বিয়ে

এখানে এসে মিরুকে দেখে কিছুটা অবাক হলাম।কিছুটা না।পুরোই অবাক হলাম।ওকে ঠিক এখানে আশা করি নি আমি।একটু আনইজিও ফিল করছি।তবুও জড়সড় হয়ে বসে রইলাম।অনেক গুলো গোপন কথা নিয়ে।গোপন ব্যাথা নিয়ে চুপচাপ স্টেজে বসে রইলাম।কিছু সময় পরই মিরু আমার সামনে আসল।চেহারায় অনেকটা রাগ রাগ ভাব।তবুও সেটা লুকানোর চেষ্টা করছে।কিন্তু পারছে না।আমি আমার মতই চুপচাপ বসে রইলাম।সে বলল, ।। ।। মিরু-:দেখি সোজা হয়ে বসুন।চেহারাতো ব্যাঙের মত করে রেখেছেন।একটু হাসুন! এই বলে সে মোবাইলটা আমার দিকে ফিরাল।ছবি তুলতে চাইছে বোধ হয়। আমি কোন রকমে ওর দিকে তাকালাম।ঠিক ওর দিকে না।ওর পিছনে গিপ্ট হাতে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছি।মিরু বেশ কয়েকটা ছবি নিয়ে চলে গেল।ঠিক যেভাবে এসেছে সেভাবেই গেল। পিছন থেকে সাদিক উঠে এল স্টেজে।এসেই আমার পাশে বসে বলল, ।। ।। সাদিক-:সপ্তম আশ্চর্যের পর যে এমন ভাবে অষ্টম আশ্চর্য দেখব বলে আশা করি নি।প্রেমিক এর বিয়েতে প্রেমিকা আসল।আবার এসেই প্রমিকের ছবি তুলে নিয়ে গেল ভাবতেই কেমন জানি লাগছে। সাদিক থামল। ।। ।। আমি কিছু বললাম না।কেবল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। চোখ গুলো কেমন জান ঝাপসা হয়ে আসছে।মিরুর সাথে কাটানো প্রতিটি মূহুর্ত যেন চোখের সামনে ভাসছে।ওর রেগে যাও চাহনিটা বারবার চোখের সামনে ভাসছে। কান্না করতে করতে লাল হয়ে যাওয়া নাকে ডোগাটা ভীষন ভালো লাগত আমার।রেগে গিয়ে কতবার যে আমায় মেরেছে তার অন্তঃ নেই। ।। ।। মিস করছি ওর সাথে কাটানো সময় গুলো।আর কখনও ওর সাথে এমন ভাবে সময় কাটানো হবে না ভাবতেই ভিতরটা যেন তলিয়ে যাচ্ছে।কষ্টে আবেশিত হয়ে আছে হৃদয়টা।দুজনে মিলে যে স্বপ্ন গুলো দেখেছি সেগুলো আর বাস্তবায়ন হবে না।স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল।আচ্ছা আমার পাশে অন্য মেয়েকে দেখে কি মিরুর খারাপ লাগবে না।একটুও লাগবে না? ওর পাশে কোন ছেলেকে দেখলেই আমার মাথাটা গরম হয়ে যায়।যেন! যেন কেউ নিয়ে যাচ্ছে ওকে আমার থেকে। ও আমার! শুধু আমার! ওকে ছোঁয়ার কিংবা দেখার অধিকার কেবল আমার আছে। অন্য কারো নেই।কিন্তু এখন! এখন তো আমি অন্য কারো হতে চলেছি।সেও অন্য কারো হবে।অন্য কেউ ওকে ছুঁয়ে দেখবে।ওর নরম তুলতুলে হাতটা নিজের হাতের ভাঁজে নিবে।এগুলো ভাবতেই আমার খারাপ লাগা বেড়ে যায়।অস্থিরতা কাজ করে হৃদয় মাঝে।ওর পাশে অন্য কেউ থাকবে এটা ভাবতেই ইচ্ছে করে নিজেকে শেষ করে দেই।ওর পাশে অন্য কেউ?কোন মতেই এটা সহ্য করার মত নয়।একদম না। ।। ।। সাদিক-:কিরে কোথায় হারিয়ে গেলি? অ্যাই তাসফি! অ্যাই! কই হারাই গেলি? ।। আমি-:হু... ।। সাদিক:কি হু...! :কিছু বলছিস? ও কিছুসময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।একটু সময় নিয়ে বলল, :খুব ভালোবাসিস ওকে।তাই না? ।। আমি-:তুই জানিস। সবটা তুই জানিস।আমার কতটা জুড়ে মিরু রয়েছে সেটা তোর থেকে ভালো আর কেউ জানে না সাদিক। ।। সাদিক-:হুম।তা বুঝলাম।কিন্তু এখানে তোর কিংবা আমার কিছুই করার নেই।আমার ভাবতেই অবাক লাগে মিরা এমনটা করেছে।তাও আবার তোর সাথে।যাকে ও মন প্রান দিয়ে ভালোবাসে।আমি বেশ ক'টা জায়গায় তোদের রিলেশন নিয়ে প্রশংসাও করেছি।কিন্তু এখন...!ছিঃ মিরা এটা কিভাবে করল? ।। আমি-:থাক বাদ দে।দুঃখ কষ্ট জীবনে থাকবেই।সেগুলো নিয়েই আগামির পথ চলতে হবে। সাদিক আমার হাতটা ধরল।নিজের হাতের উপর রেখে বলল, ।। সাদিক:দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে।মিতুও বড্ড ভালো মেয়ে।আমার বিশ্বাস তুই অবশ্যই ওর সাথে সুখে থাকবি। ।। আমি-:আমি কিভাবে সুখে থাকব সাদিক।কিভাবে থাকব।আমার সব সুখতো মিরুর সাথে ভাগ করা। ।। সাদিক-:অ্যাই! অ্যাই ছেলে! বিয়ে করতে এসেছিস। একদম কান্না করিস না।লোকে কি ভাববে। চুপ! একদম থাক।বোকা ছেলে।কাঁদিস না।সব ঠিক হয়ে যাবে।এভাবে ভেঙ্গে পড়িস না।প্লিজ! আমি কিছু বললাম না আর।কথা বলতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হচ্ছে আমার।চুপচাপ বসে থাকলাম। মা ব্যস্ত।বাবা ব্যস্ত। ছোট বোনটা ব্যস্ত বান্ধুবিদের সাথে।ছোট ভাইটা আছে তার বন্ধুদের নিয়ে।সবাই খুশি।আনন্দের ছায়া পড়ল যেন এখানে।সবাই খুশি।বেশ খুশি।এত খুশির মাঝে কারো চোখে পড়ে আমাকে।আমি যে ভালোবাসার জ্বালায় দগ্ধ সেটা কেউ জানে না।একমাত্র সাদিক ছাড়া।আচ্ছা! মিরুকি জানে? আমি যে ভালো নেই সেটা কি ও জানে? ।। ।। সাদিককে দেখলাম বিষন্ন মুখে আমার দিকে এগিয়ে আসতে।বাবাকে দেখছি না।মাকেও না।সাদিকে আমার সামনে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল কিছু সময়।ছোট্ট বোন আর ভাইটা হাসি মজা করছে না।কমিউনিটি সেন্টারে যেন একরাশ নিস্তব্ধতা নেমে এল।কেউ কেউ ফিস ফিস করছে কেবল।আমি সাদিকের দিকে তাকালাম।বললাম, ।। আমি-:কিরে! কি হয়েছে? মুখটা এমন করে রেখেছিস কেন? সাদিক কিছু বলল না।চুপ করে থাকল।আশ্চর্য! আমি এমন সাদিককে কখনই দেখি নি।এতটা বিষন্ন কখনও সাদিক হয় নি।নিশ্চই খুব জঘন্য কিছু হয়েছে।খুব খারাপ কিছু! সাদিক আমার হাত ধরে বলল, সাদিক-:উঠে আয়! আমি একটু অবাক হলাম।বললাম, আমি-:কোথায় যাব? ও ভারি গলায় বলল, সাদুক-:আমার সাথে একটু ঐদিকে আয়।কিছু কথা আছে। আমি সাদিকের দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। ভয়ংকর কিছু শুনতে হবে আমাকে।নিশ্চই খুব ভয়ংকর! সাদিক সামনে।আমি পিছন পিছন যাচ্ছি।একটু দূরে মিরুকে দেখলাম।ভীষন খুশি সে।পুরো কমিউনিটি সেন্টারে ও একা হাসছে।আর কারো মুখে হাসি নেই।বিন্দুমাত্র হাসি নেই।মিরু আবার হাসল।সাধারণ গলায় বলল, সাদিক-:সব লোকের বিয়ে হয় না।সবাই বিয়ের যোগ্যও নয়। এই বলে আবার হাসল মিরু।সাদিককে দেখলাম কপট রাগ নিয়ে মিরুর দিকে তাকাল।তবে কিছু বলল না।আমার হাত ধরে মিরুর সামনে থেকে নিয়ে এল।এখানে কোন ভিড় নেই।মাঝে মাঝে দু'একজন লোক আসে যায় কেবল।সাদিক আমাকে ওর দিকে ফিরাল।নিজের ডান হাতটা আমার কাঁদের উপর রাখল।বলল, সাদিক-:দেখ তাসফি! কত মেয়ে আসে যায়।আর কত মেয়ে আসে যাবে।তা নিয়ে যদি আমরা পড়ে থাকি, তাদের দেওয়া কষ্ট গুলো নিয়ে বেঁচে থাকার কোন মানেই হয় না।আমাদেরকে বেঁচে থাকতে হবে।কারো না কারো জন্যে বেঁচে থাকতে হবে। আমি কিছুটা অবাক হলাম।এসব কথা ও আমাকে বলছে কেন? বললাম, আমি-:তা না হয় বুঝলাম।কিন্তু তুই এগুলো আমাকে বলছিস কেন? সাদিক-:বলছি।আগে আমার কথা মনযোগ দিয়ে শুন।ভেঙে পড়বি না একদম।প্লিজ ! জীবনে মেয়ে পাবি অনেক।আমরা তোর জন্যে আরো ভালো একটা মেয়ে দেখব।মিতুর চেয়ে ভালো।আজ বাসায় চল।আরো একটা ভালো মেয়ে দেখে তোকে বিয়ে দিব। সব যেন খুব জলদি পরিষ্কার হয়ে গেল।বাবা মায়ের আমার সামনে না আসার কারন।সবার এমন নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া।আমি এখন ঠিকই টের পেলাম কি হয়েছে। আমার হৃদয়ের ক্ষত স্থানটি যেন আরেকটু ক্ষত হল।তারউপর কিছুটা মরিচের ছিটকে পড়ল।আমার চোখ দুটো খুব তাড়াতাড়ি ঝাপসা হয়ে গেল।ক'ফোটা জল গাল বেয়ে পড়ে গেল। সাদিকের চোখ ছলছল করছে।ভাঙ্গা কন্ঠে বললাম, ।। ।। আমি-:মানে।সাদিক! মিতু! মিতুও... সাদিক চোখ ঝাপসা করে বলল, সাদিক -:সেও চলে গেছে।তার নাকি রিলেশন ছিল। আমি একটা ধাক্কা খেলাম।দেয়ালের সাথে পিঠা ঠেকে গেল। আমি -:মিতু কেন এমনটা করল।ওকে তো আমি আগেই বলে দিয়েছি ওর পছন্দ থাকলে বলতে।এমনকি ওকে আমার আর মিরুর রিলেশন সম্পর্কে বলেছি। তাহলে! কেন? কেন ও সেদিন আমাকে এ কথা বলল না।বললে হয়ত আজ এমন দিন দেখতে হত না। আমি ডুকরে কেঁদে উঠলাম।সাদিককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।সেও কাঁদছে।প্রিয় বন্ধুর এমন কষ্ট সইতে পারছে না বোধ হয়।আমি কান্না করছি সাদিককে জড়িয়ে ধরে।এমতাবস্থায় চোখ গেল সামনের দিকে। দেখলাম মিরু দাঁড়িয়ে আছে।তার চোখ দুটো ছলছল করছে।ও কাঁদছে কেন? ওর তো হাসার কথা।ও কাঁদছে কেন? . ।। ।। মিরুর সাথে আমার পাঁচ বছরের রিলেশন।বেশ শক্তপোক্ত। আমাদের বাসার পাশেই ওদের বাসা।সেই সূত্রে আমাদের প্রতিনিয়ত দেখাও হয়।আমি চাকরি করি আর ও পড়াশুনা করে।অনার্স থার্ড ইয়ারে।হঠাৎ-ই আমার পরিবার থেকে বিয়ের জন্যে খুব চাপ দেয়।পরিবারের বড় ছেলে বলে কথা! একবার না! দুইবার না! বারবার আসছে।মানে আমার সাথে দেখা হলেই, বাবা -;"বাবা বিয়েটা করে ফেল।ঘরটা কেমন জানি খালি খালি লাগছে।" আরো কত কি? ।। ।। মিরুকে বিয়ের কথা বলতেই ও কেমন জানি মুখ গোমরা করে বসে থাকল। বেশ কিছুদিন মিরুর মন খারাপ ছিল।আমার সাথেও ঠিক মত কথা বলত না।কেমন জানি! উদাস! উদাস! এর মাঝে আমি হুট করেই একটা কাজ করে ফেলি।বাবা মাকে মিরুর কথা বলি।তারাও বেশ খুশি।দেখতে শুনতে ভালো। এমন কি চেনাজানাও আছে।তাই তারা অমত করে নি।বিয়ের কথা পাকা করতে গেলেন মা-বাবা।মিরুর বাবাও অমত করে নি।সব ঠিক।সবার মত আছে।সবাই খুশি।ভীষন খুশি।আমি! আমি তো খুশিই।যাক অবশেষে আমার স্বপ্ন গুলো পূরন হতে চলেছে।বাসর রাতে ওকে একটা চমক দিব।একটা স্বর্নের রিং কিনেছি ওর জন্যে। ওকে দিব।নিশ্চই খুশি হবে।তারপর! তারপর শুরু হবে আমাদের ভালোবাসায় সমৃদ্ধ সংসার। ওহ! আগ থেকেই কেমন জানি উত্তেজনা কাজ করছে আমার মাঝে। এর পরের দিন মিরু আমাকে জরুরি তলব করল।আমিও খুশি খুশি মনে গেলাম দেখা করতে।কিন্তু সেখানে গিয়ে যে এমন বিবৎস কিছু বাণী শুনতে পাব তা আমার ভাবনার অনুকুলে ছিল।আমি ঠিক মিতুর কাছ থেকে এগুলো আশা করি নি।একদম না।যার সারমর্ম হল মিতু এখন বিয়ে করতে ইচ্ছুক নয়।সে তার কেরিয়ার গঠন করতে চায়।নিজেকে তুলে ধরতে চায়।সে এখন বিয়ে করতে একদম প্রস্তুত নয়।কথা গুলো ও আমাকে এমনি বললেও পারত।কিন্তু এর সাথে এমন কিছু কথা বলল যে যা শুনে আমার ব্রেক আপ নেওয়ার কথা চিন্তা করতে হল।তারপর বিয়েটা আর হয়ে উঠল না। এর পরের দিন গুলো আমাদের ভালো যায় নি।আমি ফোন দিলে ও বিজি থাকত আর ও ফোন দিলে আমি।তারউপর জগড়া তো আছেই।রিতিমত জগড়া করত ও।কিছু একটা পেলেই হয়েছে। আগে তো এমন ছিল না।এখন কি হল।অতি প্রিয় মানুষটা এখন বিষাদে পরিনত হল।আমার পক্ষ্যে আর সম্ভব হয়ে উটে নি ওর সাথে সম্পর্ক রাখার।বাধ্য হয়ে ব্রেক আপ নিলাম।আশ্চর্যের ব্যাপার হল এতে ও বিন্দুমাত্র দুখিও হয় নি।বরং যেন অত্যধিক খুশি।ব্যস! এখানেই শেষ পথ চলা।থমকে দাঁড়াই আমি।সামনে আমি। আর পশ্চাৎ-এ হাজারো সৃতি। কিছু কষ্ট। কিছু অভিমান। অঘোর ভালোবাসা।হাজারো মায়া।ভালোবাসার কিছু খন্ডকালীন সময়।তারা আমাকে তাড়া করে।আঘাত দেয়।আমি তা সয়ে নিয়ে সামনে এগিয়ে চলি। চলবে,,,, #বিয়ে_ভাঙ্গা_অতঃপর #নাম_প্রকাশে_অনিচ্ছুক
diane555 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.