিক নয়। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ কে না নিতে চায়? (The city of Jaunpur was founded dy Firoz of thi house of Tughluq to perpertuate the memory his cousin and parton, Muhammad Jauna. We have noticed before how, during the period of confusion following the invansion of Taimur, Khawja Jahan threw off his allegiance to the Delhi Sultanate and founded a dynasty of independent rulers at Jaunpur, known as the Sharqi dynasty after his title, ‘Malik-us-Sharq’. He died in 1399, leaving his throne to his adopted son, Malik Qaranful, who assumed the title of Mubarak Shah Sarqi. (Disintegration of the Delhi Sultanate, An Advanced History of India, P-347) বাবু গৌরদাস বসাক বলেছেন, “খান জাহান দিল্লীর দরবার হইতে বহিষ্কৃত হইয়াছিলেন। পরে তাহাকে তহশীলদার বা রাজস্ব বিভাগের শাসক করিয়া বাগেরহাটে প্রেরণ করা হয়।” এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, যে ব্যক্তিকে বহিষ্কার করে দেওয়া হলো, তাকে আবার কেমন করে রাজস্ব বিভাগের শাসক করা যেতে পারে? গৌরদাস বাবু দিল্লীশ্বরের সংগে তাদের পারিবারিক গোলযোগের কথা বোধ হয় চিন্তা করেন নাই। যা’ হোক, তিনি যে ফিরোজ শাহের মন্ত্রী খান জাহানের বংশধর ছিলেন, তা অস্বীকার করা যায় না। এই খান জাহান ছিলেন একজন কামেল পুরুষ। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন মহাপ্রাণ শাসক, তেমনি ছিলেন অসাধারণ উচ্চ মনের অধিকারী। তিনি যখন যশোর অঞ্চলে আসেন, তখন গৌড়ের সুলতান ছিলেন নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহ। বাংলাদেশে এই সময় দিল্লীর অধীনতা স্বীকার করে নাই। গৌড় সুলতান তাকে “খানে আযম” উপাধিতে ভূষিত করেন। বাংলাদেশে বৌদ্ধ, হিন্দু ও পাঠান আমলে বারোবাজার একটি উল্লেখ্যযোগ্য স্থান ছিল। এই জন্যে গড়ে তোলেন একটি সুরম্য মসজিদ। এই সাবেক আমলের মসজিদটি এখনো তার পরিচয় বহন করছে। মসজিদটি ছিল এক গম্বুজ বিশিষ্ট। এই ধরনের মসজিদ বারোবাজার হতে বাগেরহাটের পথে তিনি বেশ কয়েকটি নির্মাণ করেছিলেন। বারোবাজারে মসজিদ ব্যতীত তার নামে কোন কীর্তি এখন আর নেই। এই মসজিদের দেয়াল সাড়ে চার ফুট চওড়া। এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। মসজিদের উপরে একটি বড় আকারের ছিদ্র সৃষ্টি হয়ে গেছে। খান জাহান আলী এখানে কোন শাসনদণ্ড পরিচালনা করেননি। যখন তিনি এখানে অবস্থান করেছিলেন তখন তার প্রচেষ্টায় বিধর্মীরা চারদিকে ইসলাম ধর্মে মুগ্ধ হয়ে মুসলমান হতে থাকে। মুসলমানদের নামানুসারে গড়ে উঠে কয়েকটি গ্রাম। মুরাদ গড়, সাদিকপুর, হাসিলবাগ, এনায়েতপুর, রহমতপুর প্রভৃতি গ্রাম তার পরিচয় বহন করছে। পূর্বে এই গ্রামগুলি নগরের মহল্লা হিসাবে পরিগণিত ছিলো। বারোবাজারে খান জাহান আলীর কাছে অসংখ্য লোক মুরিদ হয়েছিল। যখন তিনি বারোবাজার পরিত্যাগ করে ভৈরবের তীর ধরে বাগেরহাটের দিকে যাত্রা শুরু করেন, তখন অসংখ্য ভক্ত তাকে অনুসরণ করে। বারোবাজার হতে তিনি যশোরের কয়েকটি স্থানে ধর্ম প্রচারার্থে নিজ শিষ্যদের প্রেরণ করেন- বাহরাম শাহ ও গরীব শাহ তাদের মধ্যে অন্যতম। এরা দুজনে মুরলীতে এসে ধর্র্ম প্রচার করতে থাকেন। কথিত আছে, বারোবাজার হতে যখন পীর খান জাহান আলী মুরলী অভিমুখ যাত্রা করেন, তখন অনুচরবর্গের খাদ্য প্রস্তুতের ভার দিয়েছিলেন এই শিষ্যকে। তারা যথাসময়ে খাদ্য প্রস্তুত করতে না পারায় পীর খান জাহান আলী পথিমধ্যে অপেক্ষা ও বিশ্রাম না করে নদীর কুল ধরে সামনের দিকে চলে যান। “খান জাহন মহামান বাদশা নফর। যশোরে সনন্দ লয়ে করিল সফর॥” প্রেসিডেন্সি বিভাগরে মনুমেন্টের তালিকায় এই প্রচরিত গল্পটি কৌতূহলী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাহরাম শাহ ও গরীব শাহ ছিলেন প্রকৃত সাধক। যশোরের মাটিতে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন এই দুজন ইসলামের পতাকা বাহক। কথিত আছে, এই বারোবাজারের নামকরণ পীর খান জাহান আলী প্রদত্ত। তার সংগে এগারো জন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন সাধক এসেছিলেন। এই এগারো জন সাধকের নাম যথাক্রমে গরীব শাহ, বাহরাম শাহ, বুড়া খাঁ, ফতে খাঁ, পীর খাঁ, মীর খাঁ, চাঁদ খাঁ, এক্তিয়ার খাঁ, বক্তার খাঁ, আলম খাঁ প্রভৃতি। খান জাহানের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান ধর্ম প্রচার ও রাজ্য প্রতিষ্ঠা। বারোবাজারে প্রাচীন আমলের অসংখ্য কীতি আজো মহাকালের শত আঘাত ও বিপর্যয়ের মধ্যে টিকে আছে। সাবেক আমলের প্রস্তর খণ্ড ছড়িয়ে আছে লুপ্ত নগরীর বুকের উপর। রাণীমাতার দীঘি, খোন্দকারের দীঘি, বিশ্বাসের দীঘি, গোড়ার পুকুর ও ভাইবোনের দীঘি প্রভৃতি নামে অনেক জলাশয় দেখা যায়। এখানে গাজীর নামে আজো পরিচিত হয়ে আছে গাজীর জাঙ্গাল। এই গাজীর জাঙ্গাল ব্রাক্ষণ নগর (লাউজানি) হতে উৎপত্তি হয়ে সোজা বারোবাজার এসে মিশেছিল। আজো লাউজানি হতে বারোবাজার পর্যন্ত গাজীর জঙ্গল সাবেকি চেহারা নিয়ে মাঠের বুকে ময়াল সাপের মতো শুয়ে আছে। বারোবাজারে খোন্দকারের দীঘির পাশে সে আমলে অস্ত্রাগার ছিল। বিভাগ পূর্ব যুগে মাটি খুড়ে পাওয়া গিয়েছিল কামানের নল। প্রাচীন যুগের এই বর্ধিষ্ণু শহরটি কিভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল, তার কোন ইতিহাস নেই। তবে এখানকার মাটিতে যে অজস্র নরকঙ্কাল মিশে আছে, তাতে সহজেই অনুমিত হয়, এই শহর ব্যাপকভাবে মহামারী দেখা দিয়েছিল, নতুবা, যুদ্ধের ভয়ঙ্কর অভিশাপ নিয়ে অজস্র ঘোড়ার ক্ষুরে পদদলিত করে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিল এই শহরটি কোনো দিগি¦জয়ী, তা কে জানে? বারোবাজার আজ “মৃতের নগরী।” এখানে দাঁড়ালে আজ শোনা যায় কেবল হু হু করা বাতাসে দীর্ঘশ্বাসের মতো শুধু অতীতের একটানা করুণ বিলাপ ধ্বনি! তথ্যসূত্র: যশোরাদ্য দেশ
diane555 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.