Recents in Beach

প্রাচীন বারোবাজার জনপদ Ancient Barobazar place

প্রাচীন বারোবাজার জনপদ Ancient Barobazar place বারোবাজার যে একটি অতি প্রাচীন স্থান তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কোন সময় নির্দেশক প্রমাণের অভাবে এ স্থানের সঠিক ইতিহাস নির্ধারণ করা কষ্টকর। স্যার ফানিংহাস এ স্থানের অনেক দক্ষিণে অবস্থিত মুরলীতে প্রাচীন সমতট রাজ্যের রাজধানী ছিল বলে অনুমান করেন। সতীশ বাবু ও আব্দুল জলিল এ মতের সমর্থক। “যশোরদ্য দেশ” নামক গ্রন্থে জনাব হোসেন উদ্দিন আরও অনেক ধাপ এগিয়ে এ স্থানকে গংগায়িত বা গংগা রাষ্ট্রের রাজধানী বলে মনে করেন। এ সমস্ত অভিমত সম্পূর্ণভাবে অনুমান ভিত্তিক এবং কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত নয় তা বলা বাহুল্য। খুব সম্ভব জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ শাহের আমলে এ স্থানে দরবেশ-শাসক উলুখ খান-ই জাহান খুব সম্ভব তাঁর সময়েই এস্থানে প্রথম মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেন। খান-ই-জাহান তাঁর সহচর ও সৈন্যবাহিনী নিয়ে বেশ কিছুদিন এখানে অবস্থান করেছিলেন বলে প্রবল জনপ্রবাদ আছে। তিনি খুব সম্ভব যুদ্ধ করে এ স্থান অধিকার করেছিলেন। ঐতিহাসিক স্থান প্রবন্ধে জনাব হোসেন উদ্দীন হোসেন বলেন, “বারোবাজারে প্রথমে কোন মুসলমান পীর দরবেশ ধর্মপ্রচারে পদার্পণ করেছিলেন, ইতিহাসে তার কোন পরিচয় নেই, ইতিহাস এখানে নীরব হয়ে আছে। লোকমুখে এবং অনৈতিহাসিক পুঁথি মারফত আমরা যতটুকু জানতে পারি তাতে গাজী কালু ও উলুখ খান জাহান আলীর নাম বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। এই সকল পুঁথি ও লোকগাঁথা শ্রবণ করে পরবর্তীকালে অনেকেই ইতিহাস রচনা করেছেন।” “বারোবাজারে প্রাচীন আমলের অসংখ্য কীর্তি আজও মহাকালের শত আঘাত বিপর্যয়ের মধ্যে টিকে আছে। সাবেক আমলের প্রসত্মর খন্ড ছড়িয়ে আছে লুপ্ত নগরীর বুকের উপর। এখানে গাজীর নামে পরিচিত হয়ে আছে গাজীর জাংগাল। এই গাজীর জাংগাল ব্রাক্ষ্মণগড় হতে উৎপত্তি হয়ে সোজা বারোবাজারে এসে মিশেছিল।” “প্রাচীন যুগের এই বর্ধিষ্ণু শহরটি কিভাবে ধবংসপ্রাপ্ত হয়েছিল তার কোন ইতিহাস নেই। তবে এখানকার মাটিতে যে অজস্র নরকংকাল মিশে আছে, তাতে সহজেই অনুমিত হয়, এই শহরে ব্যাপকভাবে মহামারী দেখা দিয়েছিল, নতুবা যুদ্ধের ভয়ংকর অভিশাপ নিয়ে অজস্র ঘোড়ার খুরে পদদলিত করে ভেংগে চুরমার করে দিয়েছিল এই শহরটি কোন দ্বিগ্বীজয়ী; তা-কে জানে? বারোবাজার আজ মৃতের নগরী।” কথিত আছে বারোবাজার নামকরণ পীর খান জাহান আলীর প্রদত্ত। তাঁর সংগে এগারো জন অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন সাধক এসেছিলেন। এই এগারোজন সাধকের নাম যথাক্রমে গরীব শাহ, বাহরাম শাহ, বুড়া খা, ফতে খা, পীর খা, মীর খা, চাঁদ খা, এক্তিয়ার খা, বক্তার খা, আলম খা প্রভৃতি। আবার জনশ্রুতির উপর ভিত্তি করে বলা হয়ে থাকে যে, খান-ই-জাহান বারোজন আউলিয়া নিয়ে এখানে প্রথমে এসেছিলেন এবং বারোজন আউলিয়া থেকে বারোবাজার নামকরণ হয়েছিল। এটি খুব সম্ভবতঃ একটি গল্প। খান-ই-জাহান ৩৬০ জন আউলিয়া ও ৬০,০০০ সৈন্য নিয়ে দক্ষিণ বংগে এসেছিলেন বলে লোকে বলে থাকে। হোসেন উদ্দিন হোসেনের বর্ণনা অনুসারে- “বারোটি বাজার নিয়ে প্রসিদ্ধ ছিল প্রাচীন বারোবাজার। এই শহরের পরিধি ছিল ১০ বর্গমাইল। খোসালপুর, পিরোজপুর, বাদুরগাছা, সাদেকপুর, ইনায়েতপুর, মুরাদপুর, রহমতপুর, মোলস্নাডাংগা, বাদেডিহি, দৌলতপুর, সাতগাছি প্রভৃতি গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছিল। মুসলমান আমলে হয়তো এখানে একটি বড় বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই বাজার থেকেই খুব সম্ভব বারোবাজার নাম হয়ে থাকবে। কেউ কেউ বলেন বারোজন আউলিয়ার নামানুসারে বারোবাজার নামকরণ হয়েছে। এ প্রসংগে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘যশোর জেলার ইতিহাস’ নামক গ্রন্থে যে বর্ণনা আছে তা নিম্নে দেওয়া হলো :- “ভৈরব নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত বারোবাজর একটি প্রাচীন স্থান। এস্থানে অসংখ্য প্রাচীন কীর্তির ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন আজও দেখা যায়। ‘যশোহর খুলনার ইতিহাস’ নামক গ্রন্থে বাবু সতীশ চন্দ্র মিত্র বলেন যে, বারোবাজারের ৩/৪ মাইল বিস্তৃত স্থান ইষ্টক স্তুপে পরিপূর্ণ। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ১৯৬৯ সালের একটি অপ্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, ৩/৪ মাইল এলাকা জুড়ে এখানে বহু কীর্তির ধ্বংসাবশেষের অস্তিত্ব ছিল।” এই শহরের পরিধি ছিল দশ বর্গমাইল। খ্রীষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে গংগায়িত রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই গংগায়িত বা গংগা রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল বারোবাজার। কতকালের কত মানুষের ইতিহাস বুকে ধারণ করে আছে এই বারোবাজার। একদা এখানে গড়ে উঠেছিল একটি সুন্দর জনবহুল জনপদ। কালের বিবর্তনে আজ তার কোন চিহ্ন নেই। এখানে ওখানে নরকংকালের ছড়াছড়ি, আর প্রাচীন কয়েকটি দীঘি। মহাকালের গর্ভে সবই বিলীন হয়ে গেছে; শুধু সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে সেকালের কীর্তিরাজি। ঝিনাইদহ জেলা শহর থেকে যে পিচঢালা রাজপথ সোজা চলে গেছে দক্ষিণে যশোরের দিকে, এই রাস্তার পার্শ্বে ঝিনাইদহ শহর থেকে সতেরো মাইল দূরত্বে বারোবাজার নাম ধারণ করে আজও একটি গ্রাম্য বাজার পথিকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভগ্নদশা চেহারা নিয়ে আজকের বারোবাজার প্রাচীনকালের অনেক কাহিনী স্মরণ করিয়ে দেয়; বলতে চায় অনেক অব্যক্ত বেদনার কাহিনী। এখানে অসংখ্য প্রাচীন জলাশয়ের অস্তিত্ব এখনও আছে। স্থানীয় অধিবাসীদের মতে এখানে ছয় কুড়ি ছয়টি (১২৬টি) জলাশয় ছিল। সতীশ বাবু অনেকগুলো জলাশয়ের তালিকা দিয়েছেন। যেমন- ১) রাজমাতার দীঘি, ২) সওদাগর দীঘি, ৩) পীর পুকুর, ৪) মীরের পুকুর, ৫) ঘোড়ামারী পুকুর, ৬) ঘোড়ার পুকুর, ৭) চেরাগদানী দীঘি, ৮) গলাকাটার দীঘি, ৯) ভাই-বোন পুকুর, ১০) মনোহর পুকুর, ১১) শেখের পুকুর, ১২) কচুয়া, ১৩) লোহাখানা, ১৪) উত্তপাড়া, ১৫) মিঠাপুকুর, ১৬) মুনপালা, ১৭) খবুকার পুকুর, ১৮) কানাই দীঘি, ১৯) সাত পুকুর, ২০) পাঁচ পীরের দীঘি, ২১) ছাতারে দীঘি, ২২) আলেখ্য দীঘি, ২৩) হাঁস পুকুর, ২৪) বিশ্বাসের দীঘি, ২৫) শ্রীরাম রাজার দীঘি, ২৬) বেড় দীঘি, ২৭) জল ঢালা দীঘি, ২৮) চাউল ধোয়া, ২৯) পিঠে ধোওয়া, ৩০) ডাইল চালা, ৩১) কোদাল ধোয়া ইত্যাদি। এ তালিকার অধিকাংশ জলাশয়ের অস্তিত্ব বর্তমানে নেই। বেশ কয়েকটি জলাশয় মজে গিয়ে চাষের জমিতে পরিণত হয়েছে। আগে আরো জলাশয় ছিলো বলে ধারণা। বারোবাজারের চারিদিকে পুকুরাকৃতির অসংখ্য নিম্নভূমি দেখা যায়। একই স্থানে এতগুলো প্রাচীন জলাশয়ের অস্তিত্ব নিঃসন্দেহে এ স্থানের অতীত গৌরবের পরিচায়ক। রাণী মাতার দীঘিঃ পাকা সড়ক থেকে বাজারের ভিতর দিয়ে যে কাঁচা রাস্তাটি পশ্চিমে গ্রামের দিকে চলে গেছে তার উভয় পাশে বর্তমানে বেশীর ভাগ প্রাচীন কীর্তির ধ্বংসাবশেষ ও জলাশয়গুলোর অস্তিত্ব দেখা যায়। পাকা সড়কের নিকটবর্তী এলাকায় বর্তমানে বাজার, স্কুল, অফিস ও আবাস গৃহাদি গড়ে উঠেছে। এসব স্থানে অসংখ্য প্রাচীন কীর্তি ছিলো বলে স্থানীয় জনসাধারণের ধারণা। কিন্তু বর্তমানে এগুলো খুঁজে বের করা আর সম্ভব নয়। কাঁচা সড়ক দিয়ে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার পথেই রাস্তার দক্ষিণ পাশে পড়ে রাণী মাতার (রাজমাতার) দীঘি। ৩৬ বিঘা ভূমি জুড়ে অবস্থিত শ্রীরাম রাজার মাতার দীঘি বলে পরিচিত জলাশয়টি পূর্ব পশ্চিমে ঈষৎ দীর্ঘ। এ দীঘির নামকরণে ভূল তথ্য আছে বলে মনে হয়। হিন্দুদের দীঘি পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ হয় না; এ ধরণের দীঘি থেকে তারা কোনদিন জল খায় না। মুসলমানের জলাশয় সাধারণতঃ পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা হতো। এ কারণে এটি কোন মুসলমান কর্তৃক খনন করা হয়েছিল বলে অনুমিত হয়। এ দীঘির পাড়ে কোন প্রাচীন কীর্তির চিহ্ন বর্তমানে নেই। আগে বেশ কয়েকটি ঢিবি ছিল বলে জানা গেছে। সওদাগরের দীঘি ও সওদাগরের মসজিদঃ বাজারের পথ ধরে আর একটু অগ্রসর হলে আরও একটি বড় জলাশয় চোখে পড়ে। উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ ৩৬ বিঘা ভূমি নিয়ে গঠিত এই জলাশয়কে সওদাগরের দীঘি বলা হয়ে থাকে। দীঘির পশ্চিম তীরে প্রায় দেড় বিঘা জমি জুড়ে প্রাচীন ইটের পরিপূর্ণ প্রায় দশ ফুট উঁচু একটি মাঝারী ধরণের ঢিবি আছে। জনসাধারণ একে সওদাগরের মসজিদ বলে। মসজিদ কি মন্দির খনন না করে নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না। সওদাগরের দীঘির কাছে ও বাজারের রাস্তার উত্তর পার্শ্বে উদ্যানের মত একটি বিস্তীর্ণ স্থান দেখা যায়; সেখানে বেশ কয়েকটি প্রাচীন কীর্তি ছিলো। বেশ কয়েকটি স্থান থেকে গর্ত খুড়ে ইট বের করা হয়েছে। বাজার ও সরকারী তহশীল অফিস অতিক্রম করে গেলেই কতকগুলো আবাস গৃহ দেখা যায়। প্রায় সব কটি আবাস গৃহের দেয়াল এখানকার প্রাচীন ইটে তৈরী এবং এ সকল ইমারতাদি যে বারোবাজারের প্রাচীন কীর্তিগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ, তাতে কোন সন্দেহ নেই। গোড়াই মসজিদঃ আবাসগৃহগুলোর পশ্চিমে এবং রাসত্মার দক্ষিণে একটি প্রাচীন মসজিদ জীর্ণ অবস্থায় এখনও টিকে আছে। লোকে বলে গোড়াই বা গোড়ার মসজিদ। মসজিদ থেকে ৩০ গজ পূর্ব দিকে প্রায় ৪/৫বিঘা আয়তনের একটি প্রাচীন জলাশয় আছে। নাম গোড়াই পুকুর বা গোড়া পুকুর। বর্গাকারে নির্মিত এ মসজিদের প্রত্যেক বাহু বাইরের দিকে প্রায় ৩ ফুট এবং ভিতরের দিকে ২০ ফুট লম্বা দেয়ালগুলো পাঁচ ফুট প্রশস্ত চারকোণে চারটি সুন্দর অষ্টকোণাকৃতির মিনার আছে। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে ৩টি ও উত্তর দক্ষিণ দেয়ালে ১টি করে খিলানযুক্ত প্রবেশ পথ আছে। পশ্চিম দেয়ালে আছে দরজা বরাবর তিনটি মেহরাব। কেন্দ্রীয় মেহরাব অপেক্ষাকৃত বড়। মেহরাবগুলোতে পোড়া মাটির ফলকে ফল ও লতাপাতার অলংকরণ ছিল। এতদিন পরেও পোড়া মাটির চিত্র ফলকগুলোর সৌন্দর্য তেমন নষ্ট হয়নি। মসজিদের অভ্যন্তরে চার দেয়ালে কেন্দ্রস্থলেও দেয়াল ঘেষে ৪টি পাথরের স্তম্ভ ও চারপাশের দেয়ালের উপর মসজিদের একমাত্র গম্বুজ প্রতিষ্ঠিত। প্রায় অর্ধ বৃত্তাকারে উপুড় করা পেয়ালার আকৃতিতে নির্মিত গম্বুজটি দেখতে খুব সুন্দর। বর্তমানে গম্বুজের কেন্দ্রস্থলে দেড় থেকে দু’ফুট ব্যাসের একটি গোলাকার ছিদ্র হয়ে গেছে। বাকী অংশ এখনও বেশ মজবুত আছে বলে মনে হয়। মসজিদের বাইরের দেয়ালে পোড়ামাটির সুন্দর চিত্র ফলক এবং চার কোণেও এ ধরণের কাজ ছিল। সুনিপুণ হস্তে পরবর্তীকালে এগুলোতে মেরামতের কাজ করা হয়েছে; কিন্তু তাতেও পোড়ামাটির চিত্র ফলকগুলোর সৌন্দর্যের আভাস পাওয়া যায়। মিনারগুলো বেশী উঁচু নয়, ছাদের সামান্য উপরে গিয় শেষ হয়েছে। মসজিদের চারদিকে বেষ্টনী প্রাচীর ছিল। আজ তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সংলগ্ন গোরাই পুকুরের পশ্চিম পাড়ে একটি বাঁধানো ঘাট ছিলো বলে জানা যায়। অতি জীর্ণ হলেও মসজিদে এখনও নামাজ পড়া হয়। এ মসজিদ খানই জাহান কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল বলে প্রবল জনশ্রুতি আছে। জোড় বাংলার মসজিদঃ গোড়াই মসজিদ থেকে কিছু দূরে এবং রাস্তার দক্ষিণ পার্শ্বে একটি মাঝারী আকারের প্রাচীন জলাশয় আছে। জলাশয়ের পশ্চিম পাড়ে পরস্পর সংলগ্ন দুটি অনুচ্চ ঢিবি আছে। আয়তনে এক একটি প্রায় এক বিঘা। ঢিবি দুটি প্রাচীন ইটে পরিপূর্ণ। লোকে বলে জোড় বাংলার মসজিদ। একসংগে লাগানো দুটি মসজিদের অস্তিত্ব সাধারণতঃ দেখা যায় না। তবে মসজিদের সংগে হুরজাখানা বা এবাদত খানা নির্মাণের অনেক প্রমাণ দেখা যায়। পাবনা জোড় বাংলার মত কোন মসজিদের ধ্বংসাবশেষও হতে পারে। এই দুটি ঢিবি খনন না করে এ সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না। পীরের মাজারঃ গোড়াই মসজিদ থেকে প্রায় ১৫০ হাত উত্তরে এবং রাস্তার উত্তর পার্শ্বে প্রাচীন ইটে পরিপূর্ণ একটি ছোট অনুচ্চ ঢিবি আছে। একে সাধারণ পীরের মাজার বলে থাকে। কোন পীরের মাজার তা কেউ নিশ্চিত বলতে পারে না। এটি কোন ছোট মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ বলেই মনে হয়। ইটগুলি খুবই প্রাচীন এবং মুসলমান আমলের বলে মনে হয় না। গলাকাটা দীঘি ও গলাকাটা মসজিদঃ গোড়াই মসজিদ থেকে প্রায় ২০০ গজ উত্তর-পশ্চিমে এবং রাস্তা থেকে প্রায় ১০০ গজ উত্তরে মাঝারী আকারের একটি জলাশয় আছে। উত্তর দক্ষিণে লম্বা এ জলাশয়ের আয়তন প্রায় ৫ বিঘা। লোকে বলে গলাকাটির দীঘি। দীঘির দক্ষিণ পাড়ে একটি ঢিবি আছে। বর্গাকারে এ দীঘির প্রত্যেক বাহু প্রায় ২৫ ফুট লম্বা এবং এর উচ্চতা প্রায় ৮ ফুট। ঢিবির বাইরে ও ভিতরে প্রচুর প্রাচীন ইটের অস্তিত্ব আছে। বেশ কয়েকটি বড় বড় পাথরের টুকরাও এখানে ওখানে পড়ে আছে। ঢিবির উপরে দুটি কালো পাথরের মুখ বের হয়ে আছে। আনুমানিক ১ ফুট ব্যাস বিশিষ্ট প্রায় গোলাকার স্তম্ভ দুটির পারস্পরিক দূরত্ব প্রায় ৮ ফুট। স্তম্ভের উপরিভাগে ৩ ইঞ্চি গভীর এবং ১.৫ ইঞ্চি ব্যাস বিশিষ্ট ছিদ্র আছে। এতে মনে হয় স্তম্ভের উপর আরও পাথর সংযুক্ত ছিলো। স্তম্ভ ও পাশের দেয়ালের উপর ছাদ বলে অনুমান করা যায়। এটিকে কেউ বলে গলাকাটির মসজিদ, আবার কেউ কেউ বলে গলাকাটির মন্দির। গলাকাটি নামটা একটু বিচিত্র ধরণের। যদি এ নামের সাথে জলাশয় ও ধ্বংসাবশেষের কোন সম্পর্ক থেকে থাকে তবে ধ্বংস স্তম্ভটি কোন কালী মন্দিরের সংগে সম্পৃক্ত ছিলো বলে অনুমান করা যায়। সেই মন্দিরে হয়তো কোনকালে নরবলি হতো এবং তা থেকে গলাকাটি নামের উদ্ভব হতে পারে। আবার এমনও হতে পারে যে, কোন এক সময় হয়তো কোন মানুষের গলা কেটে জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল এবং তা থেকে জলাশয় ও মন্দির বা মসজিদের নামকরণ হয়েছে। খনন না করে এটি মসজিদ কি মন্দির ছিলো সে সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। তবে যতদূর মনে হয় এটি খুব সম্ভব একটি মন্দির ছিল। এই ধ্বংসস্তুপ থেকে মাত্র ২০০ গজ দক্ষিণ পূর্বদিকে ছিলো গোড়াই মসজিদ এবং মাত্র ১৫০ গজ দূরে পশ্চিমে ছিলো চেরাগদানী মসজিদ। দুটি মসজিদের কাছে আরও একটি মসজিদের অস্তিত্ব খুব সম্ভাব্য ঘটনা বলে মনে হয় না। চেরাগদানী মসজিদ ও দীঘিঃ গলাকাটা ঢিবি থেকে আনুমানিক ১৫০ গজ পশ্চিমে একটি প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। উত্তর দক্ষিণে লম্বা একটি মাঝারী আকারের প্রাচীন দীঘির দক্ষিণ তীরে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ ঘেষে এ মসজিদটি অবস্থিত জলাশয়টির নাম চেরাগদানী ও ইমারতটিকে চেরাগদানী মসজিদ বলা হয়ে থাকে। জলাশয়ের পানি বেশ স্বচ্ছ। বর্গাকারে নির্মিত মসজিদের প্রত্যেক বাহু ভিতরের দিকে ছিল প্রায় ২০ ফুট দীর্ঘ। দেয়ালগুলি ছিল ৪.৫ ফুট প্রস্থ। মসজিদের পশ্চিম উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালের ভগ্নাবশেষ মাটির উপর প্রায় ৩/৪ ফুট উঁচু অবস্থায় এখনও টিকে আছে। পূর্ব দেয়ালের অতি সামান্য অংশ ছাড়া বাকী সম্পূর্ণ দেয়াল প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পূর্ব দেয়ালে ৩টি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ১টি করে প্রবেশ পথ ছিল ভিতরে পশ্চিম দেয়ালে ছিল ৩টি মেহরাব। গম্বুজ খুব সম্ভবত ১টিই ছিল। বর্তমানে মসজিদের অভ্যন্তরে একটি অস্থায়ী জুম্মা ঘর নির্মিত হয়েছে। চেরাগদানী মসজিদ থেকে প্রায় ৫০ গজ দক্ষিণে একটি মাঝারী আকারের অনুচ্চ ঢিবি আছে। প্রাচীন ইটে ভরা এ ঢিবিকে কেউ কেউ বলে মাজার কেউ বা বলে মন্দির। শ্রীরাম রাজার দীঘিঃ পাকা সড়ক ও রেল লাইনের পূর্বদিকে বাদুরপাড়া মৌজায় কয়েকটি কীর্তির চিহ্ন দেখা যায়। রেল লাইন অতিক্রম করার পর পরই কয়েকটি জলাশয় চোখে পড়ে। পাঁচপীরের দীঘি, আলোখাঁর দীঘি, হাঁস পুকুর প্রভৃতি বিভিন্ন নামে এগুলো পরিচিত। এগুলো পার হয়ে উত্তর পূর্বদিকে কিছুদুর গেলেই একটি উন্মুক্ত স্থানে একটি বড় জলাশয় দেখা যায়। এটির নাম শ্রীরাম রাজার দীঘি। উত্তর দক্ষিণে দীর্ঘ এ দীঘির আয়তন আনুমানিক ৫৫০ x ৩৫০ ফুট। প্রশস্ত পাড়গুলো এখনও প্রায় ১৫ফুট উঁচু। পূর্ব ও দক্ষিণ পাড়ে এককালে বাঁধানো ঘাট ছিল। দীঘির পশ্চিম ও উত্তর দিকে নিম্নভূমি। দক্ষিণ দিকে প্রশস্ত উঁচু ভূমি। পূর্ব পাড়ের প্রায় ৬০০ x ৩০০ ফুট আয়তনের উঁচু ভূমি বর্তমানে চাষের জমি হলেও এককালে সেখানে ইমারতদির অস্তিত্ব ছিল-তা এখানকার ইট ও মৃৎপাত্রের প্রমাণ করে। বেড়দীঘিঃ উপরে উল্লিখিত উঁচু ভূমি লাগ পূর্বদিকে একটি বিচিত্র ধরনের জলাশয় আছে। আনুমানিক ১২০০ x ১২০০ ফুট আয়তনের এই জলাশয়ের কেন্দ্রস্থলে দ্বীপাকার নির্মিত একটি উঁচু ভূমি আছে। উত্তর দক্ষিণে দীর্ঘ এ দ্বীপাকার ভূমির আয়তন আনুমানিক ৩০০ x ২৫০। বাঁশবন এবং গাছগাছড়া ছাড়া এ স্থান এখন জঙ্গলাকীর্ণ। কোন বেস্টক প্রাচীর বা কোন ইমারতের ধ্বংসাবশেষ বর্তমানে নেই। তবে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ইট ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ সেখানে আছে। চারিদিকে জলরাশিকে যদি পরিখা বলা যায় তবে সেগুলো ৪৫০ ফুটের কম প্রশস্ত হবে না। এগুলোতে বর্তমানে মাছের চাষ হয়। মাঝখানে দ্বীপাকার ভূমিটি এখনও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। গাজী কালু চম্পাবতীর কবরঃ বেড়দীঘি নামে পরিচিত উপরে উলিস্নখিত জলাশয়ের উত্তর পূর্ব পাড়ে তেমন কিছুই নেই। দক্ষিণ পাড়ের উঁচু ভূমি প্রায় ১০০ ফুট প্রশস্ত। দক্ষিণ পাড়ের প্রায় কেন্দ্রস্থলে পাশাপাশি অবস্থানরত তিনটি প্রাচীন কবর আছে। কবর তিনটি আয়তনে বেশ বড়। কবরগুলোতে কোন শিলালিপি নেই। তবে এগুলো যে তিনজন বিশিষ্ট মহাত্নর সমাধি তাতে কোন সন্দেহ নেই। কবরগুলোকে হাল আমলে সংস্কার করে গাজী কালু ও চম্পাবতীর কবর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে আরবী অক্ষরে সিমেন্ট পলেসত্মরার উপর নাম খোদিত করে। কেন্দ্রীয় ও অপেক্ষাকৃত বড় কবরটিকে গাজীর, পশ্চিম দিকেরটিকে কালুর ও পূর্ব দিকেরটিকে চম্পাবতীর কবর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর প্রায় পশ্চিম দক্ষিণে একটি প্রাচীন বটকৃক্ষ আছে। বৃক্ষের তলদেশে একটি পাকা কূপ আছে বলে দাবী করা হয়। গাছের গোড়ায় মাটির নীচে কিছু প্রাচীন ইট ও ইটের ফাঁকে গুহার মত একটি শূণ্যস্থান নজরে পড়ে। এটি কূপ না আরও একটি পাকা কবরের গহ্বর তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এখানে আগে প্রতি বৃহস্পতিবারের রাত্রে গাজীর ব্যাঘ্রকুলের আগমন ঘটতো। এখন আর তা হয় না। কারণ জংগলের অভাবে ব্যাঘ্রদের আবাসভূমির অভাব ঘটেছে। গাজী পীরের সংগে সংযুক্ত করে এ স্থানের মাহাত্য প্রচারের কোন ত্রুটি নেই। একটি অতি জীর্ণ কুটিরে ততোধিক জীর্ণ অবস্থায় একজন ক্ষীনদেহী খাদেম তার অস্তিত্বকে কোন রকমে টিকিয়ে রেখেছেন। গাজীর নামে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কিছু কিছু লোকের আগমন এখানে ঘটলেও অপ্রতুল জীর্ণতাকে রোধ করতে সমর্থ হয়নি। বারোবাজারের অন্যান্য কীর্তির ধ্বংসাবশেষঃ বারোবাজার এলাকায় অসংখ্য প্রাচীন কীর্তির ধ্বংসাবশেষ ছিলো। উপরে উল্লিখিত ধ্বংসাবশেষগুলো সেসব কীর্তির মধ্য অল্প কয়েকটি মাত্র। বাকীগুলো বর্তমানে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অসংখ্য ইমারতদির অবস্থান এই অঞ্চলে ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। কয়েক বর্গমাইল স্থান জুড়ে অসংখ্য প্রাচীন ইট ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ দেখা যায়। পনের বিশ বছর আগেও এখানে যেসব কীর্তি ছিল বর্তমানে সেগুলো খুঁজে পাওয়া যায় না। তথ্য সূত্র: ঝিনাইদহের ইতিহাস